kalerkantho

শনিবার । ৯ মাঘ ১৪২৭। ২৩ জানুয়ারি ২০২১। ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

স্মরণ

অসীমের অনন্ত নিবিড়ে

তারিক সুজাত

২৬ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অসীমের অনন্ত নিবিড়ে

‘ধীরে ধীরে ডুবে যাই বিমর্ষ হলাহলে বিষ নয়, মধু নয়/যাপিত জীবনের অনবদ্য অস্তিত্বে, অসীমের অনন্ত নিবিড়ে’। নিজেরই একটি কবিতায় প্রিয় অগ্রজ কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন এই অনবদ্য অস্তিত্বের কথা বলে গেছেন। কেমন ছিল তাঁর যাপিত জীবন? আমাদের মাঝে এমন কজন আছেন যাঁরা নিজেকে পরার্থে এভাবে বিলিয়ে দিতে পেরেছেন! বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের বহু শাখায় ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট, জাতীয় কবিতা পরিষদ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, জাতীয় জাদুঘর, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, সার্ক দেশভুক্ত স্থপতি প্রতিষ্ঠান, কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলাসহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কোথাও সভাপতি, কোথাও সহসভাপতি, আবার কোথাও বা ট্রাস্টি সদস্য। কখনো কখনো পর্যায়ক্রমে একাধিক মেয়াদে। এই সংগঠনগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করলেও তিনি সতত প্রাণচঞ্চলতায় ক্রিয়াশীল ছিলেন সাধারণ কর্মীর মতোই।

১৯৮৭-৮৮ সালের কথা, যখন স্বৈরাচারী শাসনের অগ্নিগর্ভ থেকে বাংলাদেশের প্রগতিশীল কবিরা ‘শৃঙ্খলমুক্তির ডাক দিয়ে’ জাতীয় কবিতা উৎসবের সূচনা করেন। সেই দিনগুলোতে যে কজন এই প্রতিবাদী আয়োজনে মূল শক্তি জুগিয়েছিলেন তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম। সে সময় আমাদের কবিদের ভেতর খুব বেশিজনের গাড়ি ছিল না। প্রথামাফিক কবিতা উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হতো ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ সকালে। শুরুর কয়েক বছর উদ্বোধক ছিলেন জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামাল। রবিউল ভাই ও ভাবি প্রতি উৎসবের সকালে সুফিয়া খালাম্মাকে ধানমণ্ডির বাসা থেকে নিয়ে আসতেন। এরপর বছরের পর বছর কবি শামসুর রাহমানকেও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নিয়ে আসার ভার নিজেই নিয়েছিলেন রবিউল ভাই। মনে হয় এই তো সেদিন—গাড়ি থেকে নামার পর রাহমান ভাইয়ের শাল ঠিক করে দিচ্ছেন রবিউল ভাই! ১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কবিতা উৎসব মঞ্চে সন্ধ্যার একটি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন পটুয়া কামরুল হাসান। সে সময় আমরা টিএসসির তিনতলায় কাউন্সিল অধিবেশনে ছিলাম। হঠাৎ খবর আসে শিল্পী কামরুল অসুস্থ হয়েছে পড়েছেন। সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ আমরা কমবেশি সবাই জানি। মৃত্যুর ১০ মিনিট আগে পটুয়া কামরুল হাসানের শেষ রেখাচিত্র ‘দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে’ কিভাবে পোস্টার হয়ে দেশময় প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দিয়েছিল। ঠিক তার পরের বছর টিএসসির একই স্থানের তিনতলায় সেই কক্ষে আয়োজন করা হয়েছিল কামরুল হাসানের চিত্র প্রদর্শনী—সে বছর উৎসবের আহ্বায়ক ছিলেন শিশুসাহিত্যিক-সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ। সেই সংকট দিনে ফয়েজ ভাই এবং রবিউল ভাইয়ের অনুরোধে শিল্পসংগ্রাহক ও শিল্পীর পরিবারের সংগ্রহ থেকে প্রদর্শনীটির আয়োজন করা হয়েছিল। স্বল্প সময়ের উদ্যোগে ও সীমিত পরিসরে আয়োজিত হলেও এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য আমাদের প্রতিবাদী শিল্প আন্দোলনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনে পড়ে স্বৈরাচারকবলিত দুঃসময়ে তরুণ কবিদের ওপর দায়িত্ব পড়েছিল সারা রাত জেগে প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলো পাহারা দেওয়ার। তখনো রবিউল ভাই ছিলেন আমাদের সহায়—তাঁর গাড়িতে করেই ছবিগুলো আনা-নেওয়া করতাম।

কবি-শিল্পী-স্থপতি-লেখক-সাংবাদিক-শিশুসংগঠকদের মধ্যে এক অদৃশ্য মেলবন্ধন তৈরি করেছিলেন রবিউল ভাই। কয়েকটি প্রজন্মের এই সৃষ্টিশীল মানুষের সহজাত সুষমায় ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন তিনি। এই যোগসূত্র রচনায় তাঁর এই নীরব ভূমিকা হিসাব করে মেলানো যাবে না। কিন্তু তিনি তা মেলাতে পেরেছিলেন। ‘সংগতি’ কবিতায় কবি অমিয় চক্রবর্তী যেভাবে বলেছিলেন, ‘তোমার সৃষ্টি, আমার সৃষ্টি, তাঁর সৃষ্টির মাঝে/যত কিছু সুর, যা-কিছু বেসুর বাজে/মেলাবেন।’

বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্পের পেশাদারি প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর নিজের স্থাপত্যকর্মে দেশীয় ঐতিহ্য, ফর্ম ও ইটের ব্যবহার এক অনবদ্য শৈল্পিক মাত্রায় পৌঁছেছে। মিরপুরের জল্লাদখানা সমাধিসৌধ কিংবা দেশব্যাপী গণহত্যার স্থানসমূহে স্থাপিত স্মৃতিফলকের নকশায় তিনি সহজতার সৌন্দর্যকে নিপুণ আঙ্গিকে প্রয়োগ করেছেন। কবিতায় তিনি শুরু থেকেই ভিন্নপথের পথিক হওয়া সত্ত্বেও স্বকীয়তা নিয়ে উজ্জ্বল। তরুণ বয়সে ‘না’ গোষ্ঠীর আন্দোলনে অন্যতম পুরোধা। প্রথাবিরোধী হওয়া সত্ত্বেও কখনো তিনি উচ্চকণ্ঠ নন। কবিতা অনুবাদেও তিনি সিদ্ধহস্ত। তাঁর হাত থেকে আমরা পেয়েছি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরম সুহৃদ অ্যালেন গিনসবার্গের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হাউল’-এর অনবদ্য অনুবাদ। বেশ কিছু ভিন্নমাত্রিক অসাধারণ গল্প ছাড়াও তিনি কিশোর উপযোগী উপন্যাস লিখেছেন—‘কুয়াশায় ঘরে ফেরা’ ও ‘দুর্দান্ত’। এ ছাড়া সম্পাদনা করেছেন ‘কবিতায় ঢাকা’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাব্য সংকলন, যার দ্বিতীয় পর্বের কাজটি হাতে নিয়েছিলেন। শিল্পকলা ও স্থাপত্যবিষয়ক তাঁর বিশাল রচনাসম্ভারে একটি বড় অংশ এখনো গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়নি। এই দেশপ্রেমী বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীল মানুষটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে অসংখ্য মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়েছেন। অবহেলাও কম পাননি। এই করোনা ক্রান্তিকালেও তাঁর বহু মূল্যবান পাণ্ডুলিপি, স্থাপত্য নকশা, সংগৃহীত বই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁরই গড়া প্রতিষ্ঠানের তাঁর স্মৃতিবিজড়িত কক্ষ থেকে। আমরা কেউ এর প্রতিবাদ করতে পারিনি। তাঁর পরিবার অসহায়ভাবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি, বিদায়বেলায় সদস্যসচিবের দায়িত্বে নিয়োজিত রবিউল ভাই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরিবারের সবার প্রিয়। আটজন প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি সদস্যকে রবিউল ভাই স্বভাবসুলভ রসিকতাপূর্ণ সরলতায় বলতেন—‘সাত ভাই চম্পা’। আমাদের গৌরবময় ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে যুগ যুগ ধরে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই সম্মিলিত প্রয়াস শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। প্রিয় অগ্রজ রবিউল ভাইয়ের প্রতি তাঁরই লেখা কবিতার চরণ দিয়ে শ্রদ্ধা জানাই—

‘ভুলেও ভুল ক’রে ভোলা কি যায় তারে’

 ... ‘অবশেষে টের পায় মানুষেরা

জীবিতদের জীবন কী গ্লানিময় হাহাকারে ভরা

তার চেয়ে অনেক ভালো চিরদিন কবরের ঘরে শুয়ে থাকা’।

লেখক : কবি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা