kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭। ২ মার্চ ২০২১। ১৭ রজব ১৪৪২

শুভ জন্মদিন

সাহস ও শক্তি যেন চিরস্থায়ী হয়

নঈম নিজাম

২০ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



সাহস ও শক্তি যেন চিরস্থায়ী হয়

প্রিয়ভাজন রাজীব নূরের ফোন পেলাম সেদিন। বলল, মুস্তাফিজ শফিকে নিয়ে লিখতে হবে। বললাম, ঠিক আছে। কোনো সমস্যা নেই। লিখে দেব একটা। রাজীব বলল, ‘ভাই, আমার মেইলে পাঠিয়ে দেবেন।’ রাজীবকে পছন্দ করি ২৭ বছর ধরে। শফিও আমার প্রিয় মানুষদের একজন। না লিখতে পারলে বঞ্চিত হব। তাই ‘না’ করলাম না। চলার পথে প্রিয় মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ছোট্ট একটা জীবন। আজ আছি, কাল নেই। হাজারো বঞ্চনা নিয়ে আমাদের পথচলা। তাই কিছু বিষয় হাতছাড়া করতে রাজি নই জীবনের এই প্রান্তে এসে। জানতে চাইলাম লেখা দেওয়ার সময় কত দিন? রাজীব বলল, ‘হাতে একেবারে সময় নেই। আপনি যত দ্রুত দিতে পারেন, তত ভালো।’ মহামুশকিলে পড়লাম। তার পরও বললাম, ঠিক আছে। কোনো সমস্যা নেই। ঠিক সময়ে পাঠিয়ে দেব। এজাতীয় কথাবার্তায় একটু সুবিধা আছে। কমবেশি এদিক-সেদিক হতে পারে। আর লেখালেখি নিয়ে আমি হলাম আলসে মানুষ। নবাব ফয়জুন্নেসাকে নিয়ে একটা কাজ শুরু করেছি। শেষ করতে পারছি না। ব্যস্ততা আর আলসেমি একসঙ্গে আমাকে আঁকড়ে রাখে। আর এ দুটি থাকলে লেখালেখি হয় না। কিন্তু শফিকে নিয়ে না লিখে থাকি কেমন করে?

সাংবাদিকতা পেশায় আমার অতি প্রিয় মানুষ মুস্তাফিজ শফি। মনে পড়ছে প্রথম পরিচয়ের কথা। ভোরের কাগজে কাজ করি। হঠাৎ বন্ধু সৈয়দ বোরহান কবীর সিদ্ধান্ত নিল বাকি জীবন সংবাদপত্রে চাকরি করবে না। সময়টা ১৯৯৪। আমাকে বলল, চলো বন্ধু কিছু করি। এমনিতে নাচুনি বুড়ি, তার ওপরে ঢোলের বাড়ি। সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি প্রকাশ করলাম। বললাম, আমাদের জন্ম হয়েছে নতুন কিছু করার জন্য। চাকরি করে কী হবে? আমরা মিডিয়ায় নতুন কিছু করে দেখাব। চমক থাকবে সবার জন্য। তাক লাগিয়ে দেব। কম বয়সের স্বপ্নগুলো হয়তো এমনই হয়। বাস্তবতা হয় অনেক কঠিন। সে কাঠিন্য সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিলাম দুজন মিলে নিউজ এজেন্সি করব। এ এজেন্সির কাজ হবে অনেক সংবাদপত্রের পুরো দায়িত্ব নিয়ে প্রকাশ করা। মালিকদের বলব, পত্রিকার মালিক আপনি। মাসে মাসে আমাদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক অর্থ দেবেন। আমরা পুরো কাগজ বের করে দেব। মানসম্মতভাবে পত্রিকা প্রকাশিত হবে। নিউজ ব্যবস্থাপনা থাকবে আমাদের। মালিকরা হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। তবে পত্রিকার সফলতা তাঁদের। রাজস্ব তাঁরা নেবেন। বিশ্বে একটা নতুন কনসেপ্ট তৈরি করব। ধানমণ্ডি ২ নম্বর সড়কে অফিস নিয়ে নিলাম। বোরহান ভোরের কাগজ ছেড়ে দিল। মধ্যবিত্ত মন নিয়ে আমি আর ছাড়তে পারি না। কিন্তু বোরহানের সঙ্গে নেমে পড়লাম কাজে। ডাবল খাটুনি। উৎসাহের কমতি নেই কোনো কিছুতে। এগিয়ে চলছি আমরা দুজন। প্রতিষ্ঠানের নাম নিউজ অ্যান্ড ফিচার সার্ভিস। শুধু সংবাদ নয়, সংবাদভিত্তিক আরো অনেক কাজের ভাবনা আমাদের মাঝে।

নিউজ অ্যান্ড ফিচার সার্ভিসের অফিসে বসে গবেষণাভিত্তিক একটি কাজ করছিলাম। চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি আর সামনে বসা আহমেদ ফারুক হাসানের সঙ্গে রাজা-উজির আলোচনা করছি। হঠাৎ সামনে এলেন এক সুদর্শন তরুণ। চেহারার মাঝেই রয়েছে মেধার ছাপ। বাড়তি দিকটা হলো কবিভাব। ভদ্র, মার্জিত চেহারার যুবক বললেন, ‘আমি সিলেটের একটি কাগজের বার্তা সম্পাদক। ঢাকায় কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ বললাম, আপনি কিছু লেখা নিয়ে আসেন। পরদিন এলেন ওই যুবক। হাতে অনেক নতুন লেখা। মুগ্ধ হয়ে দেখলাম, পড়লাম। সুন্দর-সাবলীল হস্তাক্ষরে ঝরঝরে লেখা। সিলেটের নদীবিষয়ক সমস্যা নিয়ে অনুসন্ধানী লেখা। এ লেখা আমাদের পছন্দ হয়ে গেল। নাক সিটকানো আহমেদ ফারুক হাসানও প্রশংসা করলেন। বললেন, পেশায় থাকলে ও ভালো করবে। একমত আমিও পোষণ করলাম। মুস্তাফিজ শফির সে লেখা ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পত্রিকায় নিউজ অ্যান্ড ফিচার সার্ভিসের নামে প্রকাশিত হলো। শফি শুরু করলেন। দ্রুত দেখলেন, জয় করলেন। মেধা, মনন, চিন্তায় শফি বিশালত্ব তৈরি করলেন শুধু ঢাকা নয়, বাংলাদেশে। সৃষ্টিশীল মানুষ এমনই হন। খুব দ্রুত সব জয় করতে পারেন। কঠোর পরিশ্রম, মেধা-মনন, শৈল্পিক সত্তার প্রকাশ ঘটিয়ে কাঁপিয়ে দেন। মুস্তাফিজ শফি আজ সাংবাদিকতায় সফল ব্যক্তিত্ব। আমি মুগ্ধ তাঁর বিশালত্বে। সবাই এভাবে পারেন না। কিছু মানুষ পারেন। একজন মুস্তাফিজ শফিও পেরেছেন। অল্প সময়ে একটির পর একটি শীর্ষ পত্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন সাংবাদিকতার শেষ অবস্থান সম্পাদকের দায়িত্ব পালনে সফল দৈনিক সমকালে। এই দায়িত্বে একসময় ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় গোলাম সারওয়ার। শফি দায়িত্ব নেওয়ার পর ফোনে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম, শফি পারবেন সারওয়ার ভাইয়ের অবস্থান ও মর্যাদা ধরে আগামীকে জয় করতে। শফি পেরেছেন। নিজের অবস্থান ও খ্যাতিকে নতুন জায়গায় নিয়ে গেছেন। এই সফলতা তাঁর কষ্টে অর্জিত, শ্রমের ফসল। একজন মানুষ কখনো সফল হতে পারেন না শ্রম, একাগ্রতা, নিষ্ঠা, কর্তব্যপরায়ণতা ও স্বপ্ন না থাকলে। শফি একজন স্বপ্নবাজ মানুষ। স্বপ্ন দেখতে, দেখাতে ও জয় করতে জানেন। এর প্রমাণও রেখেছেন তিনি।

অনেকে ভাবেন, একজন মানুষ হুট করে বিশালত্ব অর্জন করেছেন। মোটেও তা নয়। ঈর্ষাকাতর একটি পেশায় আমাদের বসবাস। নিজের পেশার প্রতি দরদ ছাড়া সব কিছুতেই আমরা পারদর্শী। এখন সবাই মিডিয়ায় সময় দেওয়া ছেড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে বেশি ব্যস্ত। এর মধ্যে একটি টিম চালানো আরো কঠিন। এই কাঠিন্যকে জয় করেছেন মুস্তাফিজ শফি। তিনি এক দিনে তৈরি হননি। তিল তিল শ্রম, মেধা, চিন্তার প্রখরতায় ব্যাপ্তি ঘটিয়েছেন। শফিকে যেতে হবে আরো অনেক দূর।

মুস্তাফিজ শফি একজন কবি। তাঁর মধ্যে একটি সারল্য আছে। কবিরা এমনই হন। শামসুর রাহমানকে কাছ থেকে দেখেছি। শফির আরেকটি বড় গুণ বিনয়। এ জগতে সবাই পারেন না। কিছু মানুষ পারেন। শফি তাঁদের একজন।

প্রিয় মুস্তাফিজ শফি এগিয়ে চলছেন, এগিয়ে যান। মেধা, মনন, চিন্তার প্রখরতা আরো উজ্জ্বল হোক। সৃষ্টিশীলতার ক্ষমতা সবার থাকে না। একজন মুস্তাফিজ শফির আছে। সাহস ও শক্তিটুকু যেন চিরস্থায়ী হয় সেই প্রার্থনা করছি। আগামী দিনের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে দরকার সাহসী মিডিয়া সংগঠকের। সম্পাদক পরিষদে শফি আমার সহকর্মী। মিডিয়ায় সবাই তাঁকে চেনেন একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে। কালের কণ্ঠ’র শুরুটা মনে আছে। একদিন বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহানের রুমে বসে ছিলাম। একসঙ্গে এলেন আবেদ খান আর শফি। দুজনই ব্যস্ত কালের কণ্ঠ’র প্রকাশনা প্রস্তুতি নিয়ে। আমি তখন পত্রিকা নয়, বসুন্ধরার সঙ্গে ব্যস্ত একটি টিভি করা নিয়ে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের পরিকল্পনা আরেকটু পরে। সে প্রসঙ্গ থাক। বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বললেন, কালের কণ্ঠ নিয়ে চিন্তা নেই। আবেদ খান চাচা আর মুস্তাফিজ শফি আছেন। এই দুজনের ওপর সব কিছু ন্যস্ত করেছি। মিডিয়ায় এই নির্ভরশীলতাটুকু দরকার।

সংবাদপত্রের এক কঠিনতম সময় যাচ্ছে। এ যুগে কেউ কারো প্রশংসা করে না। ভালো কথাটুকু বলতে আমরা ভুলে যাই। কালের কণ্ঠ’র শুরুতে ভূমিকা রেখেছেন মুস্তাফিজ শফি। তিনি এই পত্রিকার প্রতিষ্ঠাকালীন নির্বাহী সম্পাদক। কালের কণ্ঠে বেশিদিন না থাকলেও তাঁর যাত্রা থেমে থাকেনি। আপন মহিমায় তৈরি করেছেন সৃষ্টিশীলতার ঠিকানা। স্বপ্নকে দিয়েছেন নতুন রূপ। আলোর দিশারি হয়ে পথ চলেছেন নিজের গতিতে। সময়টা এখন কঠিন।

সাফল্য অর্জনের চেয়ে ধরে রাখা কঠিন। সেই কঠিনকে ভালোবেসে কিছু মানুষ কাজ করেন। শফি তাঁদের একজন। বিশ্বাস করি, শফি আগামীর মিডিয়াকে আরো আলোকিত করবেন। ছড়িয়ে দেবেন আলোর শিখা। সব সময় আমি আশাবাদী মানুষ। মেধাবী মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। পেশাদারিরও বড় অভাব। এই অভাব পূরণে কিছু মানুষকে বেশি কাজ করতে হয়, বিশেষ করে এই সময়ের চ্যালেঞ্জ অনেক। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সংবাদপত্রের প্রকাশনা টিকিয়ে রাখা। ২০২০ সালের এপ্রিলে অনেকের প্রস্তাব ছিল পত্রিকা বন্ধ করার। আলাপ-আলোচনা আমাদের মধ্যেও শুরু হয়। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান একদিন ফোন করে বললেন, ‘তোমার কাছে কী মনে হয়?’ বললাম, পত্রিকা বন্ধ করা যাবে না। এতে একটি পেশা হুমকিতে পড়বে। একবার বন্ধ করলে এত মানুষের রুটি রুজির কী হবে? আর হকাররা পেশা ছেড়ে দিলে ফিরবে না সহজে। আমাদের ভাবতে হবে। আমি মনে করি, পত্রিকা টিকিয়ে রাখতে প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে হবে। মতি ভাই বললেন, ‘আমার ভাবনাও একই।’ সেদিন শফিও আমাদের সঙ্গে একমত হয়েছিলেন। আমরা লড়েছি। করোনায় আমি আক্রান্ত হয়েছিলাম। শফিও আক্রান্ত হন। এখন আমরা ভালো আছি। বাংলাদেশের প্রিন্ট মিডিয়া একটি অবস্থানে টিকে আছে। এই টিকে থাকাটাই ধরে রাখতে হবে। আগামীকে ধরে রাখতে হবে বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে।

সব শেষে প্রিয়ভাজন শফিকে হিকির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। বাংলা গেজেট প্রকাশ করেন হিকি। প্রথম সংবাদপত্র আমাদের ভূখণ্ডে। ইংরেজ মানুষটি পত্রিকা বের করার পর স্বজনরা খুশি হয়েছিল। সবাই আশা করেছিল হিকি ইংরেজদের স্বার্থ সংরক্ষণ করবেন। কিন্তু হিকি তা করেননি। তিনি মানুষের কথা বলেছেন সংবাদপত্রে। ইংরেজদের অপকর্ম তুলে ধরেছেন। প্রশাসনের অনিয়মের খবর ছিল তাঁর পত্রিকায়। ইংরেজদের লুটপাটের কাহিনিও বাদ যায়নি। এমনকি ইংরেজ সেনাদের ব্যর্থতা ও লোভের খবরও প্রকাশিত হতো। ব্যস, আর যায় কোথায়? সব কিছু তুলে ধরার কঠিন খেসারত হিকিকে দিতে হয়েছিল। পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। কারাবরণ করতে হয় তাঁকে। প্রেস জব্দ হয়। সংবাদপত্র কারো আপন নয়। সংবাদপত্র মানুষের কথা বলে। মুস্তাফিজ শফি একজন নির্ভীক সাংবাদিক। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকায় মানুষের কথা ঠাঁই পায়। দেশের কথা উঠে আসে। তাঁর কবিতার কথা ভালো বলতে পারব না। তবে একজন মানুষ গদ্য, পদ্য দুটিই লিখে চলেছেন। এ যুগে এমন সম্পাদকের সংখ্যাও কম। আমি শফির সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করি। আমার শেষ কথা—প্রত্যাশার জায়গাটুকু ধরে রাখতে হবে। আগামী দিনের সংবাদপত্রের কঠিনতম লড়াইকে এগিয়ে নিতে হবে। সাদাকে সাদা বলার এই দৃঢ় প্রত্যয় ধরে রাখতে হবে। অনেক শুভ কামনা প্রিয় মুস্তাফিজ শফি।

লেখক : সম্পাদক, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন সাধারণ সম্পাদক, সম্পাদক পরিষদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা