kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে

জয়ন্ত ঘোষাল

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে

রাজধানীর অভিজাত ক্লাব ইন্ডিয়া হ্যাবিটেট সেন্টারের সবুজ লনে এক কূটনীতিকের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজনে বসেছিলাম। এই কূটনীতিক আবার ঘোরতর পাকিস্তানবিরোধী। সমস্যা হচ্ছে, তিনি পাকিস্তানকে একেবারেই গুরুত্ব দিতে রাজি নন। তিনি বলেন, আপনারা এই সংবাদমাধ্যম পাকিস্তান পাকিস্তান করেই গেলেন। পাকিস্তানের এমন একটাও বিরাট ক্ষমতা নেই যে এই মুহূর্তে ভারতের চিন্তার কোনো কারণ আছে। ল্যাম বার্গার চিবোতে চিবোতে ভদ্রলোক বললেন, পাকিস্তান আগে নিজের দেশের অর্থনীতিটা সামলাক। তারপর ভারতকে নিয়ে ভাবতে যাবে। আমি খুব বিনীতভাবে বললাম দেখুন, আপনার অভিজ্ঞতা কূটনীতিক হিসেবে নিশ্চয়ই অনেক বেশি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে সাউথ ব্লক ইমরান খানের কার্যকলাপের বিষয়ে একটু বেশি নজর রাখছে। কোনো উদ্বেগ নেই বলে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি এই সংকটজনক করোনাপর্বে মনে করে কোনো কাজ করার নেই। এ হলো কূটনীতির হ্যাপি আওয়ারস, তাহলে বোধ হয় ভুল হবে, স্যার।

২২ থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কলম্বো সফরে ব্যস্ত। কোন পটভূমিতে এই দুই দিনের সফর, সেটা বোঝা প্রয়োজন। পাকিস্তানের অনেক অভ্যন্তরীণ সমস্যা রয়েছে। শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়। শুধু তো প্রতিষেধক কূটনীতি নয়। সেখানে বিরোধী রাজনীতিও ইমরান খানের জন্য খুব বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেনাবাহিনীর সঙ্গেও ইমরান খানের সম্পর্কের অনেক রৌদ্রছায়া দেখা যাচ্ছে। আর এসবের মধ্যে হঠাৎ কলম্বো সফর কেন? এ রকম একটা পটভূমিতে ইমরান খান কেন কলম্বো সফর করছেন? অনেকেই বলছেন, ইমরান খান পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতেও একটা পরিবর্তন আনতে উদ্যোগী হয়েছেন। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কাউন্সিল, যাকে বলা হয় ওআইসি। সেই সংগঠনের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্কটা পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু সেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটাও তো বিনষ্ট হতে বসেছে। অর্থাৎ ওআইসিতেও পাকিস্তান খুব বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। সৌদি আরবের কাছে যদি পাকিস্তান তার গুডউইল হারায়, তাহলে তো ইসলামিক দেশের মধ্যেই পাকিস্তান বেশ বিপন্ন বোধ করবে। সুতরাং এ রকম একটা সময়ে অর্থনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামরিক বিভিন্ন রকমের বোঝাপড়া দরকার। সেই বোঝাপড়াগুলো মাথায় রেখে রিয়াদ যখন পাকিস্তান থেকে নানা কারণে একটা নিরাপদ দূরত্ব বাড়াতে শুরু করেছে—সেই সময় ইমরান খান শ্রীলঙ্কায় গিয়ে ড্যামেজ কন্ট্রোল এক্সারসাইজ করবেন। এমনটা অনেকেরই ধারণা। ইমরান খান শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোটাবে রাজাপক্ষে ও প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীনেশ গুনাবর্ধেনার সঙ্গেও বৈঠক করবেন। শ্রীলঙ্কার আরো কিছু নেতার সঙ্গেও তাঁর দেখা-সাক্ষাৎ হবে। শ্রীলঙ্কা সরকার তাদের সংসদের অধিবেশনে একটা আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য সুযোগ দিয়েছে; যেটা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্মান বলে মনে করছেন।

শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কটা একটা সময়ে খুব মধুর ছিল। সেটাও কিন্তু ভারত ভুলতে পারে না। বিশেষত ১৯৭১ সালে শ্রীলঙ্কা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। শ্রীলঙ্কা যখন তাদের যুদ্ধবিমান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানের দিকে পাঠানোর চেষ্টা করছে, তখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলছে। তখন ভারত শ্রীলঙ্কার এই বিমান চলাচলের ছাড়পত্র দেওয়াকে নিষেধ করেছিল। ভারত প্রতিবাদ জানিয়েছিল, এ ধরনের বিমান যুদ্ধের সময় চলতে পারে না। ভারত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল আর শ্রীলঙ্কাকে অনুরোধ করেছিল। শ্রীলঙ্কা কলম্বো থেকে জ্বালানি ভরার অনুমতি দিয়েছিল। তখন ১৭৪ বার শ্রীলঙ্কার ওপর দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান গিয়েছিল। সেই সময় পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে একটা সামরিক বোঝাপড়াও তৈরি হয়। সেই সময় পাকিস্তানের সঙ্গে শ্রীলঙ্কা একটা গভীর সম্পর্ক তৈরি করেছিল। ইমরান খানের এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের আবার একটা সামরিক বোঝাপড়াকে বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা হচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে ভারতের কাছেও খবর এসেছে। শ্রীলঙ্কার আর্মি চিফ শারদ ফনসেকা ২০০৮ সালের মে মাসে ২২ আল খালিদ মেন ব্যাটল ট্যাংক কেনার একটা বিশেষ মিশন নিয়ে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। তিনি সঙ্গে করে আরেকটা তালিকা নিয়েছিলেন, যেখানে সব মিলিটারি হার্ডওয়্যার, যা ৬৫ মিলিয়ন ডলার দামের। এগুলো পাকিস্তানের সামরিক ব্যবস্থাকে ভবিষ্যৎ কর্মসূচির জন্য দেওয়া হয়েছিল। এই মিলিটারি বন্ডিংকে ইমরান খান আবার বাঁচিয়ে তুলতে চাইছেন। সেটা কেন? তাহলে কি শ্রীলঙ্কা ভারতবিরোধী হয়ে উঠছে? মধ্যাহ্নভোজনে সেই কূটনীতিক বললেন, না, আসলে তা নয়। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে চীনের গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। চীন শ্রীলঙ্কাকে নানাভাবে সাহায্য করছে। এমনকি পূর্ব উপকূলবর্তী বন্দর, যেটা ভারত চেয়েছিল, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যৌথভাবে সেই বন্দরের আধুনিকায়ন করবে। সেই বরাতটা চীন নিয়ে নিয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, ভারত সেই বরাতটা পায়নি। চীন পেয়েছে। কিন্তু শ্রীলঙ্কা আবার ভারসাম্য রক্ষার জন্য তাদের পশ্চিম উপকূলবর্তী বন্দরের বরাত ভারতকে দিয়েছে। কিন্তু ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করলেও ভারত মনে করছে, আপাতত শ্রীলঙ্কার পক্ষে ভারতবিরোধিতা করা সম্ভব নয়। শ্রীলঙ্কা চীন-পাকিস্তান অক্ষটাকেও সজীব রাখতে চাইছে।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে এত দিন ধরে সার্কের মাধ্যমে একটা ডিপ্লোমেটিক কনসলিডেশন তৈরি করা হয়েছিল। তাহলে সেটা কি চীনের বর্তমান আচরণের জন্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে? সে কারণেই কি শ্রীলঙ্কার এয়ারফোর্স, বিশেষ করে সি-১৩০ হারকিউলিস, যেটা পাকিস্তানের সঙ্গে দেওয়া-নেওয়ার কথা হচ্ছে আমেরিকা-পাকিস্তানের মার্কিন এক্সপার্টিস নিয়ে, তারা যে সেগুলো নিজেদের দেশের মধ্যে কাজে লাগাচ্ছে। শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও বাণিজ্যিক কারণেও চুক্তির পথে যেতে চলেছে। সবটাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসন খুব ভালো চোখে দেখছে, এমনটা নয়। বরং বাইডেন প্রশাসন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো প্রকাশ্যে চীনের বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা না করলেও তারা চীন সম্পর্কে মার্কিন নীতিতে কঠোর মনোভাব নিয়েই এগোতে চাইছে। তার কারণ এখনই চীনের কাছে আত্মসমর্পণ করা বা একটা বোঝাপড়ার পথে চলে যাওয়া—সেই লাইনটাও বাইডেন নিতে চান না। সুতরাং এটা একটা জটিল পরিস্থিতি। এ রকম একটা জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আরেকটা জিনিস খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সেটা হলো মাদকপাচার চক্র। সেটা শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের মধ্যে ভীষণভাবে কাজ করছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে ভারতের কাছে খবর আসছে। এসব ড্রাগ স্মাগলিং পাকিস্তান থেকে শ্রীলঙ্কায় করা হচ্ছে মাক্রান উপকূল দিয়ে। ৪১ জন ড্রাগ অফেন্ডার এই মুহূর্তে শ্রীলঙ্কার জেলে রয়েছে। প্রচুর পাকিস্তানি, যাদের ড্রাগ লর্ড বলা হয়, তারা শ্রীলঙ্কা থেকে অপারেট করছে। সে ব্যাপারে খুব বেশি প্রচারিত হয় না। কিন্তু ভারতীয় গোয়েন্দারা এ ব্যাপারে যথেষ্ট তৎপর। এ ব্যাপারে ভারতীয় কূটনীতিকরা অনেকেই উদ্বিগ্ন। সুতরাং এই মুহূর্তে চীন কৌশলগতভাবে কিছুটা পিছু হটেছে। তারা স্বীকার করেছে তাদের লোকজনও মারা গেছে। চীন প্রকাশ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বোঝাপড়ায় পৌঁছতে চেয়েছে। কিন্তু সেটা ভারত পুরোপুরি বিশ্বাস করছে তা নয়। তারা মনে করছে, চীন যেকোনো মুহূর্তেই অনেকটা পিছিয়ে এসে আবার আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিতে পারে। সুতরাং এ রকম একটা পরিস্থিতিতে ইমরান খানের এই সফর চীন ও শ্রীলঙ্কার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাও খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টা ২০০৯ সালে এলটিটির ক্ষেত্রে বড় ইস্যু হয়েছিল। সেই সময় ইউনাইটেড নেশন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমালোচনার মুখে পড়েছিল শ্রীলঙ্কা। এখন আবার চীন-পাকিস্তান অক্ষের অংশ নিয়ে আগামী দিনে শ্রীলঙ্কার সমস্যাও হতে পারে। কিন্তু সে ব্যাপারে শ্রীলঙ্কাকে সচেতন করার জন্য ভারত সচেষ্ট। চীন ও পাকিস্তান এই মুহূর্তে হাতে হাত মিলিয়ে ভারতকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করবে। এটা নিয়ে ভারতীয় কূটনীতিকদের মধ্যে কোনো সন্দেহ নেই।

এই পটভূমিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আবার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তার কারণ, বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও জিও স্ট্র্যাটেজিক পজিশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মুহূর্তে চীন-পাকিস্তান অক্ষ যখন শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্য এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ভারতের জন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশ সব থেকে বড় বন্ধু হয়ে উঠছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর আসন্ন। সেই সফরে উপমহাদেশের কূটনীতির একটা ভবিষ্যৎ পথনির্দেশিকা পাওয়া যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র

বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা