kalerkantho

বুধবার । ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৫ নভেম্বর ২০২০। ৯ রবিউস সানি ১৪৪২

গত নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কারা জিতিয়েছিল?

রোব ইউরি

১ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কারা নির্বাচিত করেছিল—এই প্রশ্নটি নতুন একটি নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে করাটা অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। ২০১৬ সালের নির্বাচনের চার বছর পর বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের কাছ থেকে এই প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন জবাব পাওয়া গেছে। ওয়াল স্ট্রিট ও ওয়াশিংটন ডিসির কর্তৃত্ববাদী গোষ্ঠী এই প্রশ্নটিকে গত নির্বাচনের ভোটারদের তুলনামূলক আয় শ্রেণির অবস্থা দিয়ে বিবেচনা করতে চায়। সমস্যা হচ্ছে, এই দৃষ্টিভঙ্গি দ্বিদলীয় ও নির্বাচনী রাজনীতির সংস্কৃতি থেকে ভোটারদের বাইরে রাখতে চায়। অথচ ভোটারদের ভোট দিতে যাওয়া না যাওয়ার এটাও একটা কারণ।

সাধারণত নির্বাচনে ভোটারদের ভোট দেওয়ার প্রশ্নটির জবাব দেওয়া হয় তাদের জনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে। এই দৃষ্টিভঙ্গি মনে করে, ভোটারদের ভোট না দেওয়ার কারণ হতে পারে অবৈষয়িক অথবা রাজনীতির অন্তর্নিহিত কোনো কারণ। বস্তুত ২০১৬ সালে যারা ভোট দেয়নি, তারা ব্যাখ্যাতিতভাবে অন্য দলে ঝুঁকে পড়েছিল। আর এটাই ভোটের ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল।

২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় ছিল বিস্ময়কর। যাঁরা পলিটিক্যাল ডোনারদের পরামর্শ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন—ট্রাম্পের বিজয়ে সেই সব পণ্ডিত, রাজনৈতিক ভাষ্যকার, পেশাদার রাজনীতিবিদ ও উপদেষ্টাদের বিস্মিত করেছিল। ২০১৬ সালের নির্বাচনের একেবারে প্রাক্কালে তাদের বিপুল ঐকমত্য ছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্প হেরে যাবেন এবং পুঁজিবাদী গণতন্ত্র, করপোরেট পুনরুত্থান, ক্ষতিপূরণের লড়াই, বাণিজ্য চুক্তিকে সঙ্গে নিয়ে পুঁজিবাদ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাবে।

২০১৬ সালের নির্বাচনে বামপন্থীরা আলোচনায় ছিলেন না। এসব ভোটার ইরাক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া জর্জ ডাব্লিউ বুশের সময় থেকেই কায়েমি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বর্জন করে এসেছে। এরপর বারাক ওবামার রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের পর তারা ডেমোক্র্যাটদের দিকে ফিরে আসে। তবে পরবর্তী সময়ে ওবামা যখন ব্যাপক মাত্রায় নিওলিবারালিজমের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন, তখন বামপন্থীদের আগ্রহ কমে যেতে থাকে। পরে তাঁদের অনেকেই স্বতন্ত্র অবস্থানে চলে যান।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভোটাররা হিলারি ক্লিনটনের ভোটারদের তুলনায় আয়ের দিক থেকে ধনী ছিল। এই ব্যাখ্যা যতটা না গ্রহণযোগ্য, তার চেয়েও বড় সত্য হচ্ছে ডেমোক্র্যাট নেতৃত্ব তাদের পরাজয়ের ব্যাখ্যার জন্য এই তত্ত্ব আবিষ্কার করে। বাস্তবতা হচ্ছে, ডেমোক্র্যাটদের প্রধান নির্বাচনী এলাকাগুলোতে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারা হয় বাড়িতেই অবস্থান করে, নতুবা পরিবর্তনের মানসিকতার কারণে বারাক ওবামাকে দুইবার ভোট দেওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছে।

আদমশুমারি ব্যুরো থেকে পাওয়া গ্রাফ জানাচ্ছে, ট্রাম্প ও তাঁর বর্ণবাদী জাতীয়তাবাদকে সমর্থন দেওয়ার জন্য ‘উদ্বিগ্ন’ শ্বেতাঙ্গ ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে ভিড় জমায়নি। দেখা গেছে, ২০১২ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের ভোটদানের হার মাত্র ১.২ শতাংশ বেড়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের উপস্থিতি কম ছিল। মূলত ১৯৯৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত কৃষ্ণাঙ্গ ও হিসপানিক ভোটাররা অব্যাহত উত্থানের পর থেকে তাদের আগ্রহে ভাটা পড়ে। ফলে ২০১২ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের ভোট প্রদানের হার ৭ শতাংশ কমে গিয়েছিল, যা ভোটের ফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

নির্বাচনী জরিপ সংস্থা গ্যালপের মতে, ২০১৬ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও হিলারি ক্লিনটন ছিলেন নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে নিন্দিত দুই প্রার্থী। ওই সময় গভীর নীতিগত ব্যর্থতার কারণে উভয় দলকেই তাদের সদস্যপদ কমে যাওয়ার অভিজ্ঞতা লাভ করতে হয়। তাই ২০১৬ সালের নির্বাচনে ভোটারদের মানসিকতায় তুলনামূলক আয় শ্রেণির বিষয়টির চিন্তা ততটা যুক্তিসংগত নয়। আসলে কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিক শ্রেণি ও শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে যারা দুইবার বারাক ওবামাকে ভোট দিয়েছে, তারাও ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিল।

এখন যে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যারা নির্বাচিত করেছিল, তাদের কাছে রাজনৈতিক অসন্তোষের চেয়ে ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক কারণটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে এর প্রমাণও পাওয়া যাবে।

লেখক : শিল্পী ও রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

মন্তব্য