kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

‘আপনা-মাঝে শক্তি ধরো’

গোলাম কবির

১৬ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘আপনা-মাঝে শক্তি ধরো’

জগেজাড়া করোনা বিপর্যস্তকালে বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষের আনুষ্ঠানিক আয়োজন চলছে। আমরা শঙ্কিত, এই আয়োজনের পথে কিছু মানবরূপী দানব কৃত্রিম সংকট তৈরি করে একটা ধূম্রজাল সৃষ্টি করতে চায়। যুগে যুগে অন্ধকারের জীবরা ভেলকিবাজি করে শুভ উদ্যোগকে বানচাল করতে চেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এদের পূর্বপুরুষরা তেমনটি করতে চেয়েছিল। পারেনি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের পতাকাবাহী মুক্তিকামী জনগণ রক্ত আর সম্ভ্রমের বিনিময়ে তা রুদ্ধ করেছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র জন্ম হয়েছে। তবে ওই অপশক্তি আজও ঘাপটি মেরে বসে আছে। তার আলামত দেখা যাচ্ছে ভাস্কর্যের অবমাননায়। বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য অবমাননাকারীরা মানুষের ক্ষুধামুক্তির দোহাই দিয়ে অপকর্মে লিপ্ত হয়েছিল একদা। আজ পৌত্তলিকতার বাহানা খাড়া করে তাই করছে মানবমুক্তির অধিনায়কের জন্মশতবর্ষ উদযাপনের আয়োজনকালে। এদের আসল উদ্দেশ্য, মানুষের মুক্তি কিংবা ধর্ম নয়, ক্ষমতা দখল করে বংশানুক্রমে ভোগের আয়োজন।

গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘সাতটি তারার তিমির’ (১৯৪৮) কবিতাগ্রন্থের ‘সমারূঢ়’ কবিতায় মনন-সংস্কৃতির ব্যভিচার প্রত্যক্ষ করে শঙ্কিতচিত্তে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ।’ —সেই আঁধার মাঝেমধ্যে ঘুটঘুটে হয়ে ওঠে মতলববাজদের কৃত্রিম কর্মকাণ্ডে। এরা শিক্ষাঙ্গন এবং সাংস্কৃতিক ভুবনকে কালিমালিপ্ত করে। এরা আবার সনদধারী মাকাল ফল! রাষ্ট্রীয় আর সামাজিক সংস্কৃতিতে তেমনি আত্মসর্বস্ব ভুয়া দেশপ্রেমিক চিরকালই ছিল। তারা থাকবে। এ থাকাটা একেবারে অমঙ্গল নয়, কারণ এর মাধ্যমে মানুষ আলো-আঁধারের পার্থক্য বুঝে নেয়। ইতিহাসের দ্বারস্থ হই, বেনিয়া শাসন থেকে মুক্তির মশাল হাতে নজরুল ইসলাম ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। রবীন্দ্রনাথ পত্রিকাকে আশীর্বচন জ্ঞাপন করতে গিয়ে লিখেছিলেন : ‘আয় চলে আয়রে ধূমকেতু, আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু’ (১৯২২)। সেই অগ্নিসেতু নির্মাণের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন বাঙালিশ্রেষ্ঠ বঙ্গবন্ধু মাত্র ৪৯ বছরের মধ্যে। তাঁর কাছে ‘সে আঁধার আলোর অধিক’ ছিল। আমরা তাঁর জন্মশতবর্ষ উদযাপন করছি। এই উদযাপন দিনক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না হয়ে আমাদের নিত্যদিনের কর্মকাণ্ডের মধ্যে তা অন্তর্ভুক্ত হোক, যেন সেখান থেকে মানবমুক্তির পাথেয় সংগ্রহ করতে পারি। উদ্দেশ্য হবে কপটচারী রাজনীতি ব্যবসায়ী আর লেফাফাদুরস্ত দুষ্কৃতকারীর অভিসন্ধি উদঘাটন করা। কারণ এসব পরিযায়ীর দুর্বৃত্তায়নের ফলে পরিবেশ কলুষিত হতে চলেছে। ‘সেকেন্ড হোম’ আর ‘বেগম পাড়া’ গড়ে উঠছে।

বঙ্গবন্ধু চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, তিনি মানবহিতৈষী। মানুষের যেটুকু সীমাবদ্ধতা থাকার কথা, তা হয়তো তাঁর মধ্যে কিছুটা থাকা অস্বাভাবিক নয়। না হলে অ্যারিস্টটলের ভাষায় দেবতা অথবা দানব হতেন। এতৎসত্ত্বেও সব সীমাবদ্ধতা পায়ে মাড়িয়ে তিনি বাঙালি জাতির পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছেন এবং তাদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছেন। লেখা বাহুল্য, এমন দৃষ্টান্ত কি খুব বেশি আছে?

আমরা বলছিলাম, মানবহিতৈষী সত্যিকার মানুষ বঙ্গবন্ধু। রবীন্দ্রনাথ ১৩০২ বঙ্গাব্দের ২৬ চৈত্র ‘চৈতালি’ রচনাকালে হতোদ্যম, অদৃষ্টনির্ভর ছিদ্রান্বেষী বাঙালি সম্পর্কে আক্ষেপ করেছিলেন;

সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,

রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি

একই সালের ১৩ শ্রাবণ, অর্থাৎ সাড়ে তিন মাসের মাথায় কবির ধারণা পরিবর্তিত হয়েছে। তাইতো দেখা যায় বিদ্যাসাগরের তিরোধানের পর তাঁর স্মরণসভায় এমারন্ড থিয়েটারে কবি বলেছিলেন, বিদ্যাসাগর ছিলেন ‘যথার্থ মানুষ’। যে পরার্থপর মনুষ্যত্বের শক্তিতে যাঁকে যথার্থ মানুষরূপে অভিহিত করা যায়, তার পরিচয় আমরা বঙ্গবন্ধু চরিত্রে প্রত্যক্ষ করি। তিনি উচ্চশির অনমনীয় থেকেছেন, ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য নয়, বরং একটি জাতির নবজাগরণ এবং সামগ্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য।

বঙ্গবন্ধু জাতি বা ধর্মের পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার আগে মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে শ্লাঘাবোধ করতেন। তাইতো তিনি জাতিসংঘে প্রদত্ত ভাষণে সেই বিশ্বাস ব্যক্ত করেন। মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুর বাঙালিশ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠার এবং সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরম্পরা দেখে যাওয়ার সুযোগ পেলে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে এমন অভিধায় অভিহিত করতেন, যার পূর্বাভাস রেখে গেছেন ‘সভ্যতার সংকট’ রচনায় (পহেলা বৈশাখ, ১৩৪৮)। সেই প্রতিধ্বনি আজও বাঙালির হৃদয়তন্ত্রীতে বেজে চলেছে। অবশ্য কতিপয় সুবিধালিপ্সু সেই অভিধা মলিন করতে তৎপর।

যথার্থ মানুষ ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভাবেন না, ভাবেন মানবজাতির কল্যাণ। বাঙালিকে শৃঙ্খল মুক্ত করে শুধু তাদের জন্য নয়, বিশ্বের অধিকারবঞ্চিত উত্পীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে দ্বিধাবোধ করেননি বঙ্গবন্ধু। তিনি অকপটে তাদের পক্ষে রায় দিয়েছেন। নবীন রাষ্ট্রের পরিচালনার ভার কাঁধে নিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, আশরাফ-আতরাফের প্রকট বৈষম্য ঘোচাবার কথা। কৃষক-শ্রমিক-জনতার শ্রমের ঘামের বিনিময়ে যাঁরা সমাজের উচ্চাসনে বসার সুযোগ পেয়েছেন, তাঁরা যেন কোনোক্রমেই বিজাতীয় আচরণে তাঁদের অবহেলার দৃষ্টিতে না দেখেন। পূর্বসূরিদের প্রতাপ খাটাতে না পারার আশঙ্কায় তথাকথিত অভিজাতরা বাংলাদেশবিরোধীদের সঙ্গে আঁতাত করে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে প্রথম থেকেই। যার ভয়াবহ পরিণতি ইতিহাস ধরে রেখেছে রক্তাক্ত ১৫ই আগস্ট।

এ সত্য অমূলক নয় যে দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতিকে দেউলিয়া বানাবার কুশীলবদের অনেকেই কৃষক-শ্রমিকের পয়সায় শিক্ষার সুযোগ পেয়ে কলম দিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থেকেছে। আবার দেশসেরার নামে রাজনীতি করতে এসে কেউ কেউ ‘হগলডা’ নিজের পকেটে পুরতে ব্যস্ত। বঙ্গবন্ধু এতসব শোষণের চাতুর্য বন্ধ করতে সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর ভাবনা ছিল মানুষ যেন মানুষ হিসেবে বাঁচতে পারে। মতলববাজরা যেন আধিপত্য বিস্তারী না হয়। দুর্ভাগ্য, তা হয়ে ওঠেনি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের দরিদ্র ঘোল বিক্রেতা ফাজুকে বঙ্গবন্ধু পাঞ্জাবির পকেটে যা ছিল তা উজাড় করে দিয়েছিলেন। এই অসামান্য ঘটনা আমরা দেখেছি, এখন তথাকথিত ক্ষমতাবান শিক্ষিতরা ওই দরিদ্র মানুষের স্বপ্ন ভেঙে নিজেদের পকেট পুরছে।

চারপাশে দেখছি কৃত্রিম বঙ্গবন্ধু প্রেমিকদের জোর গলার আওয়াজ। দুঃখে তাদের বুক ফাটে না, চিৎকারে গলা ফাটে। মনে পড়ছে শরৎচন্দ্রের ‘বিলাসী’ গল্পের একটি চরিত্রের কথা। যিনি স্বামী ছাড়া এক মুহূর্ত বাঁচতে নারাজ, তাঁকে মৃত স্বামীর শবদেহের কাছে একাকী থাকার জন্য বলা হলে ভয়ার্ত চিৎকারে আর্তনাদ করে ওঠেন। দুঃসময়ে আমরা এবংবিধ আচরণ করতে অভ্যস্ত। আমরা গাছেরটা ভোগ করব, তলেরটাও কুড়াতে নানা কৌশলের ফাঁদ পাতি। বঙ্গবন্ধু যা ঘৃণার চোখে দেখতেন, তাই করে প্রকারান্তরে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছি। ফলে কিছু দুর্বৃত্ত-কামলা ভাস্কর্য ভাঙার সাহস পাচ্ছে। আর সেই ফাঁকে ক্ষমতার লোভে ভাস্কর্য অবমাননাকারীদের নেপথ্যে থেকে ডুগডুগি বাজাবার অভিপ্রায়ে অশুভ পথ চেয়ে আছে। এদের অভিসন্ধি বিলোপ করতে এবং মানবপ্রেমিক বঙ্গবন্ধুর চরিত্র-মাহাত্ম্য অক্ষুণ্ন রাখতে আমাদের উচিত নিঃস্বার্থচিত্তে ভয়মুক্ত হতে হবে। যার ফলে মানবপ্রেমী বঙ্গবন্ধু সর্বজনীন হয়ে থাকবেন।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা