kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

শুভ জন্মদিন

গণতন্ত্রমনা মানুষ তাঁকে হৃদয়ে ঠাঁই দিয়েছে

সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল

১৯ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গণতন্ত্রমনা মানুষ তাঁকে হৃদয়ে ঠাঁই দিয়েছে

১৯৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রথম প্রহরে কালুরঘাট বেতার থেকে সাহসী উচ্চারণে ‘আমি মেজর জিয়া বলছি’—এই ছোট্ট বাক্যটি বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমানকে (বীর-উত্তম) প্রাসঙ্গিক করে তোলে। ২৭ মার্চ জিয়ার ঘোষণা এ দেশের পরবর্তী গতিপথ বদলে দেয়। স্বাধীন বাংলাদেশ আজ নানা ক্ষেত্রে অনেক এগিয়েছে। মাঝে ঘটে গেছে বিয়োগান্তক ১৯৭৫-১৯৮১-সহ অনেক করুণ কাহিনি। শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারসহ নির্মম মৃত্যুর পর তাঁর অনুসারীরাই জাতীয় সংসদ চলমান রেখে রাষ্ট্রক্ষমতায় বহাল থাকেন। ক্রমেই ক্ষমতার পালাবদলে অবস্থা স্থিত হয় জিয়াউর রহমানের উপস্থিতিতে। জিয়াউর রহমান নতুন স্বপ্ন দেখিয়ে হাজির হন গ্রামের মানুষ থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বরণ্যেদের মাঝে। হতাশ মুখের সাধারণ নাগরিকদের মুখে হাসি ফুটে ওঠে পর্যায়ক্রমে। ফসলের ক্ষেত, সরকারি কর্মক্ষেত্র, শিল্প-কারখানা—সব জায়গায় একটা জোয়ার এলো। তখন একটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ছিল একান্ত কাম্য। জন্ম নিল বিএনপি। ক্ষমতায় থেকে বিশেষত সেনাছাউনিতে জন্ম নেওয়া কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতাচ্যুত হলে সাধারণত হারিয়ে কিংবা গুরুত্বহীন হয়ে যায়। ব্যতিক্রম হলো বিএনপি এবং এর প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। ব্যতিক্রমী স্বপ্ন, বাস্তব পরিবর্তন, উপযোগী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাধারণ মানুষের কাছে সাধারণের মতোই বারবার হাজির হওয়া সততা, নিখাদ দেশপ্রেম জিয়াকে ঠাঁই দিয়েছে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর অন্তরে। একই সঙ্গে তাঁর দল বিএনপিকেও মানুষ গ্রহণ করেছে আপন ভেবে।

রাজনীতির স্বাভাবিক ব্যাকরণেই তাঁর শক্তিমান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যত তাঁঁকে খলনায়ক বানাতে চেয়েছে—গণতন্ত্রমনা মানুষ তত বেশি তাঁকে অন্তরে ঠাঁই দিয়েছে। সাড়ে তিন বছরের দেশ পরিচালনায় যেমন দেশবাসীকে স্বস্তি এবং সম্ভাবনা দিয়েছেন। সম্ভাবনার বাস্তবায়নের জন্য আবার জাতীয় শক্তিকে এক কাতারে একটি ছাতার নিচে নিয়ে এসে দলও উপহার দিলেন। প্রথম ফোর্সেস কমান্ডার (Z Force)। তিনি বীর-উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত এবং একমাত্র বাঙালি অফিসার, যিনি স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রথম প্রহরেই তাঁর পাকিস্তানি কমান্ডারকে হত্যা এবং অন্যদের বন্দি করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। আবার স্বাধীন দেশের একজন সুশৃঙ্খল সেনা কর্মকর্তার মতো ব্যক্তিগত ক্ষতি মেনেও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুগত ছিলেন। বহু গুণাবলির ধারক ছিলেন জিয়া।

পরিবর্তিত রাজনীতির পালাবদল-উত্তর বাংলাদেশকে গণসাক্ষরতা, খাল খনন, কৃষি উন্নয়ন, শিল্পোৎপাদন ও প্রসার, যুব প্রশিক্ষণ, আত্মকর্মসংস্থান উপহার দিয়ে মানুষকে কর্মোদ্যমী করেছেন। পাশাপাশি পল্লী উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, কুটির শিল্প, শিশু-কিশোর প্রতিভা বিকাশে রেখেছেন সুদূরপ্রসারী শুভফল। গ্রামের মানুষের জন্য পল্লী বিদ্যুতায়ন কর্মসূচি তাঁর এক যুগান্তকারী অবদান। আজ দক্ষিণ আফ্রিকাসহ অনেক দেশে এই মডেল গৃহীত হয়েছে। স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক ও জাতীয় শিশু পুরস্কার—এগুলো তাঁর অবদান।

জিয়া হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সময়ে তাঁর জানাজায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি তাঁর প্রতি জাতির অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রমাণ। তখন জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ-মুসলিম লীগ-জাসদ-ন্যাপ (মোজাফফর), রাশেদ খান মেনন, মো. তোয়াহা-সুরঞ্জিত সেনগুপ্তরা বিএনপির সঙ্গে মিলে সর্বসম্মত শোক প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছিলেন, ‘৩০ মে থেকে ৩ জুন পর্যন্ত যে লাখ লাখ জনতা শুধু ঢাকা নগরীতেই নয়, গোটা দেশে তাদের অনুভূতির মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন জিয়া বাংলাদেশের মানুষের কত কাছাকাছি এবং প্রাণপ্রিয় ছিলেন। এটুকু বলতে যদি কেউ কুণ্ঠাবোধ করেন, তবে সেটা তার মানসিক দৈন্য। গায়েবানা জানাজা এবং জানাজায় লাখ লাখ প্রাণের পরশ এসেছিল জিয়ার সততার প্রতি অভিনন্দন ও শ্রদ্ধা জানাতে।’ আজকে অনেক দলকানা জিয়াকে অবজ্ঞা করেন। কিন্তু পুরো বিশ্ব তখন শোকে মুহ্যমান এবং জিয়ার প্রশংসায় মুখর ছিল। বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলামের মতে, ‘এটা কল্পনা করাও কঠিন যে জিয়া যদি ১৯৮১-এর বদলে ১৯৭৫-এ নিহত হতেন, তাহলে বাংলাদেশ খুব সহজেই আফগানিস্তান বা লাইবেরিয়ার মতো হতে পারত, জিয়া সেই পরিণতি থেকে দেশকে বাঁচিয়েছেন।’ লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ মাহমুদ আলীর মতে, ‘স্বাধীনতা বাংলাদেশকে যে ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছে, অস্থিরতা সত্ত্বেও জিয়ার শাসন আমল এই রাষ্ট্রকে তার চেয়ে বেশি মজবুত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছে। আর শহীদ জিয়া বীর-উত্তম তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিএনপির দলীয় সংগীত হিসেবে যে গানটি গ্রহণ করেছিলেন কাকতালীয়ভাবে তাঁর নিজের বেলায় একাকার হয়ে গেল। ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ—জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ’-এর মতো জনগণের জিয়ার প্রথম পরিচয় চট্টগ্রাম বেতারে স্বাধীনতার ঘোষণায়, আবার জনতার জিয়ার শারীরিক সমাপ্তিও সেই বাংলাদেশের চট্টগ্রামের মাটিতে। তাইতো বলা হয়, সারা বাংলার ধানের শীষে—জিয়া তুমি আছ মিশে।

লেখক : যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা