kalerkantho

শুক্রবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৭ নভেম্বর ২০২০। ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

ইউরোপজুড়ে সংক্রমণের দ্বিতীয় প্রবাহ

অনলাইন থেকে

৩০ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এই গ্রীষ্মের কয়েক মাসে ইউরোপীয়দের মধ্যে এ বিশ্বাস জন্মেছিল যে জীবন স্বাভাবিক ধারায় ফিরে এসেছে। প্যারিসের আর্ট মিউজিয়ামগুলো এবং বার্সেলোনার ক্যাফেগুলো খোলা ছিল, যদিও ভিড় ছিল কম। জার্মান, ডাচ ও ডেইনরা (ডেনিশ) ছুটি কাটাতে গিয়েছিল ভূমধ্যসাগরীয় সৈকতগুলোতে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে মহাদেশের শিশুরা যেই স্কুলে ফিরতে শুরু করল, তখনই কভিড-১৯ সংক্রমণ বাড়তে শুরু করল। এমনকি সরকারগুলো জনগণের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হলো এবং তারা কঠোর সামাজিক দূরত্ব বিধি পুনরারোপ না করার কথাই ভাবল।

এমন সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হয়েছে তাদের। কভিড-১৯-এর দ্বিতীয় প্রবাহ এখন ইউরোপকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক দেশে নিশ্চিত সংক্রমণের ঘটনার দৈনিক হিসাব বসন্তকালে যা ছিল তা এখন ছাড়িয়ে গেছে, তবে মৃত্যুহার বেশ কম। সেরোলজিক্যাল পরীক্ষার ভিত্তিতে বিকশিত ইকোনমিস্টের একটি মডেল অনুযায়ী বোঝা যায়, কী পরিমাণ লোক করোনাভাইরাসের শিকার ছিল। সেকেন্ড ওয়েভের এখনো ফার্স্ট ওয়েভের সমতুল্য হওয়া বাকি, তবে সংক্রমণ বাড়ছে, হাসপাতালে নেওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। বেশির ভাগ দেশ গ্রীষ্মকালে কঠোর পরীক্ষা পদ্ধতির বিকাশ ও শনাক্তকরণ কার্যক্রম চালাতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন তারা পিছু হটছে, অকেজো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে—তারা রেস্তোরাঁ বন্ধ করছে, কোয়ারেন্টিন ও কারফিউ জারি করছে।

স্পেন সবচেয়ে আক্রান্ত দেশের একটি। আংশিকভাবে এর কারণ, বামপন্থী সংখ্যালঘু সরকার ও রক্ষণশীল বিরোধী পক্ষ এ বিষয়ক জাতীয় কৌশল কী হবে সে ব্যাপারে একমত হতে ব্যর্থ হয়েছে। শুধু কিছু এলাকা কার্যকর পরীক্ষা-শনাক্তকরণ-আইসোলেশন চালু করতে পেরেছে। সংক্রমণ ওঠানামা করছে খুব। মাদ্রিদ ১৫ দিনের জরুরি অবস্থায় রয়েছে, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া শহরের ভেতরে-বাইরে চলাফেরায় বিধি-নিষেধ আছে। ছয়জনের বেশি লোকের জমায়েতে নিষেধ, রাত ১১টায় সব রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকবে। কাতালোনিয়া ও নাভারেতে অবস্থা আরো কঠিন।

ফ্রান্সের অবস্থা জটিল। করোনা পজিটিভদের পরিমাণ আগস্টের ৩১ তারিখে ছিল ৪.৬ শতাংশ, সেটা ১৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অক্টোবরের ১৭ তারিখে সরকার ৯টি বড় শহরে রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করেছে। আঁস্তিচু পাস্তার (পাস্তুর ইনস্টিটিউট) এপিডেমিওলজিস্ট আহেনা ফোঁতানে বলেছেন, অবশ্যই নতুন সংক্রমণ কমাতে হবে। মহামারিকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগেই সংক্রমণের পরিমাণ দিনে তিন হাজারে নামিয়ে আনতে হবে; সংক্রমণের বর্তমান দৈনিক হার ২৮ হাজার।

কভিড-১৯ যখন প্রথম এসেছিল, তখন উত্তর ইউরোপীয়রা রূঢ়ভাবে ইতালি ও স্পেনে এই ভাইরাসের ক্ষতিকারক দিকটি দেখেছিল। অবশ্য এ সময়ে এই ধারণা বজায় রাখা কঠিন। ওই সময় যেসব দেশ বাজেভাবে আক্রান্ত হয়েছিল তাদের মধ্যে রয়েছে বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস। বেলজিয়ামের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফ্রাংক ভানডেনব্রুক সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমরা সত্যিই একটি সুনামির খুব কাছাকাছি, যা ঘটছে তার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।’ সরকার রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দিয়েছে, বার বন্ধ করে দিয়েছে এবং মধ্যরাত থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করেছে। ভাইরাসটি আঞ্চলিক বিভাগগুলোকে উদ্বেগজনক হারে সংক্রমিত করছে। ফ্লেমিশ জাতীয়তাবাদীরা জাতীয়ভাবে লকডাউন সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করে। কারণ ফরাসিভাষী এলাকাগুলোতে সংক্রমণ হার বেশি।

নেদারল্যান্ডস সরকার দ্বিধাগ্রস্ত, অথচ সংক্রমণ ক্রমেই বাড়ছে। তারা এখন স্পেন বা ফ্রান্সের ওপরে অবস্থান করছে। এ মাসে সরকার রেস্তোরাঁ বন্ধ করেছে চার সপ্তাহের জন্য এবং পাবলিক ইনডোর স্পেসে মাস্ক ব্যবহার করতে বলেছে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুচা গত সপ্তাহে ক্ষমা চাইলেন, রাজপরিবারকে হেমন্তকালীন ছুটি কাটানোর জন্য গ্রিসে যেতে দেওয়ার কারণে (রাজপরিবার অবশ্য অবকাশ সংক্ষিপ্ত করেছে)।

দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ ও বলকানে (যারা এই বসন্তে ভাইরাসকে কঠোর লকডাউনের মাধ্যমে নিস্তেজ করেছে) বিধি-নিষেধ পুনরারোপ করার প্রয়োজন খুব একটা নেই। সার্বিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনা ব্রানাভিচ ভাইরাসটির সংক্রমণ বাড়াতে থাকলে ভিন্নভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার করেছেন। অবশ্য এখন অল্প ব্যবস্থাই নিচ্ছেন। বুলগেরিয়া (তাদের হাসপাতালগুলো চিকিৎসক স্বল্পতার অভিযোগ তুলছে) এখন মাস্ক পরাকে বাধ্যতামূলক করেছে। বুখারেস্টও (রোমানিয়া) অনুরূপ ব্যবস্থা নিয়েছে। স্কুলগুলোকে অনলাইন শিক্ষায় যেতে বলা হয়েছে; সিনেমা ও থিয়েটার বন্ধ করা হয়েছে।

এ মাসে ইইউ একটি কাজ করেছে, ইউরোপজুড়ে মহামারির অঞ্চলিক তীব্রতার বিষয়ে মানচিত্র তৈরি করেছে, এলাকাগুলোর রং কী হবে সে বিষয়ে অবশ্য দ্বিমত রয়েছে। ইউরোপের প্রায় সব এলাকা লাল রঙের (সংক্রমণের উচ্চ হার)। জার্মানি, ইতালি ও নরডিক দেশগুলো মূলত হলুদ (মাঝারি হার) তবে মাঝেমধ্যে সবুজের ছোপসহ (নিম্ন হার)। ইতালি হয়তো দীর্ঘ সময় বর্তমানের ভালো অবস্থানে থাকবে না। বসন্তকালে তারা আক্রমণাত্মক লকডাউনের মাধ্যমে সংক্রমণ হার নিচে নামিয়েছিল, কিন্তু নতুন সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। ১৮ অক্টোবর তারা নতুন বিধি জারি করেছে। কিন্তু সেটা বিস্ময়করভাবে বেশ শিথিল কোয়ালিশনের মধ্যকার বিবাদের কারণে।

জার্মানি ও নরডিক দেশগুলো ইউরোপের সবচেয়ে ভালো পারফরমার, যদিও জটিলতা আছে। ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে ভালো শনাক্তকরণ ব্যবস্থা রয়েছে জার্মানিতে। কিন্তু বার্লিনের বিভিন্ন অংশে প্রচুর সংক্রমণের বা সংক্রমণ-সম্ভব ঘটনা রয়েছে। মারাত্মক আক্রান্ত এলাকাগুলোতে রেস্তোরাঁ আগেভাগে বন্ধ করতে বলা হয়েছে। মাস্ক পরতে বলা হয়েছে। তবে জার্মানির ফেডারেল সিস্টেম বেশ মতানৈক্যের জন্ম দিচ্ছে।

একদা ইউরোপীয়রা সম্মিলিত ত্যাগের চেতনায় করেনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধটা করেছিল। এখন অনেকেই বিড়ম্বিত—তাদের সরকারগুলো বিষয়টিকে উড়িয়ে দিচ্ছে।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা