kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

উপজেলা প্রশাসনে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কাম্য নয়

এম হাফিজউদ্দিন খান

১৭ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



উপজেলা প্রশাসনে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কাম্য নয়

স্থানীয় সরকারের তাৎপর্য হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কর্মপ্রক্রিয়ায় স্থানীয় স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু আমাদের উপজেলাগুলোতে উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ের কারণে স্থানীয় সরকারের মূলমন্ত্র চাপা পড়ে গেছে। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের কাজে বাধা তৈরি করছে ইউএনওদের আমলাতান্ত্রিক মনোভাব। তাঁদের আরো অভিযোগ, ইউএনওরা উপজেলা পর্যায়ে শাসকের ভূমিকা পালন এবং জনপ্রতিনিধিহীন সামন্তবাদী শাসন প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র করছেন। ইউএনওরা উপজেলা পরিষদ নয়, উপজেলা প্রশাসন পরিভাষা ব্যবহার করেন। এই অভিযোগের মধ্য দিয়ে উপজেলা পর্যায়ে শাসনব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলার বিষয়টি আবার সামনে এলো। উপজেলা পরিষদ আইনে  উপজেলা পরিষদকে ‘প্রশাসনিক একাংশ’ হিসেবে স্বীকৃত দেওয়া হয়েছে। সংবিধানে ৫৯ অনুচ্ছেদ সুস্পষ্টভাবে ‘প্রশাসনের একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার’ নির্বাচিত পরিষদকে দেওয়া হয়েছে; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

উপজেলা পরিষদ স্থাপনের শুরু থেকেই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব লেগে আছে। ১৯৮০-এর দশকে এরশাদ সরকারের সময় যখন উপজেলা পরিষদ গঠন করা হয়, তখন আমি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে ছিলাম। সেখানে আমি উপজেলা পরিষদের কার্যক্রম দেখতাম। তখনো ইউএনও-চেয়ারম্যান বিরোধ ছিল। এসব বিরোধ নিষ্পত্তি নিয়ে আমাকে অনেক সালিস করতে হয়েছে। আমার কাছে চেয়ারম্যানরা এসেছেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা এসেছেন। তাঁদের কথা শুনেছি, মীমাংসা করেছি। তখন কোনো কোনো এমপিও আসতেন নানা অভিযোগ ও আবদার নিয়ে। কোনো কোনো এমপি তো তাঁর এলাকার উপজেলা চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করার জন্য প্রভাব খাটানোর কিংবা প্রলোভন দেখানোর চেষ্টাও করতেন। অর্থাৎ তখন থেকেই এমপিরা উপজেলা পরিষদের কাজে হস্তক্ষেপ করতেন, যেটা আজও আছে। ইউএনও, চেয়ারম্যান ও এমপিদের মধ্যে এই ত্রিপক্ষীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বে উপজেলা পরিষদ এখনো প্রকৃত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি।

১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে উপজেলা পরিষদ বাতিল করে দিয়েছিল। পরের বছর ১৯৯২ সালে তারা এমপিদের উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করে একটা প্রস্তাব আনে। তখন আমাকে এ বিষয়ে একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করে দিতে বলা হয়েছিল। তবে আমি আমার প্রতিবেদনে লিখেছিলাম, এটা সম্ভব নয়। প্রথম কথা হলো, তখন উপজেলা পরিষদ ছিল ৪৬২টি। আর এমপি হলেন ৩০০ জন। আবার আইনগত বাধাও ছিল। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত এটা হয়নি বলে রক্ষা। মোটকথা, উপজেলা পরিষদের ওপর কর্তৃত্ব আরোপের চেষ্টা সব সময়ই ছিল।

সাম্প্রতিককালে উপজেলা পরিষদের ওপর হস্তক্ষেপ বেড়ে গেছে। বিদ্যমান উপজেলা পরিষদ আইন  ১৯৯৮-এ উপজেলা পরিষদ গঠনের জন্য একজন চেয়ারম্যান এবং দুজন ভাইস চেয়ারম্যানের সঙ্গে পরিষদের সদস্য করা হয়েছে উপজেলার আওতাভুক্ত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌরসভার (যদি থাকে) মেয়র এবং সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের। আর উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা করা হয়েছে এবং তিনি পরিষদকে সাচিবিক সহায়তা প্রদান করবেন বলে আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিষদের উপদেষ্টা করা হয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে, যাঁর উপদেশ গ্রহণ এবং সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাঁকে অবহিতকরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইনে তিনটি বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত, উপজেলা পরিষদ একমাত্র স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, যার কোনো সচিব নেই। ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আছে, পৌরসভায় সচিব আছে, জেলা পরিষদে সচিব আছে; কিন্তু উপজেলায় নেই। দ্বিতীয়ত, উপদেশ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করে পরিষদের ওপর এমপির কর্তৃত্বের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই সুযোগে সংসদ সদস্যরা চেয়ারম্যানদের পাশ কাটিয়ে ইউএনওকে আদেশ-নিষেধ বা দিকনির্দেশনা দেন। ফলে আইনগতভাবেই উপজেলাকে একটা বিরোধপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। তৃতীয়ত, চেয়ারম্যানরা যখন তাঁদের ক্ষমতার চর্চা করতে চান, তখন ইউএনওরা সেটা মানতে রাজি হন না। কারণ চেয়ারম্যানের কথা মানার বিষয়ে ইউএনওদের কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতাও নেই। আবার স্থানীয় এমপির সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখেন এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এমন উপজেলা চেয়ারম্যানরাও ইউএনওদের হেনস্তা করেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। এর ফলে ইউএনওরা হয়তো নিজেদের গুরুত্ব হারানোর আশঙ্কায় থাকেন। ফলে উপজেলা পরিষদের সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে।

প্রথম যখন উপজেলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করা হয়, পরিষদের সমস্যাগুলো দেখার জন্য নিকারকে (ন্যাশনাল ইমপ্লিমেনটেশন কমিটি ফর অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিফর্ম) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। উপজেলা পর্যায়ে সরকারের যেসব বিভাগ রয়েছে, সেসব বিভাগের সচিবরা মাসে একবার নিকারে আসতেন। সেখানে নানা সমস্যা দেখা হতো। নতুন আইনে সম্ভবত নিকারকে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। নিকারকেও এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় না। পরে ওয়ান-ইলেভেনে আসা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটা ভালো উদ্যোগ ছিল। তারা স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে একটা লোকাল গভর্নমেন্ট কমিশন করেছিল। কমিশন উপজেলা পরিষদের সমস্যা দেখবে, পরামর্শ দেবে এবং সালিস মীমাংসা ইত্যাদি করবে বলে উল্লেখ ছিল। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে লোকাল গভর্নমেন্ট কমিশন বাতিল করে দেয়। ফলে উপজেলা দেখার মতো কেউ নেই।

স্থানীয় সরকার ধারণাটি হচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের একটা মিথস্ক্রিয়া, যাতে স্থানীয় আকাঙ্ক্ষা ও কল্যাণ অগ্রাধিকার পায়। জনগণের পক্ষে কাজটি করে নির্বাচিত পরিষদ। স্থানীয় সরকারকে যতটা না আইনগত, তার চেয়ে বেশি সহজাত প্রতিষ্ঠান বলা হয়;  যতটা না রাজনৈতিক, তার চেয়ে বেশি সামাজিক প্রতিষ্ঠান বলা হয়। কিন্তু আমাদের উপজেলা পরিষদ এই চেতনা থেকে অনেক দূরে। স্থানীয় সরকার সম্পর্কে আমাদের সংবিধানে যেটা বলা আছে,  সেটাও কার্যকর নেই। আমাদের কেন্দ্রীয় সরকার কোনো ক্ষমতা হাতছাড়া করতে চায় না। বাস্তবে উপজেলা পরিষদ কেন্দ্রীয় সরকারের আজ্ঞাবহ বিভাগে পরিণত হয়েছে। উপজেলাগুলো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের হুকুমে চলে। না হয় এমপির হুকুমে চলে। না হয় ইউএনও সাহেব বাধা দেন। এসব কারণে দৃশ্যমান স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপজেলাকে দেখা যায় না।

উপজেলা পরিষদে আরেকটা সমস্যা হচ্ছে, উপজেলা পর্যায়ে থাকা সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব নিয়ে। উপজেলা পর্যায়ে সরকারের ১৭টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা আইনে উপজেলা পরিষদে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু আজও ১৭টি অফিস এক ছাতার নিচে আসেনি। উপজেলা চেয়ারম্যানের মন্ত্রণালয় হলো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং ইউএনওর মন্ত্রণালয় হলো ক্যাবিনেট ডিভিশন। ১৭টা ট্রান্সফার্ড প্রতিষ্ঠানও যার যার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে। ফলে উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনিক কাজে কো-অর্ডিনেশন একটি মারাত্মক সমস্যা।

এই পরিস্থিতিতে উপজেলা পরিষদকে একটা কার্যকর স্থানীয় সরকার হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। উপজেলা পরিষদকে কার্যকর ও উন্নত করা এবং এর কার্যক্রম মনিটরিং করার লক্ষ্যে একটি কমিশন গঠন করা দরকার। উপজেলা পরিষদ নিয়ে একটা ইনডেপথ গবেষণাও করা যেতে পারে। ১৭টি ট্রান্সফার্ড প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত পরিষদের সঙ্গে কিভাবে কাজ করবে তা সুস্পষ্ট করতে হবে। সংসদ সদস্যদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। চেয়ারম্যানরা যাতে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি ইউএনওদের হেনস্তা করতে না পারেন, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে ইউএনও সেতুবন্ধের কাজ করবেন—সে ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আরেকটা বিষয় হলো, স্থানীয় সরকার পরিষদগুলোকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবমুক্ত রাখতে দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে। দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচনের কারণে স্থানীয় সরকার অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। উপজেলা পরিষদের জন্য একজন সচিব দরকার, সেটাও করতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারকেও সব কিছু আঁকড়ে ধরার মানসিকতা ছাড়তে হবে। সর্বোপরি উপজেলা পরিষদকে কার্যকর করতে হলে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

অনুলিখন : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা