kalerkantho

রবিবার। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৬ ডিসেম্বর ২০২০। ২০ রবিউস সানি ১৪৪২

উত্তরবঙ্গে পর্যটন সম্ভাবনা ও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার ঢল

ড. শফিক আশরাফ

২২ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উত্তরবঙ্গে পর্যটন সম্ভাবনা ও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার ঢল

অবিভক্ত ভারতবর্ষে উত্তরবঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল। ভাষা-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও পর্যটনে সমূহ সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দাঁড়িয়ে ছিল উত্তরবঙ্গ। বর্তমান ভারত অংশের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, ময়নাগুড়ি, ধুপগুড়ি ইত্যাদি অঞ্চল পর্যটনকে একটা ব্যবসাসফল অঞ্চল হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। তৎকালীন প্রখ্যাত ব্রিটিশ গবেষক জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন তাঁর ‘লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে টু ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে রংপুর অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেছেন। লালমনিরহাট এখনো বাংলাদেশের রেল বিভাগ। সৈয়দপুর রেল কারখানাটি এখনো বাংলাদেশের একমাত্র রেল কারখানার মর্যাদা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ১৮৬৩ সালে তৈরি করা সৈয়দপুরের চিনি মসজিদটি এখনো পর্যটকদের আকর্ষণের বস্তু। এ ছাড়া রংপুরের তাজহাট জমিদার বাড়ি, পায়রাবন্দে বেগম রোকেয়ার বাড়ি, দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির, বিখ্যাত দিঘি রামসাগর, নীলফামারীর নীলসাগর, পঞ্চগড়-তেঁতুলিয়ায় নয়নাভিরাম বিস্তীর্ণ চা বাগানসহ উত্তরবঙ্গে এ রকম অসংখ্য দর্শনীয় স্থান দারুণ পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইদানীং এর সঙ্গে যোগ হয়েছে হিমালয়কন্যা পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন। পুরো দেশ থেকে পর্যটকের ঢল নেমেছে উত্তরাঞ্চলে। এবার কভিড-১৯-এর কারণে পৃথিবীর আকাশ অনেক বেশি স্বচ্ছ, প্রকৃতি ফিরে যাচ্ছে তার স্বীয়রূপে। বায়ুমণ্ডল অনেকটা দূষণমুক্ত। ফলে আমাদের বাড়ির এত কাছে যে হিমালয় পবর্ত সেটা আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। এবার হিমালয় আমাদের চোখের সামনে তার ঘোমটা খোলা রূপ নিয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু পঞ্চগড় নয়, ঠাকুরগাঁও থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে প্রায় সারা দিনই।

আমি নিজে ভুটানের দোচালাপাস থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব রূপ দেখে বিমোহিত হয়েছি, দার্জিলিংয়ের টাইগার হিল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার মাথায় প্রথম সূর্যকিরণ দেখে অভিভূত হয়েছি। সেই কাঞ্চনজঙ্ঘা নিয়ে দেশের মানুষের বিভিন্ন সোশ্যাল ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় উচ্ছ্বাস দেখে ছুটে গিয়েছিলাম ঠাকুরগাঁও শহরের পাশে বোদা উপজেলায় ভুল্লি গ্রামে। সকাল ৭টায় রংপুর থেকে রওনা দিয়ে ১০টায় ভুল্লিতে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মিলল, তবে খানিকটা অস্পস্ট। পরের দিন ভোরে সূর্যোদয় মুহূর্তে কাঞ্চনজঙ্ঘা তার রূপ খুলে আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। যে বন্ধুর বাসায় আমরা অতিথি ছিলাম সেই বন্ধুও কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, আমার ৪০ বছর জীবনে কাঞ্চনজঙ্ঘার এত চমৎকার রূপ দেখিনি অথচ আমরা প্রতিবছরই কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা পাই। মূলত সূর্যোদয় মুহূর্তে যে কাঞ্চনজঙ্ঘা এত চমৎকার রূপ খুলে দাঁড়ায় সেটা ছিল তাদের ধারণার বাইরে। আমি ওই দিন বিকেলে পঞ্চগড়ের সেলিলন টি এস্টেটের উমরখানা ইউনিয়নের বড় কামাত গ্রামে ইন্ডিয়া বর্ডারের পাশে গিয়ে বিকেলের কাঞ্চনজঙ্ঘার আরেক রূপ দেখে ধাক্কা খেলাম। মনে হচ্ছিল হাতের কাছে সোনার পাহাড়! নদীটা পার হলেই সেটা পাওয়া যাবে। কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে প্রতিফলিত আভা এসে পড়েছে চা বাগানের কচি সবুজ পাতার ওপর। এই দৃশ্য একবার দেখলে ভোলার মতো নয়। ফেরার পথে অনেক পর্যটকবাহী গাড়ি চোখে পড়ল। তারা ঝাঁক বেঁধে তেঁতুলিয়া অভিমুখে চলেছে।

