kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

সাদাকালো

ট্রাম্পের হাতে গণতন্ত্র বেহাল বাইডেনের সামনে বহু চ্যালেঞ্জ

আহমদ রফিক

২১ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ট্রাম্পের হাতে গণতন্ত্র বেহাল বাইডেনের সামনে বহু চ্যালেঞ্জ

রাষ্ট্রপতিনির্ভর (প্রেসিডেনশিয়াল) শাসনব্যবস্থা বহাল হওয়া সত্ত্বেও জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হওয়ার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যদিও সে নির্বাচনী ব্যবস্থায় জটিলতা বিস্তর। তবু রাষ্ট্রটি গণতান্ত্রিক তকমার বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের অসাধারণ একটি জনভিত্তিক গণতন্ত্রের ঘোষণার কারণে। অবশ্য একাধিক জনবান্ধব নীতির কারণে তাঁকে প্রাণ দিতে হয় ভিন্ন মতের গণতন্ত্রবিরোধীদের হাতে।

এমন সব পরিপ্রেক্ষিতে এবং তাঁর আগ্রাসী বিদেশনীতি ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কারণে ভিন্নমতাবলম্বীরা সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক বিবেচনা করতে দ্বিধান্বিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক-রাষ্ট্রনৈতিক ইতিহাস তেমন সাক্ষ্যই দেয়। অংশত অভ্যন্তরীণ ও মূলত বিদেশনীতির কারণে।

কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বর্ণবাদ (শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদ), সাম্প্রদায়িকতা বা দাসপ্রথা প্রবল সামাজিক নীতি হতে পারে না বা সে কারণে বা অপেক্ষাকৃত উদারনীতির কারণে প্রেসিডেন্ট হত্যার মতো বর্বর ঘটনাও ঘটতে দেখা যায় না কিংবা সন্ত্রাসবাদী শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদ রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রধান কারণ হতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস এজাতীয় কালিমায় চিহ্নিত।

এর সর্বশেষ উদাহরণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী নীতি তৎপরতা ও বিজয়, এক মেয়াদের উদ্ভট কর্মকাণ্ড এবং দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী অপতৎপরতা ও সুস্পষ্ট পরাজয় সত্ত্বেও তা অস্বীকার, ক্ষমতা ত্যাগে অস্বীকৃতি—সর্বোপরি সে সম্পর্কে খোলামেলা ঘোষণা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বশেষ নিকৃষ্টতম রাজনৈতিক আচরণ পূর্বোক্ত সব অপতৎপরতা ছাড়িয়ে যায়। আর তা হলো ক্ষমতা ত্যাগ তথা হোয়াইট হাউসের সিংহাসন ত্যাগ অস্বীকৃতির পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্পের কথিত উসকানি এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার হস্তান্তর ভণ্ডুল করতে কংগ্রেস ভবনে হামলা।

দুই.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন ঘিরে অনিয়ম ঘটেনি এমন নয়। জুনিয়র বুশ ও আলগোরের প্রতিযোগিতা তার একটি নমুনা। নিক্সন থেকে বুশ, এরপর ট্রাম্প। উদাহরণ কম নয়। এ ব্যাপারে রিপাবলিকানরা বেশ কয়েক পা এগিয়ে। কিন্তু সমকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এদিক থেকে অনেক পা এগিয়ে। এবং তা এতটাই যে খোদ রিপাবলিকান নেতৃত্বের কেউ কেউ বিরক্ত ও ট্রাম্পের বিরোধিতায় সরব।

কারণ এ ধরনের ঘটনা এ পর্যন্ত ঘটেনি। সম্ভবত ট্রাম্পের বিশেষ বাহিনীই এই অপকর্মের হোতা—কংগ্রেস ভবনে সশস্ত্র, সন্ত্রাসী হামলা, পরিণামে চারজন নিহত। উদ্দেশ্য, সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে আসন্ন ক্ষমতার হস্তান্তর ভণ্ডুল করা, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নৈরাজ্য সৃষ্টি, বিজয়ী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনকে ক্ষমতা গ্রহণ করতে না দেওয়া। ট্রাম্পের আশা, হরিগণ্ডগোলে প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকা।

কিন্তু কাজটি সহজ নয়, এটা ট্রাম্পের মতো চতুর ব্যবসায়ী ব্যক্তির বোঝা উচিত ছিল। ছিল এ জন্য যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী গণতন্ত্র যত সমালোচিতই হোক, দীর্ঘ সময়ে তার একটা ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়ে গেছে। ঐতিহ্য সহিষ্ণুতার এবং বিধি-বিধান মাফিক বিজয়ীর হাতে ক্ষমতা সমর্পণ, এমনকি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন নিয়ে তুলকালাম না করা। যেমন—যথেষ্ট যুক্তিসংগত কারণ থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত বিজয়ী আলগোর শেষ পর্যন্ত আদালতে ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে সরে এলেন। এলেন মূলত মার্কিন গণতন্ত্রের মর্যাদা রক্ষার কথা ভেবে। জুনিয়র বুশ তথা রিপাবলিকানদের জয় নিশ্চিত হলো। এবং তরুণ বুশ ইরাক আক্রমণের মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটালেন। ঐতিহাসিক বাগদাদ পুড়ল তার খ্যাতনামা জাদুঘর লুট হওয়াসহ।

কিন্তু জার্মান বংশোদ্ভূত ডোনাল্ড ট্রাম্প (কে বলতে পারে নাৎসিধারায় জন্ম কি না) ভিন্ন ধাতে চতুর, দুর্নীতিবাজ এক সফল ব্যবসায়ী—অর্থের জোরে সদ্য রাজনীতিতে আবির্ভূত এবং ইহুদি সমর্থনে ধন্য। স্বভাবত রক্ষণশীল রিপাবলিকান শিবির তার আশ্রয়। সেখান থেকে ছলেবলে, কৌশলে ও শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদের জিগির তুলে নির্বাচনে বিজয়ী এবং দ্বিতীয় দফায় পরাজিত হয়েও নানা কূটকৌশলে চেষ্টা নির্বাচনী ফলাফল পাল্টে দিয়ে গদি আঁকড়ে রাখা।

এর আগে সংবাদপত্র মহলে দেখা গেছে, তার নানা উৎকট কীর্তিকলাপের ঘটনা, এমনকি এমন অবিশ্বাস্য ঘোষণাও যে নির্বাচনে হারলেও তিনি প্রেসিডেন্ট পদ তথা হোয়াইট হাউস ছাড়বেন না। তিনিই দ্বিতীয় মেয়াদের আসল প্রেসিডেন্ট। এরপর কত যে নোংরা কূটনীতির খেলা!

তিন.

আগেই বলেছি, সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে ওয়াশিংটন ডিসিতে ষড়যন্ত্রমূলক হামলা কংগ্রেস ভবনে—সহিংসতার শিকার নিরীহ মানুষ। জনৈক লেখক এ ঘটনাকে যুক্তিসংগতভাবেই তুলনা করেছেন জার্মানিতে নাৎসি ষড়যন্ত্রে (হিটলারের নায়কীতে) রাইখস্টাগে আগুনে হামলার সঙ্গে। পার্থক্য এই দায় কমিউনিস্টদের ওপর চাপানো, যা তদন্তে মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়।

ট্রাম্পের এবারের কীর্তিকলাপ অনুরূপ—সংবাদপত্রগুলোর শিরোনাম এমন কথাই বলে নানা ভাষ্যে। একটি বাংলাদেশি দৈনিকে খবর শিরোনাম : ‘গণতন্ত্র ধুলায় মেশালেন ট্রাম্প’। ক্ষমতায় থাকার জন্য ট্রাম্পের মরিয়া চেষ্টার অংশ হিসেবে ওই হামলাকে কাগজ-প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ন্যক্কারজনক, লজ্জাকর, নজিরবিহীন’, সব গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি, বিধি-বিধান লঙ্ঘন করে। দেখেশুনে মনে হয়, ক্ষমতার জন্য যেকোনো ধরনের কাজ করতে পারেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সে জন্য তাঁর লাজলজ্জা বলে কিছু নেই।

সত্যি যে গণতন্ত্র নিয়ে আমেরিকা বড়াই করে, গর্ববোধ করে তার অনুসারী রাষ্ট্র এবং বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিরা, এবার তাঁরা কী বলবে আর খোদ ‘আমেরিকা কোন মুখে গণতন্ত্রের কথা বলবে’। লিখেছেন জনৈক আমেরিকাপ্রবাসী বাঙালি অধ্যাপক। অবাক হই ভেবে যে একটি মহাদেশসম রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—তাঁর একবারও মনে হলো না এসব কাজকর্মের প্রতিক্রিয়া গণতন্ত্রী বিশ্বে কী রূপ নিয়ে দেখা দিতে পারে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক, প্রযুক্তি সংগঠনই বা কী চোখে দেখবে ট্রাম্পের নীতিবিরোধী, অশোভন আচরণ।

বাস্তবে এমন কিছুই ঘটল। জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটার কর্তৃপক্ষ ঘটনার তিন দিন পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিমান ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত টুইটার বন্ধ হওয়া কতটা লজ্জাজনক ঘটনা। তাতে করে হঠাৎ চটলেন বিশ্বনেতারা। তাঁদের মতে, এ পদক্ষেপ গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করার শামিল। কিন্তু তাঁরা কি ভেবে দেখেছেন, এ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর ক্ষমতার জোরে কী পরিমাণে গণতন্ত্র হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছেন, কী মাত্রায় অন্যায় সংঘটিত হয়েছে তাঁর টুইটারের মাধ্যমে? সেগুলো মন্তব্য বা বিবৃতি বা মতামত হলেও সেসবের প্রভাব তো নেহাত কম নয়।

ট্রাম্প এমন একজন ব্যক্তি, যে চাতুর্যে, চক্রান্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব খাটিয়ে অঘটন ঘটান, কোনোমতে ‘হ্যাঁ’কে ‘না’ করতে পারেন। তাঁর অশুভ প্রভাব-প্রতিক্রিয়া তো নেহাত কম হওয়ার নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হয়তো তেমন কিছু ভেবে থাকতে পারে। রক্ষণশীল বিশ্বে ট্রাম্পের অন্তরঙ্গ রাষ্ট্রিক বন্ধু তো কম নয়। এঁরা রাজনৈতিক খুনসহ ক্যুর মতো অনেক কিছুই ঘটাতে পারেন।

ট্রাম্প শিষ্টমনে বাস্তবকে, সত্যকে মেনে নিতে পারেননি—এটা বিপজ্জনক কথা। তাই ডেমোক্র্যাটরা মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বিপদের আশঙ্কা করে চলেছেন ট্রাম্প শিবির থেকে। শুধু তাঁরাই নন, বিশ্বের গণতন্ত্রীরা চাইছেন ট্রাম্পের আশু অপসারণ কিংবা আবার অভিশংসন তাঁর অপকর্মগুলোর কারণে। হঠাৎ কোনো অঘটন ঘটানো ট্রাম্পের পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়। তাই তাঁরা ঝুঁকি নিতে বা অঘটন ঘটতে দিতে চান না।

চার.

অবশ্য জো বাইডেন এখনো তাঁর শান্ত, সহিষ্ণু মনোভাব দেখিয়ে একের পর এক করণীয় সম্পন্ন করে চলেছেন—সাংগঠনিক, পরিকল্পনামূলক এবং কর্মসূচিবিষয়ক কাজ। কমলা তাৎপর্যপূর্ণভাবে নীরব। আমাদের একটি কাগজে এমন খবরও বেরিয়েছে : ‘ট্রাম্পের ক্যু প্রচেষ্টা’। তাঁর সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর সংখ্যা কম নয়, তাদের তৎপরতার কিঞ্চিৎ আভাস দেখা গেছে কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে। স্বভাবতই ডেমোক্র্যাট নেতৃত্ব ‘শেষের দিনগুলো নিয়ে যত শঙ্কা’য় রয়েছেন (কালের কণ্ঠ, ১১.১.২০২০)। এমনকি কেউ কেউ ব্যাপক বিক্ষোভের আশঙ্কা করছেন।

তবে অনেকের আস্থা জো বাইডেনের অন্তর্বর্তীকালীন ভূমিকা লক্ষ করে—যেমন সুস্থির তৎপরতায়, তেমনি নমনীয়তায়। তাঁর এই ভূমিকার কারণে উদার রিপাবলিকানদের শুভেচ্ছা হয়তো বা তিনি পেতেও পারেন। এর আগে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অভিশংসনের হাত থেকে বেঁচে যান ট্রাম্প। এবার অবস্থা তাঁর পক্ষে না হলেও দলের মর্যাদা বলে কথা—এর ওপর নির্ভর করছে কংগ্রেসে গৃহীত অভিশংসনের ফলাফল। মাত্র কয়েক দিনের ব্যাপার। ট্রাম্প হিসাব করেই ঘটনাকে জটিল করে তুলেছেন, যদিও তাঁর পক্ষে পদত্যাগের সুযোগ রয়েছে। যত দূর মনে হয়, ট্রাম্প সে পথে যাবেন না। অপেক্ষা শেষ অবস্থা পরখ করে দেখার জন্য। নিন্দিত হয়েও ট্রাম্প নির্বিকার।

যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রথম ক্যাপিটল হিলে হামলার মতো সন্ত্রাসী ঘটনার পাশাপাশি একজন প্রেসিডেন্ট এক মেয়াদে দুবার নিম্নকক্ষে অভিশংসিত হলেন। অস্থির যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি। বাইডেনের শপথ নেওয়ার আগে আরো হামলার আশঙ্কায় সশস্ত্র বাহিনী সতর্ক। এখন এই প্রথম ভাবনার বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের কথিত গণতন্ত্রী রাজনীতি তিন পথের কোনটি ধরবে—উদারনৈতিক, বর্ণবাদী উগ্রতা, নাকি সামরিক ধারা? কেউ বার্নির কথা ভাবতে পারেন, সেটা দূর-অস্ত্। সংখ্যাগুরুর ধারণা, প্রথম ধারার পক্ষে হলেও ট্রাম্পের হাতে গণতন্ত্র বেহাল উড়িয়ে দেওয়ার নয়। দেখা যাক, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কোন পথের পাশে দাঁড়ায়। এ অবস্থায় কারো মতে, ট্রাম্পের রাজনীতিই শেষ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তাঁর বর্ণবাদী সমর্থনের জোরে তা মনে হয় না। বরং শেষ মুহূর্তে সুবোধ বালকের মতো ট্রাম্প হয়তো বলবেন : এইতো আসনটি ছেড়ে দিলাম। সেখানে বাইডেন সমাসীন। সামনে বহু চ্যালেঞ্জ।

 

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা