kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

ভূমি জরিপসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত

মুস্তফা নঈম

২৩ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভূমি জরিপসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে বর্তমান সরকার জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে জনকল্যাণমূলক বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশের কৃষি অর্থনীতির উন্নয়ন, শিল্পায়নের জন্য বিশেষ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলাসহ সামাজিক অবকাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ব্যাপক পরিবর্তনসহ পিছিয়ে থাকা সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। গত ১০ বছরের উন্নয়নের ফিরিস্তি দিতে গেলে তালিকাই দীর্ঘ হবে শুধু।

সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নের প্রচার-প্রপাগান্ডায় অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় একেবারে চাপা পড়ে রয়েছে। যে বিষয়টি নিয়ে দেশের অতি সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে অনেক উঁচুপর্যায়, এমনকি সরকারের বিভিন্ন দপ্তরও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়ে আসছে বছরের পর বছর। বিষয়টি হচ্ছে দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং ভূমি জরিপসংক্রান্ত। দেশের ভূমি জরিপসংক্রান্ত নিয়ম-নীতি এবং ভূমি ব্যবস্থাপনার আইনি প্রক্রিয়ার কারণে দেশের মানুষের ভোগান্তির শেষ ছিল না।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশে ভূমি জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়। আশির দশকের শেষ দিকে এই ভূমি জরিপ কার্যক্রমের সমাপ্তি ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এর পর থেকে শুরু হয় সাধারণ মানুষের এক নতুন ভোগান্তি। পৈতৃক সম্পত্তি ও ভিটামাটি নিয়ে জটিলতা। কোনো ধরনের কারণ ছাড়া তথ্য-উপাত্ত সংযোজন না করে সাধারণ মানুষের জমি সরকারের নামে খাস খতিয়ানভুক্ত করা হয়, আবার একজনের জমি অন্যের নামে জরিপ করা হয়। এই নিয়ে আদালতে আদালতে মামলা, মানুষের হয়রানির শেষ নেই। এক তথ্যে জানা যায়, বর্তমানে দেশে ভূমি জরিপসংক্রান্ত তিন লাখের বেশি মামলা ঝুলে আছে।

ভূমি জরিপসংক্রান্ত এই সংকট নিরসনে সরকারের যুগান্তকারী একটি সিদ্ধান্ত শুধু সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রচারের অভাবে সাধারণ মানুষ অবগত নয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তর সুফল দেশের মানুষ যত দ্রুত লাভ করবে ততই মঙ্গল।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত মুজিববর্ষে সাধারণ মানুষের জন্য বিশেষ উপহার হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। কারণ এই সিদ্ধান্তের কারণে দ্রুত নিষ্পত্তি হবে ভূমি জরিপসংক্রান্ত বিরোধ। ভূমি জরিপসংক্রান্ত জটিলতায় দেশের সাধারণ মানুষের অর্থ-শ্রম-ভোগান্তির পাশাপাশি মানসিক যন্ত্রণাও লাঘব হবে। দৌড়াতে হবে না নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালতে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রচলিত ভূমি ব্যবস্থাপনার কারণে সৃষ্ট সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নিরসনে সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর জরিপসংক্রান্ত বিরোধের এমন জমির বিষয়ে জেলা প্রশাসনের নিবিড় তদন্তের পর বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় নথিপত্র পর্যালোচনা ও প্রয়োজনবোধে শুনানি গ্রহণ করে নামজারির বিষয়ে আদেশ প্রদান করবে। তবে অতীব জনগুরুত্বপূর্ণ এই নির্দেশনার বিষয়ে সরকারি প্রচারণার অভাবে সংশ্লিষ্ট সাধারণ মানুষ অবগত নয়।

সিএস, আরএস, পিএস বা এসএ জরিপে ব্যক্তির নামে সঠিকভাবে রেকর্ড হয়েছিল অথবা কোনো আইনগত প্রক্রিয়ায় খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্তির কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই এবং সরকারের দখলে নেই এমন ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত রেকর্ডে ভুলবশত সরকারের নামে রেকর্ড হয়েছে।

এমন জমি নিবিড় তদন্তের পর জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে প্রস্তাব প্রাপ্তির পর বিভাগীয় কমিশনার অফিস নথিপত্র পর্যালোচনা ও প্রয়োজনবোধে শুনানি গ্রহণ করে নামজারির বিষয়ে আদেশ প্রদান করবে।

এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সরকারের মাঠপর্যায়ের ভূমি প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের বিরূপ মানসিকতার অবসান ঘটবে। সেই সঙ্গে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় সহজতর হবে। সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন ভুক্তভোগীরা।

খাস খতিয়ানভুক্ত হওয়া জমির বিভিন্ন দলিল পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, সব জরিপে ব্যক্তিমালিকানাধীন অথচ সর্বশেষ জরিপে এসে খাস হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। জরিপকারীদের খামখেয়ালি ও অনিয়মের কারণে বাপ-দাদার জমি খাস খতিয়ানভুক্ত হওয়ার পর জমি ফিরে পেতে দেওয়ানি আদালতে মামলা করে রায় পাওয়ার পরও সরকারের ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল কারণে এসব ব্যক্তি তাঁদের পৈতৃক সম্পদ নিজেদের নামে ভূমি আইনের নামজারি করাতে পারছেন না।

সরকারপক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল করা এবং দীর্ঘদিন আদালতে মামলা চলমান থাকার কারণে সাধারণ মানুষ নিজের একমাত্র সম্বল জমিটুকু যেমন নিজের দখলে নিতে পারছেন না, তেমনি সবার পক্ষে অর্থ ব্যয় করে মামলা পরিচালনা করাও অসম্ভব হয়ে ওঠে। ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্তির সুযোগটি গ্রহণ করে এক শ্রেণির অসাধুচক্র সরকারি ও সাধারণ মানুষের জমি দখলের অপচেষ্টায় লিপ্ত হচ্ছে।

সরকারের ভূমি জরিপ বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের অদক্ষতা, অসাধুতাসহ নানা ধরনের অনিয়মের কারণে বেশির ভাগ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় বছরের পর বছর। শুধু যে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে তা নয়, সরকারের বিভিন্ন সংস্থাও জরিপকর্মীদের খামখেয়ালিপনার শিকার হয়ে বছরের পর বছর আদালতে মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকার অপচয় হচ্ছে।

জেলা প্রশাসন কার্যালয় ও বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় ভূমি জরিপসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে আন্তরিক হন, তাহলে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ খুব উপকৃত হবেন। শুধু যে সাধারণ মানুষের উপকার হবে তা নয়, এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ব্যক্তি, সরকার বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি থেকেও পরিত্রাণ লাভ করবে।

আমাদের প্রত্যাশা, মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার দেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ও ভূমি জরিপসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে যে নির্দেশনা প্রদান করেছে, তা দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর করে পৈতৃক সম্পদ নিয়ে ভুক্তভোগী মানুষের কষ্ট লাঘব ত্বরান্বিত করবেন সংশ্লিষ্টরা।

লেখক : সাংবাদিক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা