kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

সংকটেই সত্যিকার নেতার পরিচয়

ড. এ কে এম মাহমুদুল হক

২১ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সংকটেই সত্যিকার নেতার পরিচয়

পরার্থে অদম্য সামর্থ্য ও প্রতিকূল পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার অভাবনীয় ক্ষমতা একজন নেতা বংশপরম্পরায় অর্জন করেন না। আমজনতাকে আশ্বস্ত ও অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা যখন কারো মধ্যে প্রস্ফুটিত হয়, তখন সবাই তাঁকে আপনা-আপনিই নেতা হিসেবে মেনে নেয়। এর জন্য নেতাকে কখনো রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিলবোর্ডে নিজের ছবি ঝোলাতে হয় না। পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দূরদর্শিতা, নিষ্ঠা, অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোভাব, অভিঘাত সহনশীল সামর্থ্য ও দিকনির্দেশনা প্রদানে দৃঢ়তার এক অনন্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে প্রশংসিত নেতৃত্ব অর্জন করতে হয়।

ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে ‘Cometh the hour, Cometh the man.’  অর্থাৎ সংকটকালে সত্যিকার নেতার আগমন ঘটে। এটি বর্তমানে অবিস্মরণীয়ভাবে উইনস্টন চার্চিল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে তাঁর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাঁর অসাধারণ নেতৃত্ববলে অতি আগ্রাসী নাৎসি সেনাদের আক্রমণেও ব্রিটিশ নাগরিকদের মনোবলকে অক্ষুণ্ন রেখে বিজয়ের আশা জাগিয়ে রেখেছিলেন এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তিনি পশ্চিমকে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্প্রসারণবাদী হুমকির বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। অর্থাৎ সংকটকালীন মুহূর্তে মানুষকে অনুপ্রাণিত করার অসাধারণ ক্ষমতা, অতুলনীয় দূরদর্শিতাপূর্ণ ধীশক্তি, নিরলস কর্মশক্তি, উদ্দীপনা ও অবিচল ব্যক্তিত্বের কারণে চার্চিল বিশ শতকের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন।

সংকটকালে গণতান্ত্রিক মনোভাবের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য, সংহতি সংরক্ষণ ও জাতীয় অগ্রগতির ধারাকে বেগবান করার ক্ষেত্রে প্রয়োজন সত্যিকার নেতৃত্ব। এ জন্য অপরিহার্য হলো নেতৃত্বের বৈধতা। অর্থাৎ নৈতিক মানদণ্ডে জনগণের কাছে নেতার গ্রহণযোগ্যতা। অস্বীকার করার উপায় নেই যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনবদ্য ও সম্মোহনী নেতৃত্বেই আমরা ১৯৭১ সালে ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছিলাম এবং স্বাধীনতা অর্জনে সক্ষম হয়েছিলাম। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ভঙ্গুর ও বন্যাকবলিত বাংলাদেশ সারা বিশ্বের কাছে যখন সম্ভাবনাহীন বলে পরিগণিত হয়েছিল, তখনই সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। কিন্তু তাতে পিছপা না হয়ে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য নেতৃত্বে তখনই সেখানে সোনার বাংলার বীজ বপন করা হয়েছিল। আজ আমাদের দেশ যেসব সফলতা অর্জন করছে তার বীজ কিন্তু বঙ্গবন্ধুই বপন করেছিলেন।

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে গত বছর শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীর হামলায় ৫০ জন মুসল্লি নিহতের ঘটনা পুরো পৃথিবীকে শোকাহত করে তোলে, যা বিশ্বব্যাপী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। এই চরম সংকট মোকাবেলায় যে উদারতা, মানবিকতা ও দৃঢ়তা দরকার, তা দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন। তাই তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এরদোয়ান যথার্থই বলেছিলেন, ‘নিউজিল্যান্ডকে দেখে শিখুক বিশ্ব।’ মুসলিমদের প্রতি আরডার্ন শুধু সহানুভূতিই দেখাননি, এমনকি ট্রাম্পের টেলিফোন বার্তার জবাবে বলেছিলেন, ‘আমার কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই, বরং আপনি আপনার ইসলামবিদ্বেষ বন্ধ করুন। জাতিবিদ্বেষ বন্ধ করে মানবতাকে তুলে ধরুন। এটিই হবে সবচেয়ে বড় সাহায্য।’

উহানে যখন করোনাভাইরাস শনাক্ত হলো, তখন হয়তো অনেকেই ভাবেনি যে এটি বৈশ্বিক মহামারিরূপে আবির্ভূত হয়ে বিশ্বকে বিপর্যস্ত করবে। এরই মধ্যে এর করালগ্রাসে বিশ্বব্যাপী ১১ লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এরই মাঝে কিছু রাষ্ট্র সার্বিক প্রচেষ্টা এবং নেতৃত্বের জোরে কিছুটা স্বস্তি পেলেও বেশির ভাগের জন্য এটি নাভিশ্বাসের কারণ। এটি নিশ্চিত যে করোনা বিশ্বনেতাদের একটি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। আমাদের জীবদ্দশায় এর চেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি বিশ্বনেতারা এর আগে হননি। তাই নেতৃত্ব নিয়ে যতই সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ অথবা ব্যাবহারিক অভিজ্ঞতা থাকুক না কেন, এ রকম সংকট মোকাবেলায় কোনো কিছুই নেতাকে সঠিকভাবে প্রস্তুত করে না। তা সত্ত্বেও এই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রথম সারিতে থেকে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে সত্যিকার নেতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন।

করোনা মোকাবেলায় সফল হওয়া প্রথম সারির দেশগুলোর মধ্যে নিউজিল্যান্ড ও জার্মানি অন্যতম। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল এখন পর্যন্ত করোনার প্রধান দুটি শিকার। জার্মানি ও নিউজিল্যান্ড সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণে ছিল সফলতম দুটি রাষ্ট্র। প্রশ্ন উঠতেই পারে, নিউজিল্যান্ডে যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৫ জন আর জার্মানিতে ২১৬ জন বাস করে, তাদের জন্য সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা আর কতই বা কঠিন হতে পারে? তবে এটিও সত্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের জনসংখ্যার ঘনত্ব যথাক্রমে ৩৬ থেকে ২৫ জন। এরা কিন্তু তা পারেনি। নিঃসন্দেহে নেতৃত্বের বিশেষ কোনো গুণাগুণ আরডার্ন ও মার্কেলের ছিল, যা ট্রাম্পের কিংবা বলসোনারোর ছিল না।

বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে এক হাজার ১১৫ জন বাস করে। যেখানে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চরম অনিয়ম, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সংকট, প্রশাসন ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের দুর্নীতি, জনগণের অসচেতনতাসহ নানা প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান; সেখানে করোনা সংকট আরো ভয়াবহ হওয়ার কথা থাকলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক বিচক্ষণ নেতৃত্ব, বাস্তবমুখী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থবিষয়ক সাময়িকী ফোর্বস এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম করোনা মোকাবেলায় শেখ হাসিনার ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেওয়াকে ‘প্রশংসনীয়’ বলেছে। করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সাপ্তাহিক নিউজ পেপার দি ইকোনমিস্টে অতি সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায় যে ভারত ও চীন থেকেও নিরাপদ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনীতি। কানাডিয়ান লেখক অভিভাহ ভিটেনবার্গ-কক্স ফোর্বসে এক নিবন্ধে লিখেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীসহ বিশ্বের আট নারীর অবদান ‘বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য’। তিনি যথার্থই বলেছেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্ব দেওয়া বাংলাদেশ বিভিন্ন সংকট মোকাবেলার ক্ষেত্রে এক পরিচিত নাম। তাই করোনা সংকটের মতো রোহিঙ্গাদের ভাগ্য নির্ধারণেও তিনি যে সফল হবেন এ ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী হওয়া যায়।

করোনা মহামারি কেটে গেলে হয়তো নেতৃত্বের ধারণা, তত্ত্ব কিংবা কৌশলগুলোতে আমূল পরিবর্তন আসবে। তাই বলে সেটিকেই আবার সর্বজনীন বিবেচনা করা হবে নিছক বোকামি। নশ্বর পৃথিবীতে মানবজীবন কখনোই শতভাগ নিরাপদ ও পরিকল্পনাবদ্ধ নয়। সব সময় মনে রাখতে হবে, পরিস্থিতি কখনোই এক রকম থাকে না। সংকটকালে একজন নেতা যেমন অভিযোজনের শিক্ষা পান, তার সঙ্গে অভিযোজনপ্রক্রিয়াকে কিভাবে আরো দ্রুততর করা যায় সে শিক্ষা তাঁকে গ্রহণ করতে হবে। কিভাবে অতি দ্রুত কঠোর সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় তার সামর্থ্য অর্জন করতে হবে। তাঁকে স্মরণ করতে হবে, এ রকম মহামারি দুর্যোগের সময়ে এর আগে মহান নেতারা কী নিদর্শন স্থাপন করেছেন।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা