kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

সাদাকালো

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে বিজয় কার পক্ষে?

আহমদ রফিক   

২৯ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে বিজয় কার পক্ষে?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘরে ঘরে দরজায় ঘণ্টা বাজাচ্ছে সেখানকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ডেমোক্র্যাট বনাম রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী যথাক্রমে জো বাইডেন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। শেষোক্তজন দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতার জন্য লড়ছেন। সহযোগী তথা রানিংমেট কমালার কল্যাণে জো বাইডেন লড়াইয়ে এগিয়ে থাকলেও আমার বিবেচনায় একাধিক কারণে এটা প্রকৃতপক্ষে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।

তার কারণ জনপ্রিয়তার অভাব এবং নানা প্রসঙ্গে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্পের হাতে বড় কড়ি তাঁর চাতুর্য, ইসরায়েলসহ তাঁর পেছনে দুই পরস্পরবিরোধী আন্তর্জাতিক পরাশক্তি চীন-রাশিয়ার সমর্থন। চীন তো খোলামেলাভাবেই তাঁর ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্সির পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে। সর্বোপরি তাঁর রয়েছে বর্ণবাদ ও রক্ষণশীল শ্বেতাঙ্গ সমর্থন, বিশেষত উগ্র যুবগোষ্ঠীর।

তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পদ্ধতির জটিলতাও তাঁর পক্ষে যেতে পারে। যেমন এর আগে গেছে। বুশ জুনিয়র ও আল গোরের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে সাধারণ ভোটের ফলাফলে ধরেই নেওয়া হয়েছিল যে ফলাফল ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর পক্ষে। কিন্তু ফ্লোরিডা ফ্যাক্টর, ইলেকটোরাল কলেজ সব ভণ্ডুল করে দেয়। অবশ্য তাতে কিছুটা দুর্নীতিরও আভাস ছিল, যে জন্য আল গোর আদালতের শরণ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচন পদ্ধতির প্রতি মর্যাদাবোধের প্রভাবে বোধ হয় পিছিয়ে আসেন। বুশের ভাই তখন ফ্লোরিডার গভর্নর।

এবার ফ্লোরিডা থেকে ট্রাম্পের শুভেচ্ছার জন্য আগাম সুখবরের ছোট্ট একটি শিরোনামে আমি অবাক হয়েছি এ কারণে যে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে তুলনামূলক বিচারে বাইডেন এগিয়ে। ‘জয়-পরাজয় নির্ধারক আট স্টেট’—এর মধ্যে ‘পাঁচ সুইং স্টেটে এগিয়ে বাইডেন, দুটিতে ট্রাম্প; তা সত্ত্বেও ফ্লোরিডা ফ্যাক্টর সব ওলটপালট করে দেবে না তো। এমন ভাবনার বাস্তবতা কম নয়।

কেন জানি না, আমার মনে হয়েছে গত দুইবারের বিপর্যয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই (আল গোর ও হিলারি ক্লিনটন) কি দুই মেয়াদে সফল সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বাইডেনের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নেমেছেন? বিগত নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত বিজয় কি তাঁকে বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ করেছিল? কারণ যা-ই হোক, ওবামা এখন মাঠে।

এ সম্পর্কে একটি দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ শিরোনাম : ‘ওবামা-বাইডেনের জোড়া আক্রমণ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে’। তাঁরা বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাম্পের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার বিবরণ তুলে ধরছেন জনগণের সামনে। যেমন ‘বাইডেন বলেছেন, করোনা নিয়ে ভুল বোঝাচ্ছেন ট্রাম্প। ওবামার দাবি, ট্রাম্প জনগণকে রক্ষা করছেন না।’ বলা বাহুল্য, যুক্তরাষ্ট্রে সদ্য করোনা আক্রমণের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় এ বিষয়ে দায়ী ট্রাম্পের নৈরাজ্যিক ভূমিকা, পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। মানুষ সেটা জানে। ওবামা-বাইডেনের অভিযোগ তাই ভুল নয়।

গত নির্বাচনে অভাবিত বিজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একের পর এক উদ্ভট ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর বক্তব্য-বিবৃতিও ছিল তেমনই। অবশ্য তাঁর বিদেশনীতির আগ্রাসী ভূমিকা এবং আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ ইত্যাদি ঘটনা হয়তো মার্কিন জনগণকে খুশি করে থাকতে পারে। কিন্তু সার্বিক বিচারে নিজ দেশে প্রেসিডেন্ট হয়েও ট্রাম্প একজন বিতর্কিত ব্যক্তি।

হয়তো তাই প্রথমবারের মেয়াদ শেষে এবং দেশব্যাপী ভয়ংকর করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে তাঁর বিতর্কিত ভূমিকার মতো একাধিক কারণে এবার নির্বাচনী জনমতের গরিষ্ঠ অংশ তাঁর পক্ষে নয়। এমনকি রাজনৈতিক ঘটনাবলির শল্যচেরা বিচারে নিপুণ প্রধান গণমাধ্যমগুলোর সমর্থন পাচ্ছেন না ডোনাল্ড ট্রাম্প। আমাদের একটি দৈনিকের সংবাদ শিরোনাম : ‘প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলো বাইডেনের পক্ষে’। যেমন ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’, ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’, ‘লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস’ ইত্যাদি।

দুই.

এত সব ইতিবাচক সূত্র সত্ত্বেও বোধ হয় জয় সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হতে পারছে না ডেমোক্র্যাট শিবির, আগেই বলেছি তিক্ত পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে। তা ছাড়া নতুন ঘটনারও তাতে সংযোজন রয়েছে। আর সেটি বলা বাহুল্য, খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের আর দিন সাতেক বাকি। ভয়ানক একটা দক্ষযজ্ঞের মতো কাজের প্রস্তুতিপর্ব সম্পন্ন; কিন্তু তা সত্ত্বেও একটি দৈনিকের সংবাদ সূত্রে বলা হয়েছে, ভোটারদের একটি বড়সড় অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে, ঠিক করতে পারছে না কাকে ভোট দেবে তারা।

সংবাদটি যদি সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে—কেন এ দোটানা? সেটা কি একদিকে ট্রাম্পের বিতর্কিত অবস্থান, অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর প্রত্যাশিত উচ্চমান, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন? এ ছাড়া অন্য কোনো কারণ তো আপাতত দৃশ্যমান নয়।

যুক্তরাষ্ট্রে গণমাধ্যম নির্বাচনসহ ক্ষমতাবলয়ে শক্তিমান ভূমিকা পালন করে থাকে। সেই গণমাধ্যমের প্রভাবশালী অংশ জো বাইডেনকে সমর্থন জোগানোর পরও কেন ভোটার পক্ষে এই দোদুল্যমানতা? গণমাধ্যম এখন নির্বাচনী ময়দানে তাদের মহাব্যস্ত ভূমিকা পালন করে চলেছে, যেমন আগাম জরিপে তেমনি ভবিষ্যদ্বাণীতে।

এদের সমর্থন যে শেষ কথা, এমনটি কি নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া যায়? কারণ গত নির্বাচনে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন ছিল হিলারি ক্লিনটনের প্রতি। তা সত্ত্বেও বর্ণবাদ উসকে দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভাবিত বিজয়। অন্যদিকে এদের সমর্থন নিয়ে আধাকৃষ্ণাঙ্গ বারাক ওবামার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনী বিজয়।

যুক্তরাষ্ট্র কেন, বিশ্বের সর্বত্রই রাষ্ট্রপ্রধান তথা প্রেসিডেন্ট পদের ক্ষেত্রে জয় তথা জনমনে প্রভাব বিস্তারে একাধিক কারণের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র বা ফ্যাক্টর প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, তাঁর জনচিত্ত আকর্ষণের ক্ষমতা। ভিন্ন বর্ণের হওয়া সত্ত্বেও বারাক ওবামার অভাবিত জয়ের পেছনে এই সূত্রটি কাজ করেছে বলে আমার বিশ্বাস। এখানেই সম্ভবত পূর্বোক্ত দোদুল্যমানতার অন্তর্নিহিত কারণ ধরা রয়েছে বলে মনে হয়।

উপেক্ষা করা যায় না ফ্লোরিডা ফ্যাক্টরকে, বিশেষ করে ইলেকটোরাল কলেজ সিস্টেমকে। বিগত নির্বাচনে এই সূত্রে নাকি মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন হিলারি ক্লিনটন। তাহলে কি ধরে নিতে হয় যে ফ্লোরিডায় জয়ের অর্থ প্রেসিডেন্ট পদে জয়! এ কেমন ধারার নির্বাচন পদ্ধতি যে একটি অঙ্গরাজ্য বাকি সবার মতামতের ওপর দিয়ে যাবে এবং নির্বাচন-জয়ের ভাগ্য নির্ধারণ করবে?

বিষয়টি নিয়ে আমরা আগেকার অভিজ্ঞতার কথা বলেছি। চতুর ট্রাম্প ফ্লোরিডা ফ্যাক্টরটিকেই ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ধরে নিয়ে তাঁর নির্বাচনী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আশাবাদী ফ্লোরিডায় তাঁর সম্ভাব্য বিজয় নিয়ে। সম্ভবত এ কারণেই ডেমোক্র্যাটদের মনে বিজয় নিয়ে শঙ্কা।

তাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে জয়-পরাজয় নিয়ে আমাদের মনেও আশঙ্কা, আবার না ফ্লোরিডা ফ্যাক্টরের প্রভাবে বিপুল জনমতের রায় পাল্টে যায়, অভাবিত জয় ঘটে, যেমন ঘটেছে আরো কয়েকবার। তবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যদি অঘটনও ঘটে, সিনেটে রিপাবলিকানরা আগামী দিনে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে কি না তা নিয়ে দুশ্চিন্তা তাদের কম নয়। আপাতত আমাদের প্রতীক্ষা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জয়-পরাজয় নিয়ে। মানুষমাত্রেই চায় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমতের তথা গণতন্ত্রের জয়। সেদিক বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের এবারের (২০২০) নির্বাচন বিশ্ববাসীকে কী উপহার দেবে সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামীং

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা