kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সাদাকালো

ট্রাম্পের কূটনীতি কি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অশনিসংকেত?

আহমদ রফিক

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ট্রাম্পের কূটনীতি কি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অশনিসংকেত?

সেই কবে জেরুজালেমের গ্র্যান্ড মুফতি জেরুজালেমে মুসলিম অধিকারের দাবিতে লড়াই চালিয়ে জীবন শেষ করলেন, সেই জেরুজালেম শেষ পর্যন্ত বর্ণবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ট্রাম্পের সমর্থনে ইসরায়েলের হাতে চলে গেল। আরববিশ্ব-আরব লীগ নির্বিকার, নীরব। মধ্যপ্রাচ্যের এই নতজানু রাজনীতির মূল কারিগর সৌদি আরব। তার নেপথ্য শক্তি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্প তো ঢেকে-রেখে কথা বলেন না, তা ঘরোয়া ব্যাপারে হোক বা আন্তর্জাতিক বিষয়ে হোক। তাই একদিকে যেমন ফিলিস্তিনি আরবদের তীরবিদ্ধ করে তাঁর প্রকাশ্য ঘোষণা ইসরায়েলি জেরুজালেমের পক্ষে, তেমনি অতি সম্প্রতি তাঁর মন্তব্য—খাশোগি হত্যার নায়ক সৌদি যুবরাজকে তিনি রক্ষা করেছেন। অর্থাৎ তা না হলে খ্যাতনামা সাংবাদিক হত্যার পরিকল্পনা কার্যকর করার জন্য সৌদি যুবরাজকে বিচারের সম্মুখীন হওয়ার কথা।

এ তো গেল মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির বহুধারার এক দিক। এর সবচেয়ে ট্র্যাজিক দিক হলো মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী কূটনীতির চতুরতায় ফিলিস্তিনি আরবদের যাযাবর জীবন, দুঃখ-তাপে ভরা জীবন। স্বভাবতই রাজনৈতিক বিজ্ঞানের নিয়মে প্রতিবাদ ও অনুরূপ সংগঠনের জন্ম—নিয়মতান্ত্রিক ও সন্ত্রাসবাদী, কখনো সশস্ত্র বিপ্লবের ধারণায় গঠিত সংগঠন। তবে জাতীয়তাবাদী চেতনার ইয়াসির আরাফাতের সশস্ত্র সংগঠন সর্বাধিক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের নির্বিচার রাজনীতির বিরোধিতাও রাজনৈতিক-কূটনৈতিক বিচারে সঠিক ছিল না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে হিটলারের বর্বর ব্যাপক ইহুদি নিধনের প্রতিক্রিয়ায় মিত্রশক্তির সহানুভূতিসূচক ইসরায়েলি রাষ্ট্র গঠন (১৯৪৮) আবারও ফিলিস্তিনিদের প্রতি অবিচারের বিনিময়ে! এই পদক্ষেপের আমরা বিরোধী নই, ইহুদি গণহত্যার বিবেচনায়। কিন্তু সেই সঙ্গে দরকার ছিল দীর্ঘদিন যাবৎ দেশান্তরি ফিলিস্তিনিদের প্রতিও অনুরূপ সহাভূতিতে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠন। সে সুবিচারের কথা মিত্রশক্তির মাথায় আসেনি। এ ব্যাপারে একচক্ষু হরিণের মতো তাদের আচরণ।

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হলো, এ বিষয়ে ইঙ্গ-মার্কিন-ফরাসি সাম্রাজ্যবাদীরা এককাতারে, বিশেষ করে ইঙ্গ-মার্কিন রাজনীতি বরাবর ইসরায়েলি স্বার্থের পক্ষে। এর একটা বড় কারণ মার্কিন অর্থনীতিতে ইসরায়েলি প্রভাব। চমকপ্রদ উদাহরণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অন্ধ, হঠকারী ইসরায়েলিপ্রীতি এবং খুব চতুর ইসরায়েলি গোয়েন্দা মোশাদের পরামর্শপ্রীতি। ইরানি জেনারেল সোলাইমানি হত্যার প্রকৃত নেপথ্য ঘটনা ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য।

স্বভাবতই আরাফাতের সশস্ত্র সংগঠন সশস্ত্র সন্ত্রাসী তৎপরতা চালিয়েছে তাদের অধিকার আদায়ে। ফিলিস্তিনের পক্ষে লেখালেখি, বিবৃতি, জাতিসংঘে সুবিচার প্রার্থনা কম হয়নি। শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সৌজন্যে একটা শান্তিচুক্তি এবং গাজা এলাকা ও সন্নিহিত অঞ্চলে ফিলিস্তিনি বসতির ব্যবস্থা হলেও প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠিত হয়নি। এর বড় কারণ আরাফাত সন্ত্রাসীনীতিমুক্ত হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েল ফিলিস্তিনি-বিরোধিতা পরিত্যাগ করেনি। ফলে আরাফাতের জাতীয়তাবাদী গণতন্ত্রী ব্যবস্থার বিপরীতে উগ্র ফিলিস্তিনি তরুণদের সংগঠন হামাস, তাদের পাল্টা ইসরায়েলি-বিরোধিতা, কখনো সন্ত্রাসী হামলা অব্যাহত রেখেছে। ইসরায়েল পাল্টা কঠোর স্থল ও বিমান হামলা চালিয়ে নিরীহ ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষ-শিশু হত্যায় পিছপা হয়নি। ভুলে গেছে হিটলারি বর্বরতার কথা।

দুই.

আরাফাত তাঁর জীবদ্দশায় আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন শান্তিচুক্তির শর্ত ও মর্যাদা রক্ষা করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রটিকে সুস্পষ্ট আকার দিতে এবং জেরুজালেমের ভূখণ্ডে রাজধানী স্থাপন করতে। কিন্তু প্রবল ইসরায়েলি বিরোধিতা, আরববিশ্বের দুর্বলতা এবং মার্কিন প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সমর্থনের অভাবে তাঁর সে স্বপ্ন সফল হয়নি। বরং তাঁর ক্রমাগত চাপের পরিণাম সম্ভবত ইসরায়েলি গোয়েন্দা ষড়যন্ত্রে খাদ্যে লাগাতার বিষ প্রয়োগে তাঁর জীবননাশ। এ ব্যাপারে ফরাসি ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের ভূমিকাও খুব স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন নয়। তাঁর স্ত্রীর অভযোগও তেমনই, যেমন নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। ব্যস, ইসরায়েলের পথের কাঁটা উচ্ছেদ। দুর্বল উত্তরসূরি আব্বাসের পক্ষে আরাফাতের ভূমিকা পালন যে সম্ভব নয়, এটা বহুউচ্চারিত সত্য।

রাজনৈতিক ভুবনে তাদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিরা শুধু নিঃসঙ্গ নয়, শক্তিহীন হয়ে পড়ে। তদুপরি বিভাজন—আরাফাতপন্থী বনাম হামাস। ফিলিস্তিনি সমস্যার বড় কাঁটা মধ্যপ্রাচ্য তথা আরবদুনিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি, মার্কিনভক্ত সৌদি আরবের রাজতন্ত্র। এর মধ্যে গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো আবির্ভাব ইসরায়েলপ্রেমী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের।

তাঁর মধ্যপ্রাচ্যনীতি একদিকে যেমন ইরানবিরোধী, তেমনি একই সঙ্গে ফিলিস্তিনবিরোধী। এই যে ইসরায়েলিরা দিনের পর দিন ফিলিস্তিনি এলাকায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপন করে চলেছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে এর বিরুদ্ধে কোনো বলিষ্ঠ প্রতিবাদ উচ্চারিত হচ্ছে না। আরবদুনিয়া এই আন্তর্জাতিক অন্যায়ের ক্ষেত্রে উদাসীন, প্রায় নির্বিকার বলা চলে। আরব লীগের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ তেমন বলিষ্ঠ নয়, যা বাস্তবে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তাহলে কোথায় দাঁড়াবে ফিলিস্তিনিরা, কার কাছে আশ্রয় চাইবে, কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সুবিচার চাইবে? আব্বাসের মতো দুর্বল, মেরুদণ্ডহীন নেতাকে দিয়ে কোনো অর্জন যে সম্ভব হবে না, তা কমবেশি সবাই বোঝেন, বিশেষত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। এই বৈশ্বিক দুর্বলতার কারণে, জাতিসংঘেরও একই রকম ভূমিকার কারণে যত দিন যাচ্ছে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি আগ্রাসন ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। যেমন একদিকে যখন তখন হামলা, তেমনি জবরদস্তিমূলক বসতি স্থাপন। দুর্বল জাতিসত্তার ভাগ্যে এমনটাই ঘটে থাকে। বিশ্ব ইতিহাসে এর বড় প্রমাণ ফিলিস্তিনি আরব জনগোষ্ঠী। কুর্দিরা অবশ্য নানাভাবে তাদের সশস্ত্র ভূমিকা পালন করে চলেছে। পারছে না মিয়ানমারের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো।

আসলে ফিলিস্তিনিদের এই দুর্দশার বড় কারণ মধ্যপ্রাচ্যে রাজতন্ত্রের তথা শেখতন্ত্রের অনড় ভূমিকা, তাদের মধ্যকার রাজনৈতিক বিভাজন, আরব জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা, সেই সঙ্গে আরব স্বার্থের প্রতি উদাসীনতা এবং বেশির ভাগের মার্কিন তোষণ ও তাঁবেদারি। নেপথ্য কারণটা রাজনৈতিক—রাজতন্ত্র, শেখতন্ত্রের স্বেচ্ছাচারী শাসন অব্যাহত রাখা, মার্কিন মদদে। ট্রাম্প সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করছেন।

তিন.

আরবদুনিয়ায়, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উল্লিখিত নৈরাজ্যিক অবস্থার সুযোগ নিয়ে ট্রাম্প-কূটনীতির সফল রাজনৈতিক সূচনা সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের ট্রাম্পের দৌত্যে ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর। সংবাদপত্রমহলের মতে, এ ঘটনা ঐতিহাসিক, আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের হিসাবে ‘মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভোর’।

ঘটনা ঐতিহাসিকই বটে। ইসরায়েলের বর্বর ফিলিস্তিনি-বিরোধিতা এবং তাতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সমর্থনের কারণে আরবদুনিয়া একদা ইসরায়েল রাষ্ট্র থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। শর্ত সাপেক্ষে কূটনৈতিক সম্পর্ক। গণতান্ত্রিক তৃতীয় বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্র, বিশেষ করে মুসলিম রাষ্ট্রও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে বিরত ছিল। অবশ্য ইতিমধ্যে বরফ গলতে শুরু করেছিল, দু-একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা তার প্রমাণ।

ইসরায়েলের কট্টর রক্ষণশীল রাজনীতির কারণে তাদের পূর্বোক্ত নিঃসঙ্গ অবস্থা। লক্ষণীয় বিষয়, সম্ভবত হিটলারি গণহত্যা ও নির্যাতনের কারণে ইহুদিদের মধ্যে শুধু জাতিগত ঐক্য নয়, দু-একজন ব্যতিক্রমী উদারনৈতিক রাজনীতিবিদ বাদে তাদের রাজনীতি ও নেতৃত্বে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার লাগাতার প্রাধান্যই বরাবর দেখা গেছে। তাদের মতে, এটা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে।

তাদের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব তো এখন সুরক্ষিত। এখন অস্তিত্ব রক্ষার অজুহাতে নিজ স্বার্থে অন্যের অস্তিত্ব নষ্ট করাটা কি ন্যায়নীতিসম্মত? গণতন্ত্রী রাজনীতি কি তেমন আগ্রাসী ভূমিকা সমর্থন করে? না, করে না। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ বড় বালাই। তাই ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরায়েলি রাজনীতি গণতন্ত্রের মৌলিক আদর্শ মেনে চলছে না, ফিলিস্তিনিদের বেলায় তো নয়ই।

ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি ট্রাম্পের আহ্বান সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করতে। আমার ধারণা, কিছুসংখ্যক রাজতন্ত্রী রাজ্য এ আহ্বানে সাড়া দিতেও পারে। আরব বিভাজন হবে বাস্তবে আত্মঘাতী। আর ট্রাম্প এই চুক্তিকে যে আগামী নভেম্বর নির্বাচনে কাজে লাগাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অতএব, সাধু সাবধান।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

মন্তব্য