kalerkantho

রবিবার । ১০ মাঘ ১৪২৭। ২৪ জানুয়ারি ২০২১। ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

তারুণ্যের শক্তিই বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে

এ কে এম আতিকুর রহমান

৩০ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



তারুণ্যের শক্তিই বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে

গত ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের তরুণদের প্রতিষ্ঠান ‘ইয়াং বাংলা’ আয়োজিত ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে ৩০টি সংগঠনকে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে কাজ করার জন্য জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড তুলে দেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। এ উপলক্ষে তিনি তরুণদের উদ্দেশে বলেন, তরুণরা কোনো অভিযোগ না করে সমাজের সমস্যা সমাধানে নিজেদের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি তাদের অন্যের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেরাই নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।

আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সেদিন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে আমাদের যুবসমাজ কালবিলম্ব না করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ ছিল ছাত্র, কেউ কৃষক, কেউ বা শ্রমিক। আর এই মুক্তিযোদ্ধাদের শতকরা ৯৫ ভাগই ছিল তরুণ। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া নিয়মিত সেনা, নৌ, বিমান, ইপিআর, পুলিশ, আনসার প্রভৃতি বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের মধ্যেও অনেক যুবক ছিলেন। বাংলা মায়ের সেই অকুতোভয় যুবকরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মৃত্যুকে হাসিমুখে বরণ করে নিতে একটুও পিছপা হননি। মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতা এই দেশের যুবকদের শক্তি ও উৎসর্গেরই ফসল।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশই তরুণসমাজ। বর্তমান লোকসংখ্যার হিসাবে দেশে সাড়ে চার কোটির বেশি তরুণ রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রথমবার, কেউ বা দ্বিতীয়বার ভোট দিয়েছে। নির্বাচনে জয় নির্ধারণে তরুণদের ভোট ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর সে কারণে প্রতিটি রাজনৈতিক দলই তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করায় সচেষ্ট ছিল।

ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে তরুণদের জন্য বেশ কিছু অঙ্গীকারের উল্লেখ ছিল। সেসব অঙ্গীকারের মধ্যে ছিল—১. ২০১৭ সালে প্রণীত জাতীয় যুবনীতির বাস্তবায়ন, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন পৃথক যুব বিভাগ ও একটি গবেষণাকেন্দ্র গঠন এবং মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি। ২. যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি শিক্ষা, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা ছাড়াও চলমান জাতীয় সেবা কর্মসূচি ক্ষেত্রকে প্রসারিত করার পরিকল্পনা। উপজেলা পর্যায়ে ‘যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ স্থাপনের মাধ্যমে বিভিন্ন ট্রেডে যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ‘কর্মঠ প্রকল্প’ ও ‘সুদক্ষ প্রকল্প’ নামে দুটি নতুন প্রকল্প গ্রহণ। ৩. গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ানো। ৪. ‘তরুণ উদ্যাক্তা নীতি’ প্রণয়ন এবং প্রয়োজনীয় ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে তরুণসমাজকে উদ্যোক্তা হতে উদ্বুদ্ধ করা। ৫. প্রতিটি উপজেলায় ‘যুব বিনোদন কেন্দ্র’ এবং জেলায় ‘মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্র’ ও ‘যুব ক্রীড়া কমপ্লেক্স’ নির্মাণ। ৬. যুবসমাজকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে দূরে রাখতে প্রয়োজনীয় পরামর্শদান এবং মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বিকশিত হওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং ৭. টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের কাজে তরুণদেরও সম্পৃক্ত করা।

এসব নির্বাচনী অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে খুব আকর্ষণীয়, লোভনীয় ও উৎসাহব্যঞ্জক হিসেবেই মনে করা হয়েছিল। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে আমাদের তরুণসমাজ অবশ্যই উপকৃত হবে। জানি না, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় আওয়ামী লীগের এসব নির্বাচনী অঙ্গীকারের কোনো চেকলিস্ট তৈরি করেছিল কি না বা দলের নেতৃত্বে যাঁরা রয়েছেন তাঁরা এগুলোর বাস্তবায়নে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেছেন কি না। নির্বাচনী ইশতেহারের পাতায় লাখ লাখ ভালো শব্দ মুদ্রণ খুব সহজ হলেও বাস্তবায়ন ততটা সহজ নয়। তাই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকা আবশ্যক। আরো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকতে পারে (ইশতেহারে যেসবের উল্লেখ নেই), যেগুলোর প্রতিও সঠিক দৃষ্টি দিতে হবে। কারণ সেগুলোও ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য শক্তিশালী তরুণসমাজ গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে।

তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই তাদের কর্মোপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। তবে আমাদের দেশে সে ধরনের পরিকল্পনার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এটা সত্য, বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার প্রশংসনীয় পর্যায়ে উন্নীত হলেও এ অর্জন দেশের বেকারত্বের হার তেমন হ্রাস করতে সক্ষম হয়নি। এর মূল কারণ হলো, দেশের বাস্তব চাহিদার নিরিখে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এমন একটি জাতীয় পরিকল্পনা থাকা উচিত, যাতে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষা সমাপনান্তে তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ খুঁজে পায়। কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা ও তরুণদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ তাদের কর্মসংস্থানে সহায়ক হবে।

প্রশিক্ষণ বা দক্ষতার জন্য তরুণসমাজকে উচ্চশিক্ষিত, মধ্যমশিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত দলে বিভক্ত করা যেতে পারে। উচ্চশিক্ষিতদের দলটি নিজেদের পছন্দমতো কাজ খুঁজে নিতে পারে। মেধাবী তরুণরা গবেষণার সুবিধা পেলে দেশের পাশাপাশি বিশ্বসম্প্রদায়ের জন্যও অবদান রাখতে সক্ষম হবে। তবে অন্যান্য দলের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বিভিন্ন খাত অনুযায়ী বিন্যস্ত করা যায়, যেমন—ক. কৃষি বা শিল্প, খ. সেবা, গ. উদ্যোক্তা, ঘ. বিদেশে চাকরি এবং ঙ. রাজনৈতিক বা সামাজিক। প্রতিটি উপজেলায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত এবং বিদ্যমান কাঠামোয় তা করা খুব কঠিন হবে বলে মনে হয় না।

বেকারত্ব হ্রাস করতে শক্তিশালী পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। আমরা জানি, তিনটি উপায়ে আমাদের যুবকদের কর্মসংস্থান হয়ে থাকে, যেমন—ক. সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান, খ. আত্মকর্মসংস্থান এবং গ. বিদেশে কর্মসংস্থান। যদি এই ক্ষেত্রগুলো সম্প্রসারিত না করা যায়, তাহলে কিভাবে আমরা বেকারত্বের হার হ্রাসের আশা করব? কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমেই শুধু এ সংকটের নিরসন সম্ভব। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা। এ ছাড়া বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির জন্যও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক।

প্রশিক্ষণের পর উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী তরুণদের জন্য ব্যাংকঋণ, আর্থিক সহায়তা ও প্রশাসনিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। এমনকি উদ্যোক্তা হওয়ার প্রাথমিক প্রক্রিয়া যেন প্রশিক্ষণ সমাপনান্তে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে থাকতেই শুরু করতে পারে, সে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এসব তরুণ উদ্যোক্তাকে আর্থিক ছাড় প্রদান তাদের ভবিষ্যৎ ব্যবসার ভিত্তিকে দৃঢ় করবে। আর প্রশিক্ষিত তরুণদের ছোট আকারের শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে উৎসাহিত করার পাশাপাশি তাদের প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠান স্থাপনে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। 

আমরা জানি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তি পরীক্ষা হোক বা যেকোনো চাকরির জন্য ইন্টারভিউই হোক, একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ ফি হিসেবে দিতে হয়। এ ধরনের ফি আদায়ের পেছনে কী যুক্তি রয়েছে জানি না। কারণ ওসব পরীক্ষা বা ইন্টারভিউ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রয়োজনে বা স্বার্থেই নেওয়া হয়ে থাকে। তবে কোন যুক্তিতে এসব পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য প্রার্থীদের অর্থ ব্যয় করতে হবে? এ ব্যয় অনেকের জন্যই বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আওয়ামী লীগ সরকার এ ধরনের ফি নেওয়া থেকে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে বিরত রাখতে পারলে এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে।   

আমাদের তরুণসমাজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অবশ্যই রক্ষা করবে। তাই আমরা তাদের দেশপ্রেমিক, নিবেদিত, কঠোর পরিশ্রমী ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দেখতে চাই। তারা ভবিষ্যতে যেন বাংলাদেশকে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতে পারে, সে জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। ১৯৭১ সালে এই দেশ আমাদের তরুণদের রক্তে সিক্ত হয়েই জন্ম নিয়েছিল এবং সেই চেতনার সঙ্গে কোনো আপস নেই।

কভিড-১৯ মহাদুর্যোগ বিশ্ববাসীকে যেমন আতঙ্কগ্রস্ত করে রেখেছে, তেমনি বিশ্ব অর্থনীতি অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়েছে। অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকাসহ করোনা মহামারিতে সৃষ্ট নানা প্রতিবন্ধকতার ফলে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের তরুণরাও ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত। আমরা আশা করছি, শিগগিরই বিদ্যমান করোনা বিপর্যয় থেকে বিশ্ববাসী পরিত্রাণ পাবে।

তরুণরা আমাদের দেশের জন্য এক অসীম শক্তি। সেই শক্তি দেশের উন্নয়নের জন্য, সঠিক পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য। সর্বোপরি তারাই বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে গড়ে তুলবে। তাদেরও সেভাবেই গড়ে তুলতে হবে। তবেই তাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ একদিন উন্নত বিশ্বের কাতারে স্থান করে নিতে সক্ষম হবে।

 

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা