kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সাইবার অপরাধ দমনে আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সাইবার অপরাধ দমনে আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি

সম্প্রতি কালের কণ্ঠে প্রকাশিত ‘সাইবার অপরাধ মাথাচাড়া দিচ্ছে’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে সাইবার অপরাধ নিয়ে সুস্পষ্ট একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ওই সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে যে একটি গোষ্ঠী ৫১ তরুণীকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে। এসব তরুণীর বেশির ভাগই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম ডিভিশন ওই সব তরুণীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে। এমন সম্পাদকীয় সংবাদ থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে অপরাধের ধরন ক্রমেই পাল্টাচ্ছে। বর্তমানে প্রযুক্তিগত অপরাধের মাত্রা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি এবং ভয়াবহ। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত অপরাধের শিকার হচ্ছেন সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও। কিন্তু সেই তুলনায় প্রযুক্তি ব্যবহারগত নিরাপত্তার মাত্রা বাড়ছে কি না, সেটি একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, ডিজিটাল প্রায়োগিকতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় ইন্টারনেট ব্যবহারের মাত্রা বাড়লেও সাইবার নিরাপত্তা তুলনামূলকভাবে বাড়েনি বললেই চলে।

দুই বছর আগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সাইবার অপরাধ দমনে সরকার নানা ধরনের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এরই মধ্যে সাইবার ট্রাইব্যুনাল কার্যক্রম দৃশ্যমান হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে গঠন করা হয়েছে সাইবার ইউনিট। উল্লেখ্য, গত ১৭ সেপ্টেম্বর ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধে অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) সাইবার অপরাধ ইউনিটের যাত্রা শুরু হয়েছে। সাইবার অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণে দেশের মধ্যে রাজশাহীতে এটি পুলিশের তৃতীয় ইউনিট।

ডিজিটাল আইন, সাইবার অপরাধ দমনে নানা ধরনের উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে সম্প্রতি অপরাধপ্রবণতা কিছুটা বেড়েছে। সংবাদমাধ্যমে সাইবার অপরাধের খবর নিত্য হয়ে উঠেছে। শিশুরাও নানাভাবে এই সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। এমনকি প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার। শিশুদের মধ্যেও এই প্রবণতা লক্ষণীয় মাত্রায় দেখা যাচ্ছে। অভিভাবকরা সচেতন না থাকায় শিশুদের সাইবারজগতের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশে প্রতিরোধ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। ফলে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে শিশু ও কিশোররা।

মাত্র দুই বছরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। এসব মামলার বেশির ভাগই সাইবার অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত। ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে অহরহ ঘটে চলেছে সাইবার অপরাধ। একটি থেকে আরেকটিকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব। সাইবার অপরাধীদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায়ও আনার সুযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য, ডিজিটাল আইন পাস হওয়ার পর থেকে গত ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে ৭৩৪টি মামলা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন থানায় করা আরো ৩৩০টি মামলা বিচারের জন্য এই ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে।

আগের আইসিটি আইন ও বর্তমান ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা সারা দেশের মামলাগুলোর বিচার হচ্ছে ঢাকা সাইবার ট্রাইব্যুনালে। এই আদালতে এ পর্যন্ত বিচারের জন্য মামলা এসেছে দুই হাজার ৬৮২টি। এর অর্ধেকের বেশি আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় করা মামলা। ২০১৩ সালে সাইবার ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য পাঠানো মামলার সংখ্যা ছিল তিন। ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩-এ। পরের বছর মামলা আসে ১৫২টি। ২০১৬ সালে আসে ২৩৩টি। এই সংখ্যা পরের বছর দ্বিগুণের বেশি, ৫৬৮। ২০১৮ সালে ৬৭৬, ২০১৯ সালে ৭২১ এবং চলতি বছরের ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিচারের জন্য আসা মামলার সংখ্যা ২৯৬। অর্থাৎ সাত বছরের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিচারের জন্য আসা মোট মামলা দুই হাজার ৬৮২টি। এ পরিসংখ্যান থেকেই ধারণা করা যায়, ডিজিটাল এবং সাইবার নিরাপত্তার শঙ্কা কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

দেশে সাধারণত ১৩ ধরনের সাইবার অপরাধের ঘটনা ঘটছে। দেশে সাইবার অপরাধের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি দিন দিন বাড়ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এসংক্রান্ত মামলা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে স্ট্যাটাস, কমেন্ট ও ব্যক্তিগত বার্তার মাধ্যমে হেনস্তার শিকার হচ্ছে বহুসংখ্যক নারী। পাবলিক পোস্টগুলোর কমেন্ট সেকশনে নারীদের নানা ধরনের বাজে মন্তব্য, হয়রানি এবং ট্রলের মুখে পড়তে হচ্ছে। একজন পুরুষ তার মন্তব্য যেভাবে প্রকাশ করতে পারছে, নারী সেভাবে পারছে না।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের হিসাব অনুযায়ী ২০১৮ সালে তাদের কাছে সরাসরি এক হাজার ৭৬৫টি অভিযোগ জমা পড়েছিল। এ ছাড়া হ্যালো সিটি অ্যাপস, ফেসবুক, মেইল ও হেল্প ডেস্কের মাধ্যমে অভিযোগ এসেছে ছয় হাজার ৩০০টি। ২০১৯ সালে সরাসরি অভিযোগের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৯৩২-এ। আর হ্যালো সিটি অ্যাপস, ফেসবুক, মেইল ও হেল্প ডেস্কের মাধ্যমে অভিযোগ এসেছিল ৯ হাজার ২২৭টি। সাইবার ক্রাইম বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আগে সাইবার অপরাধ বিষয়ক বেশি অভিযোগ আসত নারীদের কাছ থেকে। এখন সমান্তরালভাবে পুরুষরাও সাইবার ক্রাইমের শিকার হচ্ছে। ২০১৯ সালে মোট অভিযোগের ৫৩ শতাংশ এসেছে পুরুষদের কাছ থেকে আর বাকি ৪৭ শতাংশ এসেছে নারীদের কাছ থেকে। সারা দেশে এই চিত্র আরো কতটা ভয়াবহ হতে পারে তার যথাযথ পরিসংখ্যান অনুসন্ধান এবং সেগুলোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

সাইবার অপরাধ যে হারে বাড়ছে, সেই হারে অপরাধ প্রতিরোধে লোকবল বাড়ানো এবং যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। সাইবার অপরাধ ঠেকাতে যে ধরনের ফরেনসিক ল্যাবরেটরি প্রয়োজন, সে রকম ফরেনসিক ল্যাবরেটরি এখনো স্থাপন করা যায়নি। মামলার তদন্তে এবং বিচারিক কার্যক্রমে ডিজিটাল সাক্ষ্য উপস্থাপনেও যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে। ফলে সাইবার অপরাধীদের আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে সাইবার অপরাধীরা যে একেবারেই বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে, সেই শঙ্কা অমূলক নয়। আবার সাইবার নিরাপত্তা যথাযথভাবে না হলে অনলাইন তথা ভার্চুয়ালজগতে দেশের তরুণদের পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের উপযুক্তভাবে ভার্চুয়ালজগতে টিকিয়ে রাখতে হলে সাইবার নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দক্ষ জনবল নিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যমান সব ধরনের আইনের যথাযথ প্রয়োগ অনস্বীকার্য।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা