kalerkantho

রবিবার । ১০ মাঘ ১৪২৭। ২৪ জানুয়ারি ২০২১। ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

কালান্তরের কড়চা

‘হাসিনাতন্ত্র’ দ্বারা কি দেশ শাসিত হচ্ছে

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

২৪ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



‘হাসিনাতন্ত্র’ দ্বারা কি দেশ শাসিত হচ্ছে

কী লিখব তাই ভাবছিলাম। খবরের অবশ্য কমতি নেই। ট্রাম্প এখনো জেদ ধরে আছেন। তিনি পরাজিত হলেও পরাজয় স্বীকার করবেন না। বিশ্বরাজনীতির মতে, ট্রাম্প এখন গোপাল ভাঁড় সেজেছেন। এই করোনা বিপর্যন্ত বিশ্বেও সবাইকে হাসাচ্ছেন। এক মার্কিন সাংবাদিকই তাঁকে আখ্যা দিয়েছেন পলিটিক্যাল ক্লাউন। ব্রিটেনেও প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন তাঁর এক মন্ত্রী প্রীতি প্যাটেলকে তাঁর মন্ত্রিসভায় নানা অভিযোগের মুখে ধরে রাখার জন্য যা করছেন, তাতে লোক হাসছে। আমাদের দেশেও এ ধরনের রাজনৈতিক ক্লাউন আছেন। যেমন—বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল, গয়েশ্বর রায়, নিতাই রায় চৌধুরী, রুহুল কবীর রিজভী প্রমুখ।

মির্জা ফখরুল বলেছেন, দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে। অর্থাৎ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তিনি তারেক রহমানের যে তত্ত্বটা আওড়াতে চেয়েছেন, তা হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা স্বর্গত জিয়াউর রহমানই এনেছেন। তা এখন ইতিহাস স্বীকার করছে না। বিএনপির আরেক নেতা গয়েশ্বর রায় বলেছেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই। হাসিনাতন্ত্র দ্বারা দেশ চলছে। এই হাসিনাতন্ত্রের অত্যাচার স্বৈরতন্ত্রকেও ছাড়িয়ে গেছে।

গয়েশ্বর রায়, নিতাই রায় চৌধুরী—এঁরা হচ্ছেন বিএনপির ‘খুদে কালাপাহাড়’। কালাপাহাড় নিম্ন শ্রেণির হিন্দু ছিলেন। তিনি উচ্চ শ্রেণির এক ব্রাহ্মণকন্যার প্রেমে পড়ে তাঁকে বিয়ে করতে না পেরে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করেন এবং সারা বাংলায় (সম্ভবত ইংরেজ আমলের গোড়ার দিকে) হিন্দুদের মন্দির ও প্রতিমা ভেঙে, হিন্দু বাড়িতে আগুন দিয়ে, নারীদের ওপর অত্যাচার চালিয়ে ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করেছিলেন। নিজেই নাম পরিবর্তন করে কালাপাহাড় নামে পরিচিত হয়েছিলেন। এই ভয়াবহ সন্ত্রাসীকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখেছেন সেকালের ঔপন্যাসিক নুরুল হক চৌধুরী। কলকাতার মখদুমি পাবলিশার্স ‘কালাপাহাড়’ নামে এই উপন্যাসটি প্রকাশ করেছিল। কালাপাহাড়কে শেষ পর্যন্ত দমন করা হয়েছিল। কিন্তু তত দিনে তিনি অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দু সম্প্রদায়ের যথেষ্ট ক্ষতি করেছিলেন।

গয়েশ্বর রায়, নিতাই রায় চৌধুরীকে খুদে কালাপাহাড় বললাম এ জন্য যে স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে তাঁরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রাজনীতিক হিসেবে সংখ্যালঘুদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার কাজকে তাঁদের রাজনীতিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাঁরা তা না করে একটি সাম্প্রদায়িক দলে যোগ দিয়ে নিজেরা মন্ত্রী হচ্ছেন বটে; কিন্তু সংখ্যালঘুদের স্বার্থ ও অধিকার নষ্ট করছেন।

বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময়ে একটি সন্ত্রাসী ধর্মান্ধ দল জামায়াতিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কিভাবে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে, তারা দলে দলে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, পূর্ণিমা শীলের মতো শয়ে শয়ে নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছে, হাজার হাজার সংখ্যালঘু তাদের জমিজমা-সম্পত্তি হারিয়েছে, সে কথা গয়েশ্বর রায়েরা জানেন না, তা নয়। সবচেয়ে বড় কথা, যে বিএনপি তথাকথিত ইসলামী মৌলবাদীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশকে তালেবান রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়, সেই দলে তাঁরা যোগ দিলেন কিভাবে? তার চেয়ে ধর্ম ত্যাগ করে ইউরোপে যারা জিহাদিস্ট হয়েছে, গয়েশ্বর রায়েরা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারতেন।

বিএনপির যে সন্ত্রাসী ও ধ্বংসাত্মক রাজনীতি, যার প্রমাণ পাওয়া গেছে সম্প্রতি ঢাকায় ১০টি বাস পোড়ানোর ঘটনায়ও। সে দলের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় গয়েশ্বর রায়দের নাম দিয়েছি খুদে কালাপাহাড়। তাঁরা নিজেরা এই সন্ত্রাসে প্রত্যক্ষভাবে যোগ দিলে তাঁদের বলতাম এ যুগের আসল কালাপাহাড়। এই গয়েশ্বর রায় বাংলাদেশের বুকে দাঁড়িয়ে যে বলতে পারছেন বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই, এটাই তো বড় প্রমাণ দেশে গণতন্ত্র আছে। তিনি বলেছেন, স্বৈরতন্ত্রের চেয়েও অধিক স্বৈরাচারী হাসিনাতন্ত্র দেশ চালাচ্ছে। অর্থাৎ দেশের প্রধানমন্ত্রীর নাম ধরে তিনি ব্যক্তিগত আক্রমণ চালিয়েছেন। বাংলাদেশ যদি মার্কোস কিংবা বাতিস্তার স্বৈরতান্ত্রিক দেশ হতো, তাহলে তাঁদের সমালোচনা করলে গয়েশ্বর রায় বুঝতে পারতেন স্বৈরতান্ত্রিক দেশ কাকে বলে? সৌদি বাদশাহদের সমালোচনা করে বিখ্যাত আরব সাংবাদিক খাশোগির কি অবস্থা হয়েছে গয়েশ্বর রায়েরা কি তা জানেন না? বিদেশে বাস করেও খাশোগি স্বৈরতন্ত্রের দীর্ঘ হাত থেকে রক্ষা পাননি। তাঁকে কেটে টুকরা টুকরা করে তারপর বিদেশের মাটিতেই তাঁর লাশ উধাও করে দেওয়া হয়েছে। গয়েশ্বর রায়দের কপাল ভালো, তাঁরা সত্য সত্যই কোনো প্রকৃত স্বৈরতান্ত্রিক দেশে বসে স্বৈরশাসকের সমালোচনা করেননি। বাংলাদেশে গণতন্ত্র আছে। আর গণতন্ত্র আছে বলেই নিত্য হাসিনাবিদ্বেষ প্রচার করেও তাঁরা বেঁচে যাচ্ছেন।

মির্জা ফখরুল দাবি করেছেন, দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করা হচ্ছে। অবশ্যই বিএনপির স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে বাঙালির স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের ইতিহাসে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক। সঠিক ইতিহাস হলো, তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা বেতারে পাঠ করেছেন মাত্র। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু হত্যা, অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের জন্য তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় মুছে যায়। তাঁকে এখনো বাংলাদেশে সম্মান দেখানো হয়। অন্য দেশে তাঁর মতো ব্যক্তিদের ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে ফরাসি সেনাপতি মার্শাল পেঁতা ভার্দুনের এক যুদ্ধে অসম সাহস দেখিয়ে দেশে বিপুলভাবে সম্মানিত হন। তাঁর নামে প্যারিসে একটি মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করা হয়। পেঁতাকে নাম দেওয়া হয়েছিল ভার্দুনবিজয়ী মার্শাল পেঁতা। সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ মার্শাল খেতাব তাঁকে দেওয়া হয়েছিল, যে খেতাব ফ্রান্সের সেভিয়ার হিসেবে খ্যাত জেনারেল দ্য গলকেও দেওয়া হয়নি।

এই মার্শাল পেঁতা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হিটলারের নািস বাহিনীর কোলাবরেটর হন এবং ফ্রান্স দখল করার ব্যাপারে হিটলারকে সাহায্য জোগান। অধিকৃত ফ্রান্সে তিনি তাঁবেদার সরকার গঠন করেন এবং নিজে তার প্রধান হন। এই সরকারের নাম ছিল ভিসি সরকার। যুদ্ধের পর মুক্ত ফ্রান্সে নািস কোলাবরেটর মার্শাল পেঁতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিচারের সময় বাংলাদেশের গোলাম আযমের মতো বয়স বিবেচনা করে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই কারাগারেই ১০০ বছরের কাছাকাছি বয়সে এসে তিনি মারা যান। তিনি যখন মৃত্যুশয্যায় তখন তাঁকে মানবিক কারণে মুক্তি দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছিল। ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালত সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। জেলেই মার্শাল পেঁতার মৃত্যু হয়। পেঁতা আর জিয়ার চরিত্র অভিন্ন। জিয়া ফ্রান্সে জন্মালে তাঁকে পেঁতার পরিণতি বরণ করতে হতো। ফখরুল-গয়েশ্বর রায়েরা তাঁকে ‘শহীদ’ বানাতে পারতেন না।

বিএনপি নেতাদের সবারই অভিযোগ এবং তাঁদের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে আমাদের একটি সুধীসমাজ—দেশে গণতন্ত্র নেই, যদি গণতন্ত্র বলতে বিএনপি-মার্কিন গণতন্ত্রের কথা বলা হয়, সে গণতন্ত্র অবশ্যই বর্তমানে দেশে নেই। যে গণতন্ত্রে সেনাবাহিনীর এক ক্ষমতালিপ্সু জেনারেল রক্তাক্ত পথে ক্ষমতা দখল করে দেশে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী প্রেসিডেন্ট হন; যিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে ধরে হত্যা করেন আর দেশদ্রোহীদের ধরে এনে ক্ষমতায় বসান; যিনি বহুদলীয় সংসদ প্রতিষ্ঠা করেন; কিন্তু সেই সংসদে বিরোধী দলের সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনয়ন, এমনকি বাজেটে কোনো সংশোধনী প্রস্তাব আনারও অধিকার ছিল না; যিনি দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার নাম করে দেশের তখনকার সবচেয়ে বর্ষীয়ান শ্রদ্ধাভাজন সম্পাদককে (জহুর হোসেন চৌধুরী) মধ্যরাতে হাতে হাতকড়া পরিয়ে জেলে পাঠিয়েছিলেন। কর্নেল তাহেরসহ এক হাজার ৭০০ মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও সিপাহিকে বিচার প্রহসনে জেলে হত্যা করেন। অতঃপর তাঁর স্ত্রী ক্ষমতায় এসে স্বাধীনতার শত্রু এবং মানবতাদ্রোহীদের নিয়ে মার্শাল পেঁতার মতো রাজাকার সরকার গঠন করেন। বিএনপি এখন সেই গণতন্ত্র দেশে আবার ফিরিয়ে আনতে চাইলে অবশ্য ভিন্ন কথা।

শেখ হাসিনার গণতন্ত্র ব্রিটেনের মার্গারেট থ্যাচার ও ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর গণতন্ত্রের মতো অবশ্যই একটু কর্তৃত্ববাদী। ইউরোপের কয়েকজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হালে স্বীকার করেছেন, ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্র যেভাবে বর্তমান বিশ্বে ধর্ম, অতি জাতীয়তাবাদ, বর্ণ ও গোত্রকে আশ্রয় করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তাতে উনিশ শতকের উদার গণতন্ত্র আর মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষায় সক্ষম নয়। নিজকে বাঁচানো, মানবতাকে বাঁচানোর জন্যই গণতন্ত্রকে কঠোর হতে হবে। তাই দুর্বল ও আপসকামী গণতন্ত্রের বদলে কর্তৃত্ববাদী গণতন্ত্র চাই। দুর্বল গণতন্ত্রের প্রতিভূ বিশ শতকের প্রথম যুগের জার্মানির ভন হিন্ডেনবার্গ এবং ইতালির ভিকটর ইমানুয়েল উদার গণতন্ত্রের নেতা হয়ে গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে পারেননি। একজনকে হিটলার এবং অন্যজনকে মুসোলিনির মতো ফ্যাসিস্ট দানবের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হয়েছিল।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর দেখা গেছে, ইউরোপেও আর উদার গণতন্ত্র নিজেকে রক্ষায় সক্ষম নয়। ফ্রান্সে তাই সংসদীয় গণতন্ত্র বাতিল করে জেনারেল দ্যগলে প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতির মারফত কর্তৃত্ববাদী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কেউ বলবে না, দ্যগলে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সিঙ্গাপুরে লি কুয়ান এবং মালয়েশিয়ায় মাহাথির কর্তৃত্ববাদী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে দীর্ঘকাল ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন। দুটি দেশের আজ এত উন্নতি ও সমৃদ্ধি সে জন্যই।

শেখ হাসিনা আন্তরিকতার সঙ্গে উদারনৈতিক গণতন্ত্র অনুসরণ করে ২০০১ সাল পর্যন্ত বারবার ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে মার খেয়েছেন। প্রকৃত কর্তৃত্ববাদী গণতন্ত্র তিনি এখনো অনুসরণ করছেন না। যতটুকু করেছেন তার ফলে জাতির পিতার হত্যাকারী এবং ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি দিতে পেরেছেন। নিজের অর্থমন্ত্রী ও রাজনৈতিক উপদেষ্টার উপদেশ অগ্রাহ্য করে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যুদ্ধে নেমে পদ্মা সেতু প্রকল্প সফল করেছেন। দেশের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনেও রয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধান।

দেশের এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীর অলস সমালোচনা এবং আরেক শ্রেণির চাটুকারিতা অগ্রাহ্য করে শেখ হাসিনাকে কর্তৃত্ববাদী গণতন্ত্র আরো কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। তাহলে দলের ভেতরে ও বাইরে দুর্নীতির রাঘব বোয়ালও তিনি দমন করতে পারবেন।

লন্ডন, সোমবার, ২৩ নভেম্বর ২০২০

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা