kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৮। ৫ আগস্ট ২০২১। ২৫ জিলহজ ১৪৪২

দেশের রাজনীতি নিয়ে আশাবাদ কতটা সফল হবে?

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

২৯ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দেশের রাজনীতি নিয়ে আশাবাদ কতটা সফল হবে?

নতুন বছরে সবাই নানা ধরনের প্রত্যাশার বাস্তবায়ন দেখতে চেয়েছেন। রাজনৈতিক দলের নেতারা নতুন বছর উপলক্ষে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন প্রত্যাশার কথা দেশবাসীকে শুনিয়েছেন। আওয়ামী লীগ ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে দেশকে করোনামুক্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধির পথে চলমান অগ্রযাত্রা বহাল থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। অন্যদিকে বিএনপি নতুন বছরে দেশে গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ‘গণতন্ত্র’ পুনরুদ্ধার করবে বলে দেশবাসীকে শুনিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিবছর যেভাবে নতুন কিছু দেওয়া ও ঘটানোর আশাবাদ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে শোনা যায়, বাস্তবে সেটি খুব বেশি ঘটে বলে মনে হয় না। বরং রাজনীতি নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা, হতাশা, নিষ্ক্রিয়তা যেন বেড়েই চলছে। বলা হচ্ছে, আমাদের রাজনীতি থেকে আদর্শের চর্চা হারিয়ে যাচ্ছে। ভোগবাদিতা, দুর্নীতি, লুটপাট, ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদি বেড়েই চলছে। দলের নেতাকর্মীরা দেশ ও জাতির কল্যাণে তেমন একটা নিবেদিত নন। মেধাবী তরুণরা রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অন্যদিকে দলের মধ্যে লেখাপড়া জানা নেতাকর্মীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বড়-ছোট প্রায় সব দলের মধ্যেই নানা ধরনের গ্রুপিং, বিরোধ স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে পড়েছে। সে কারণে মানুষ রাজনৈতিক দলের নেতাদের মুখ থেকে যেসব আশাবাদ শুনে থাকে, সেগুলো বাস্তবে বিশ্বাস খুব কমই করছে। কারণ অভিজ্ঞতা তেমন সুখকর নয়।

এ কথা বিশ্বাস করতেই হবে, বাংলাদেশ এ বছর স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করতে যাওয়ার সময় দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি যথেষ্ট প্রশংসাসূচক। বাংলাদেশ ৫০ বছরে অর্থনীতিতে ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। পাকিস্তান আমাদের সাফল্যের কথা অকপটে স্বীকার করছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কর্মপরিকল্পনা এবং শ্রমজীবী মানুষ ও উদ্যোক্তা শ্রেণির ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। করোনার বৈশ্বিক মহামন্দাকালেও বাংলাদেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৫.১২ শতাংশের বেশি ঘটেছে, যা প্রতিবেশী কোনো দেশেই ঘটেনি। বিশেষ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ গত ১২ বছরে বিদ্যুৎ, কৃষি, মৎস্য, শিক্ষা, যোগাযোগ, তথ্য-প্রযুক্তি, গার্মেন্ট, পোল্ট্রি, বড় বড় মেগাপ্রকল্প ইত্যাদি বাস্তবায়নে যে ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছে তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে প্রশংসনীয় হয়েছে। বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তাসহ জনগণের জীবনমানের যে উন্নতি ঘটছে, তাতে বাংলাদেশকে নিয়ে এখন আর কেউ আগের মতো দারিদ্র্যপীড়িত রাষ্ট্রের বদনাম দিচ্ছে না, বরং উন্নয়নশীল একটি রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য সবার কাছে সমাদৃত হচ্ছে। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দ্রুত বিকাশমানতার সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিকাশের তুলনামূলক বিশ্লেষণে অনেকেই হতাশার কথা ব্যক্ত করছেন। রাজনীতিতে প্রত্যাশিত মানের সংকট অনেকটাই এই সমাজের অন্তর্নিহিত বাস্তবতা। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চরম ধ্বংসযজ্ঞের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে ১৯৭২ সালে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করলেও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক নেতৃত্ব তখন নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিল। রাজনীতিও ছিল মুক্তিযুদ্ধের পোড়খাওয়া অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ। ফলে আমাদের যাত্রাটি শুরু হয়েছিল অপেক্ষাকৃত আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের হাত ধরে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুসহ চার জাতীয় নেতাকে হত্যা এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দলগুলো এবং রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি কঠিন করে দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রব্যবস্থায় যে অরাজনৈতিক, সুবিধাবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, সেটি আমাদের জাতীয় রাজনীতি ও সমাজজীবনে শুধু শূন্যতাই সৃষ্টি করেনি, বিষফোড়াও তৈরি করেছে। দেশের রাজনীতিতে চরমভাবে ওলটপালট ঘটেছে। জোরজবরদস্তির মাধ্যমে ক্ষমতা দখল, কুক্ষিগত এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাকে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ধারায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে রাজনীতিতে একসময়ের পরিত্যাজ্য ও প্রতিক্রিয়াশীলরা শক্তি সঞ্চয় করে। তারা দেশের জনগণের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় সাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণা, প্রতিবেশী ভারতবিরোধিতা, রাষ্ট্রীয় মূলনীতির অপব্যাখ্যা, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের চরিত্র হনন ইত্যাদি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত রাজনীতিতে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্রিয়াশীল রেখেছিল।

বাংলাদেশের রাজনীতি একদিকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পক্ষে, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি সমীকরণে পরিচালিত হতে থাকে। আওয়ামী লীগ এই পরিস্থিতিতে দলীয় আদর্শগত ঐতিহ্য দৃঢ়ভাবে ধরে রাখার অবস্থান বজায় রাখতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রেই কৌশলগত কারণে আপস করেছে। এর ফলে দলের অভ্যন্তরে এখন আদর্শহীন, দুর্নীতিপরায়ণ, সুবিধাবাদী এবং অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত লোকের সমাবেশ ব্যাপকভাবে ঘটেছে। ২০০৯ সাল থেকে তিন মেয়াদে টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার কারণে সমাজের আদর্শহীন, সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন, সুবিধাবাদী এবং দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে জড়িত অনেকেই আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে প্রবেশ এবং শক্তিধর হয়ে উঠেছে। সে কারণে আওয়ামী লীগের আদর্শের রাজনীতি জনগণের মধ্যে যেভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা ছিল, সেটি আশানুরূপভাবে ঘটেনি। দেশের অন্যান্য আদর্শবাদী রাজনৈতিক দলও এখন ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

দেশে সামগ্রিক রাজনীতি এখন বেশ বড় ধরনের আদর্শগত সংকটকাল অতিক্রম করছে। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী দেশে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র ও অভ্যুত্থান সংঘটিত করার চেষ্টায় রয়েছে। সে কারণেই দেশের রাজনীতি নিকট ভবিষ্যতে কী ধরনের চরিত্র লাভ করতে যাচ্ছে, তা নিয়ে রাজনীতিসচেতন মহলের মধ্যে গভীর শঙ্কা বিরাজ করছে। এ কথা স্বীকার করতেই হবে, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বিকাশের ধারা-মূলধারার রাজনীতি তথা আওয়ামী লীগের সব কয়টি শাসনামলেই অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। সাম্প্রদায়িক এবং প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী রাজনীতির ছদ্মাবরণে দীর্ঘ সময় দেশ শাসন করলেও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে তাদের সাফল্য ততটা উজ্জ্বল নয়। বাংলাদেশে আপাতত গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকতায় আওয়ামী লীগের সীমাবদ্ধতার বাইরে বিরোধীপক্ষের অবস্থান মোটেও আস্থাশীল হওয়ার মতো নয়। রাজনীতিতে এখন একদিকে আওয়ামী লীগ, বিপরীতে আওয়ামীবিরোধী গোষ্ঠী—যারা সাম্প্রদায়িকতা, উগ্র হঠকারিতার রাজনীতির ধারক-বাহক হিসেবে পরিচিত। ফলে জনগণের আস্থার সংকটটি উভয় দিকেই কমবেশি দৃশ্যমান। এটি কাটিয়ে ওঠা না গেলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিই শুধু নয়, অর্থনৈতিক বিকাশও চরম রাজনৈতিক নৈরাজ্যের কবলে পড়তে পারে।

লেখক : বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের  সাবেক অধ্যাপক



সাতদিনের সেরা