কিন্তু পঞ্চগড়, তেঁতুলিয়া কিংবা গোটা উত্তরবঙ্গ কি পর্যটন উপযোগী পর্যটনবান্ধব কোনো পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে? এখানে কি যথেষ্ট আবাসন, হোটেল-রেস্তোরাঁ আছে পর্যটকদের জন্য? উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা কি পর্যটন উপযোগী? এই প্রশ্নগুলোর বেশির ভাগ উত্তর না হবে। এখন এ প্রশ্ন আসতে পারে, শুধু সিজনে একবার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য পঞ্চগড়-তেঁতুলিয়ায় কি হোটেল-রেস্তোরাঁ চলবে? এখানে মনে রাখার দরকার শুধু হিমালয় বা কাঞ্চনজঙ্ঘা নয়, এখানে রয়েছে বিস্তীর্ণ নয়নাভিরাম চা বাগান, স্বচ্ছ পানির চমৎকার আঁকাবাঁকা নদী, নিরিবিলি নিঝুম পরিবেশ, নাতিশীতোষ্ণ দারুণ আবহাওয়া। ছুটি কাটানো কিংবা ভ্রমণের জন্য বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান। সুতরাং বলা যায় শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা নয়, পর্যটনের জন্য অনেক কিছুই রয়েছে এখানে, যা দেশ-বিদেশের মানুষকে আকৃষ্ট করবে। শুধু দরকার তাদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা। আমি পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বারবার বলছি এ জন্যই যে নিরাপদ পরিবেশ পর্যটন আকর্ষণের অন্যতম কারণ। এরই মধ্যে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত তাদের পর্যটন এলাকায় চমৎকার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করেছে। ফলে সিজনে কিংবা অফ সিজনের সেখানে তাদের পর্যটকের খুব বেশি অভাব হয় না। বাংলাদেশ থেকেই প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক সেখানে ভ্রমণ করে আসে। দার্জিলিং, দিল্লি ছাড়াও গোটা হিমাচল প্রদেশে ট্যুরিস্ট পুলিশ ও স্থানীয়রা পর্যটকদের যেকোনো সমস্যায় তাদের পাশে দাঁড়ায়। আমাদের দেশে কক্সবাজারের ট্যুরিস্ট পুলিশ ধীরে ধীরে পর্যটকবান্ধব হয়ে উঠছে। এদের সারা দেশে বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় বিশেষ ট্রেনিং দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার, আর পর্যটন এলাকার স্থানীয়দের সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে পর্যটকদরদি মানসিকতার গুরুত্ব বোঝানো দরকার। তারা যদি বুঝতে পারে, পর্যটক এলে তাদের এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে, তাদের বাড়তি আয় হবে, এলাকার উন্নয়ন হবে, তাহলে পর্যটন পরিবেশ নিশ্চিত হবে।

শুধু কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন বা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি নয়, সারা দেশের পর্যটন এলাকা দিন দিন গুরুত্বের দাবিদার হয়ে উঠছে। বিশেষ করে চির অবহেলিত বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের পর্যটন এলাকায় নজর দেওয়া জরুরি হয়ে উঠছে। করোনা প্রভাবের আগে থেকেই বাংলাদেশের মানুষ ভ্রমণপিপাসু হয়ে উঠেছে। তারা পুরো দেশ হাতড়ে বেড়াচ্ছে দর্শনীয় স্থান দেখার জন্য, আর সেসব দর্শনীয় স্থান ফেসবুক, ইউটিউবের মাধ্যমে শেয়ার করে দেশ-বিদেশের মানুষকে দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে। তারা দেশে নিরাপত্তা ও পর্যটনবান্ধব পরিবেশ না পেয়ে দেশের টাকা খরচ করে বিদেশ ভ্রমণ করে আসছে। দেশে পর্যটন সুবিধা পর্যাপ্ত হলে বিদেশের স্রোত খানিকটা রোধ হবে বলে মনে হয়। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর প্রতি মনোযোগী হলে কর্মঠ ও অতিথিবান্ধব উত্তরের জনমানুষের এক দারুণ সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা