kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

সড়ক দুর্ঘটনা নাকি সড়ক দুর্যোগ

মো. শাহ জালাল মিশুক

১৯ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সড়ক দুর্ঘটনা নাকি সড়ক দুর্যোগ

মৃত্যু অনিবার্য। কেউ তা থামাতে পারবে না। তবে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন। রাত পোহালেই নতুন জীবন-বিয়ে, কিন্তু এর আগেই সড়কে প্রাণ গেল যুবকের। ছেলেকে মাইক্রোবাসে তুলে দিয়ে বাবা বাড়ি ফিরলেন লাশ হয়ে। মাকে দেখতে বিদেশ থেকে দেশে ফিরতে পারলেও বাড়িতে পৌঁছানোর রাস্তায় হয়ে গেল নিথর মৃতদেহ। বাংলাদেশের সড়কে এমন সব করুণ কঠিন ট্র্যাজেডির জন্ম হচ্ছে প্রতিদিন।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৫ হাজার ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। আবার সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএর হিসাব মতে, প্রতিদিন সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় প্রায় ৩০ জন। সে হিসাবেও বছরে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজার ৮০০। আবার বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বছরে ১২ হাজার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রেকর্ড অনুযায়ী ২০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। অন্যদিকে বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্স ইনস্টিটিউট (এআরআই) এবং নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর ১২ হাজার মানুষ নিহত হয়। এটা ঠিক যে পৃথিবীর সব দেশেই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু সেসব দেশে যথাযথভাবে বিচারের মুখোমুখি হন চালকরা। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশে ব্যতিক্রম।

গত বছর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় চার হাজার ৯৯৬ জনের মৃত্যু এবং পাঁচ হাজার ৮৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ও সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন এবং টেলিভিশন ও অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। নিসচার হিসাবে, গত এক বছরে চার হাজার ৯২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। রেলপথ ও নৌপথে দুর্ঘটনায় মোট ৩৪১ জন মারা গেছে। এর মধ্যে রেলপথে ১২৯ জন নিহত ও ৩১ জন আহত এবং নৌপথে ২১২ জন নিহত ও ১০০ জন আহত হয়। পাশাপাশি গত বছরের জানুয়ারিতে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ওই এক মাসে ৪৪৭টি দুর্ঘটনায় ৪৯৫ জন নিহত ও ৮২৩ জন আহত হয়েছে। এরপর গত বছরের এপ্রিল ও মে মাসে তুলনামূলক কম দুর্ঘটনা ঘটেছে। এপ্রিলে ১৩২ ও মে মাসে ১৯৬টি দুর্ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। মহামারি করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে দেশে সাধারণ ছুটি ও লকডাউন থাকায় এই দুই মাসে দুর্ঘটনা কম হয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদায়ি বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ছয় হাজার ৬৮৬ জন। আহত হয়েছে আট হাজার ৬০০ জন। সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ বেপরোয়া গতি। বেশির ভাগ দুর্ঘটনাই গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনা। এ ছাড়া রেলপথে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৩১৮ জন ও নৌ দুর্ঘটনায় ৩১৩ জন অর্থাৎ সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে সাত হাজার ৩১৭ জন। সংগঠনটি বলছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে মোটরসাইকেলে সড়ক দুর্ঘটনা ৩.৭৬ শতাংশ বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘ডেলিভারিং রোড সেফটি ইন বাংলাদেশ : লিডারশিপ প্রায়রিটিস অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভস টু ২০৩০’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে মৃত্যুর হার অনেকাংশেই দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে গেছে। প্রতিবেদনের তথ্য মতে, বাংলাদেশে দুর্ঘটনাকবলিত প্রতি ১০ হাজার যানবাহনে মারা যায় ১০২ জন। পাশের দেশ ভুটানে এ সংখ্যা ১৬.৭০, ভারতে ১৩, নেপালে ৪০ ও শ্রীলঙ্কায় সাত। প্রতিবেদনে বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার যানবাহনের দুর্ঘটনায় গড়ে দুজন সাইকেলচালকের মৃত্যু হয়। দুই বা তিন চাকার মোটরযানের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ১১.২০। আর গাড়ি ও হালকা যানের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ হাজার যানের দুর্ঘটনায় ১৩.৩০ জন গাড়িচালক ও ২৮.৬০ জন যাত্রী প্রাণ হারায়। ট্রাকচালকদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ৬.১০, বাসচালকের ক্ষেত্রে ৮.২০ ও বাসযাত্রীর সংখ্যা ২৮৬.৬০। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ শীর্ষে রয়েছে।

অর্থাৎ সব গবেষণা ও তথ্য-উপাত্ত পর্যবেক্ষণ করলে এটা বুঝতে অসুবিধা হবে না যে প্রতিনিয়ত সড়কে বিশৃঙ্খলার দরুন প্রাণহানির ঘটনা বেড়েই চলেছে; এমনকি বৈশ্বিক মহামারি করোনা পরিস্থিতিতে এই প্রাণহানি থেকে মানুষকে রক্ষা করা যায়নি। তাই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাংলাদেশের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো হলো টেকসই ও নিরাপদ যানবাহনের ব্যবস্থা করা, দক্ষ চালক নিশ্চিত করা, চালকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা, শহরগুলোয় নিরাপদ গতি ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত নিরাপত্তা ও নতুন প্রযুক্তি সংযোজন করা ইত্যাদি। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশ থেকে হাট-বাজার অপসারণ এবং ফুটপাত বেদখল মুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যদের যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের জন্য আধুনিক ও মানসম্মত ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্রে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনা এখন শুধু নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং অনেকাংশেই এটা দুর্যোগের পর্যায়ে চলে গেছে। তাই সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অতিদ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা যেন সড়ক দুর্যোগে রূপ না নিতে পারে সেদিকে কঠোর নজর দিতে হবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, চুয়েট ও কলাম লেখক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা