kalerkantho

বুধবার। ৬ মাঘ ১৪২৭। ২০ জানুয়ারি ২০২১। ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

আর্থিক খাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্ত ভূমিকা দরকার

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

২৮ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আর্থিক খাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্ত ভূমিকা দরকার

যেকোনো দেশের অর্থনীতিতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটা বিরাট ভূমিকা থাকে। বিশেষ করে প্রবৃদ্ধি অর্জন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা অপরিহার্য। সব দেশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা শুধু ব্যাংকিং খাতের জন্য নয়। ব্যাংকিংটা তার কাছে মুখ্য। এর বাইরে পুঁজিবাজার, ইনস্যুরেন্স মার্কেট, এমনকি ক্ষুদ্রঋণ ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেন এবং বৈদেশিক লেনদেন—এগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশাল প্রভাব রয়েছে। এ জন্য সব দেশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্থান বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ।

আমাদের দেশে ব্যাংকিং সেক্টর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংস্কারের ভেতর দিয়ে গেছে, বিশেষ করে সত্তর ও আশির দশকে। এই ধারাবাহিকতায় দুটি জিনিস ঘটে। একটা হলো, ব্যাংকিং সেক্টরের প্রয়োজনেই নানা সংস্কার হয়েছে। আরেকটা দিক ছিল পলিসি মেকানিজমের উন্নয়ন। ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশে তখন অনেক সংস্কার সাধিত হয়, যা আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এবং বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আস্তে আস্তে অনেকটা সুসংহত হয়। শেষ পর্যন্ত আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংক একটা বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। এটা স্বীকার করতে হবে; বর্তমানে বাংলাদেশে বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যে অবস্থা, তাতে আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা কিছুটা দুর্বল হয়ে এসেছে এবং কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। আমি মনে করি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে প্রভাব, তা খর্ব করা যাবে না; বরং আরো শক্ত ও সঠিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তাঁর দায়িত্ব পালন করতে হবে। এ জন্য আমি মনে করি, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনেকটা রাজনীতির ঊর্ধ্বে এবং অন্যান্য প্রেসার গ্রুপের চাপের ঊর্ধ্বে থেকে নির্ভীকভাবে কাজ করতে হবে। এটাই হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আমাদের প্রত্যাশা এটাই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনে তাকে যথেষ্ট স্বায়ত্তশাসন দেওয়া আছে। সেখানে কিছুটা দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও তাদের যে ক্ষমতা, সে অনুযায়ী বর্তমান পরিস্থিতিতে আরো ভালো ভূমিকা পালন করতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্ত ভূমিকা পালনের কতগুলো সূচক থাকে। যেমন—কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের সব প্রভাব নির্দ্বিধায় পালন করবে কি না এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ম অনুযায়ী সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে কি না। দ্বিতীয়ত, মুদ্রানীতি সঠিকভাবে প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে স্বাধীন ভূমিকা রাখবে কি না। তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো সমানভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে কি না। চতুর্থত, গভর্নর ও বোর্ড অব ডিরেক্টর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে পারছে কি না।

এই চারটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে একটা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কতটা শক্তিশালী। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা (রেগুলেশন ক্যাপাসিটি) বিবেচনা করতে পারি। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রাইভেট ব্যাংক রেগুলেশন নিয়ে কিছু কাজ করে। অথচ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর রেগুলেশনের কাজ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগ। ফলে দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বজনীন ভূমিকা নেই। এখানে নিয়ন্ত্রণের দ্বৈততা রয়েছে। সেটা পরিহার করা উচিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি—কী করবে না করবে, তা অনেক সময় পলিসিমেকার ও পলিটিক্যাল ফিগাররা চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করেন। দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে কতগুলো পরিবর্তন এসেছে। (পরিচালক পদে) একই পরিবার থেকে আগে ছিল দুজন রাখার সুযোগ, এখন পাঁচজন করা হয়েছে। তারপর তাঁদের মেয়াদও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যাংক খাতের সংস্কারের ক্ষেত্রে অনেকটা পেছনে চলে গেছে দেশ। তাতে অনেক পরিবার থেকে ব্যাংকের ওপর প্রভাব সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং প্রভাব খাটানোও হচ্ছে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেগুলেশন করার যে দায়িত্ব, সেটাও ব্যাহত হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাইরে কিছু প্রেসার গ্রুপ থাকে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংক (বিএবি) এবং অ্যাসোসিয়েশন ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) অনেক সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর চাপ তৈরি করে। আমি বলছি না যে ব্যাংক মালিক ও ব্যাংকারদের সংগঠন কিছু বলতে পারবে না। তারা অবশ্যই বলবে এবং পরামর্শ দেবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান অনেক সিদ্ধান্ত তারা একযোগে নেয় এবং সেটা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করে, যা মোটেও ঠিক নয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বহিরাগত প্রভাব ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে অনেক রাজনৈতিক প্রভাব ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে। যেমন—নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া একটা ব্যাপার। এটা একটা পেশাদারি ও কারিগরি বিষয়। এ বিষয়ে সম্পূর্ণ তথ্য যাচাই-বাছাই ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু সেখানে যদি বাইরের প্রভাবের কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে তা মোটেও ফলপ্রসূ কিছু হয় না। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব পালনও ব্যাহত হয়।

প্রকৃতপক্ষে অটোনোমাস বা স্বায়ত্তশাসন মানেই যে পলিটিক্যাল চাপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, সেটা কিন্তু নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর রাজনৈতিক চাপ থাকে। কিন্তু সেখানে চাপ থেকে বেরিয়ে আসার কৌশল নেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চ্যালেঞ্জের মধ্যেই পড়ে। যারা চাপ দেয়, তাদের বোঝানোর সক্ষমতা থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব হবে হোমওয়ার্ক করা এবং বাহ্যিক চাপ দানকারীদের যুক্তি দিয়ে বোঝানো। দরকার হলে একবার নয়, বারবার তথ্য ও বিশ্লেষণ দিয়ে বোঝাতে হবে। এই বিষয়টির অভাব রয়েছে আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। আরেকটা বিষয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তার বিধি অনুযায়ী নিজ থেকে অনেক ব্যবস্থা নিতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেটা হয়তো তাদের দিক থেকে যথার্থ। কারণ তারা মনে করে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটা করছে না, যা করার কথা। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিজ থেকে নিজস্ব নীতি অনুযায়ী কাজ করতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল মনোযোগটা কেমন হওয়া উচিত? প্রথমত, আমি মনে করি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখ্য ভূমিকাটা হবে প্রধানত ব্যাংকিংয়ের দিকে নজর দেওয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা কাজ করবে; কিন্তু মূল মনোযোগ থাকতে হবে ব্যাংকিং রেগুলেশন, নতুন নতুন প্রডাক্ট এবং আর্থিক সেবাগুলোর ওপর। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক হতে পারে না। এটা কোনো ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউশনও হতে পারে না। তার কাজ হলো রেগুলেশন ও পলিসি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে পলিসিগুলো আছে, সেগুলো যথেষ্ট উন্নত ও আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু সেগুলো পরিপালন করা হয় না। এ ক্ষেত্রে নানা প্রভাব কাজ করে। কিন্তু নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা এবং দেশের স্বার্থে তাকে প্রভাব থেকে বের হয়ে আসতে হবে এবং দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ এবং অ্যাডহক সিদ্ধান্ত যথাসম্ভব পরিহার করতে হবে। দেখা গেল যে তাড়াহুড়া করে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং আবার পরিবর্তন করা হয়। এটাকে আমরা বলি অ্যাডহক পলিসি। একজন এটা প্রয়োগ করলেন, আরেকজন এসে বিশেষ ক্ষমতা দেখিয়ে সেটা পরিবর্তন করলেন। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অ্যাডহক পদ্ধতি বাদ দিয়ে বিধির ওপর থাকতে হবে, নীতির ওপর থাকতে হবে। তাহলে কেউ নীতি বা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারবে না, প্রভাব খাটাতে পারবে না।

অতএব, সময় এসেছে আমাদের আর্থিক খাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকাকে আরো শক্তিশালী করার। আমরা কভিড-১৯ আসার পর সরকারের প্যাকেজ বাস্তবায়নে দেখলাম অনেক ধীরগতি ও বৈষম্য। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি এন্টারপ্রাইজ দ্রুত ও যথাযথ বরাদ্দ পায়নি। অথচ এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা আরো শক্ত হওয়া উচিত ছিল। ঢালাওভাবে কতগুলো নোটিশ না দিয়ে ব্যাংকগুলোকে আরো বিশেষ কিছু টার্গেট দেওয়া উচিত ছিল। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে মিশন ও ভিশন আছে, সেগুলো সঠিকভাবে ও যুগোপযোগী করে পরিপালন করতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো, তাকে নির্ভীক ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের স্বার্থে, জনসাধারণের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনো সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে সরকারকে জানাতে হবে, আলাপ-আলোচনা করতে হবে। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটা শক্ত অবস্থান লাগবে, তার ভূমিকাকে দৃশ্যমান করতে হবে। না হলে শুধু ব্যাংকিং সেক্টরে নয়, পুরো আর্থিক খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সামনের দিকে আমাদের দ্রুত এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

 

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : আফছার আহমেদ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা