kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

গোলমালকারীরাই বাইডেনের মূল চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে

এম কে ভদ্রকুমার

২৩ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বহির্বিশ্বে ট্রাম্পের দ্বিতীয় অভিশংসনকে অভিহিত করা হতে পরে ‘ক্যাঙ্গারু ট্রায়াল’ হিসেবে। তার চেয়ে মার্কিন আইন প্রণেতারা ভালো করতেন যদি তাঁরা একটি আইন পাস করতে পারতেন; যেখানে বলা হবে, যুক্তরাষ্ট্র কখনো বিদেশে বা দেশে ‘কালার রেভল্যুশন’-এ মদদ বা উসকানি দেবে না। অনেক দেশের ক্ষতি করেছে যুক্তরাষ্ট্র, তারা সেসব দেশের জনগণকে ফুসলিয়েছে তাদের সরকারকে জিম্মি করার জন্য, সরকারব্যবস্থাকে দখল করার জন্য; তারা তাদের সরকারকে মার্কিন বলয়ে ঢুকতে বাধ্য করেছে। এসব ঘটনাকে কি ‘সহিংস বিক্ষোভ’ বলা যায়?

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বছরখানেকের মধ্যে দ্বিতীয়বার অভিশংসিত করা একটা প্রহসন বটে। মার্কিন ইতিহাসের ২৩১ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো একজন প্রেসিডেন্টকে দুইবার অভিশংসিত করা হলো।

জানুয়ারির ৬ তারিখে ওয়াশিংটন ডিসিতে যা ঘটল তাকে কোনোভাবেই বিদ্রোহ বলা যায় না। অবশ্যই মার্কিন নাগরিকরা ক্যাপিটল ভবনের দখলের ঘটনায় জড়িত ছিল। কিন্তু ওই ঘটনা ওখানেই শেষ। ক্ষমতা দখলের কোনো প্রয়াস তারা করতে পারত না। কারণ তার কোনো উপায় ছিল না। কার্যত ভাঙচুরও যা ঘটেছে, তার পুরোটার দায় ছিল নিরাপত্তারক্ষীদের; তাদের অদক্ষতার কারণে এসব ঘটেছে।

ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (বিবিসি) জনমতভিত্তিক বিশ্লেষণধর্মী একটা প্রতিবেদন করেছে; তাতে দেখা যায় নির্বাচনের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হোয়াইট হাউসের কাছে আয়োজিত সমাবেশে  ট্রাম্প বলেছেন, ‘সেইভ আমেরিকা’। ট্রাম্পের বক্তৃতায় যা রয়েছে তার উদ্ধৃতিযোগ্য বিস্ফোরক অংশগুলো হলো ‘আমরা এ নির্বাচন জিতেছি এবং আমরা বিপুলভাবে জিতেছি/...আমরা এ নির্বাচনী চুরি ঠেকাব/...আমরা কখনো হাল ছেড়ে দেব না, আমরা কখনো পরাজয় মানব না, এটা ঘটেনি/...তোমরা যদি মরণপণ লড়াই না করো, তাহলে একটা দেশকে দেশ হিসেবে কখনোই পেতে পারবে না/...শান্তিপূর্ণভাবে এবং দেশপ্রেমিকের মতো তোমরা তোমাদের আওয়াজ তোলো/...আমরা ক্যাপিটলের দিকে যাচ্ছি।’

ক্যাপিটলে এতটা গোলমাল বাধানোর লোক কি ছিল যে তারা মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ফেলতে চায়? এসব কথা বলার জন্য ট্রাম্পকে কি অফিস থেকে অপসারণ করা যায় অথবা রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করা যায়? বিবিসি প্রখ্যাত মার্কিন আইন বিশেষজ্ঞ ও ইউনিভার্সিটি অব বাল্টিমোরের আইনের অধ্যাপক গ্যারেট এপসের অভিমত জানতে চেয়েছিলেন। এপস বলেছেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমি মনে করি এটা জুরির বিষয়।’ সবচেয়ে ভালো হয়, যদি মার্কিন জনগণ জুরি হয়। অভিশংসনের বিষয়টি ১০০ সদস্যের সিনেটে খারিজ হয়ে যেতে পারে। জুরিসভা হিসেবে বসবে সিনেট, সভাপতিত্ব করবেন মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। এ জুরিসভার ফল আসবে শুধু বাইডেনের অভিষেকের পর।

গত বুধবারে প্রতিনিধি পরিষদে ১০ জন রিপাবলিকান প্রতিনিধি র্যাংক ভেঙে অভিশংসন প্রস্তাবকে সমর্থন করে। সিনেটে যখন এর শুনানি হবে, তখনো অনুরূপ ঘটনা ঘটতে পারে। বাস্তবে যে বিষয়টি বিচারে উঠেছে, সেটি হলো ট্রাম্পিজম। বিচ্ছিরি ব্যাপারগুলো ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর জন্য জড়ো করা হয়েছে। অসীম ক্ষমতাধর সোশ্যাল মিডিয়া তাঁকে নিষিদ্ধ করেছে। তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্টও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

কিন্তু জনমত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, পার্টির ভেতরে এখনো ট্রাম্পের বেশ ভালো সমর্থন রয়েছে। ডেমাক্র্যাটদের ভয় হলো, ট্রাম্প ফিনিক্স পাখির মতো ছাইভস্ম থেকে জেগে উঠবেন ২০২৪ সালে; তারা তাঁকে শেষ আঘাতটি করতে চায়, তাঁকে আমেরিকার জনজীবন থেকে ভ্যানিশ করতে চায়, ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অধিকার থেকে তাঁকে বঞ্চিত করতে চায়। ক্যাপিটল হিলে চলমান রাজনৈতিক খেলার এটাই মূল উদ্দেশ্য।

তাহলে মার্কিন এক্সসেপশনালিজমের কী হলো? অতি সাম্প্রতিক কালে অনেক পশ্চিমা গণতন্ত্রও জনবিচ্ছিন্নতার শিকার হয়েছে, পপুলিজম ও জাতীয়তাবাদের পাল্লায় পড়েছে। ট্রাম্প তাঁর রাজনীতি এ রকমই পেটেন্ট করেছেন। আসলে জাতীয়তাবাদ ইউরোপজুড়েই পুনঃপুনঃ জায়গা করে নিচ্ছে। সম্প্রতি ডানপন্থী ও পপুলিস্টদের প্রতি ভোটারদের সমর্থন ব্যাপক বেড়েছে। ক্ষোভ, হতাশা ও ন্যাশনাল আইডেন্টিটির প্রতি রাজনৈতিক এস্টাবলিশমেন্টের বাস্তবতাবিরোধী মনোভাব, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, অসমতা প্রভৃতি কারণে এসব হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে রাজনীতি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন; সেখানে রাজনীতি পরিচালনা করছে দুই দলের ভেতরের গোপন রাজনৈতিক চক্র। এখানেই বিপদ। কী গ্যারান্টি আছে যে এই চক্রের বাইরে আরেকজন ট্রাম্প জেগে উঠবেন না! তিনি যে সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছাবেন না তার কী নিশ্চয়তা?

মোদ্দা কথা হচ্ছে, ট্রাম্পের জনসমর্থন মার্কিন রাজনীতিকদের ঈর্ষার কারণ। গত নির্বাচনে সাত কোটি লোক তাঁকে ভোট দিয়েছে। গুপ্তচক্রের লোকজন ক্যাপিটল হিলে যে অপকর্ম করছে, ক্ষতিকর ও অনৈতিক কাজ করছে, তাতে এই বিপুল সমর্থন আরো দমিত বোধ করবে, নিজেদের ক্ষমতাহীন মনে করবে। তাতে বিচ্ছিন্নতা আরো বাড়বে। যে লোকজন ক্যাপিটল ভবন দখল করেছিল তারা মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোক। পুঁজির সঞ্চয়ন ও কেন্দ্রীভবন তাদের প্রলেতারিয়েতে পরিণত করছে, কিন্তু তারা এ অবস্থান মানতে নারাজ। তারা ব্যবসা, স্বাধীনভাবে চলা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, পরিবার ও সম্পত্তির দেখাশোনায় মনোযোগী। তারা এখন মন্দা, চাকরি হারানো ও দেউলিয়াত্বের মধ্যে রয়েছে, তারা পুরনো মূল্যবোধের ধারক। পেলোসি যদি ট্রাম্পকে রাজনীতির নির্জন প্রদেশেও পাঠান, এরাই কিন্তু বাইডেনের রিয়েল চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে।

 

লেখক : সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক, কলামিস্ট

সূত্র : দি এশিয়ান টাইমস

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : সাইফুর রহমান তারিক

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা