kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সবচেয়ে প্রস্তুত রাষ্ট্রটি ট্রাম্পে এসে খাবি খেল!

নিকোলাস ক্রিস্টফ

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সবচেয়ে প্রস্তুত রাষ্ট্রটি ট্রাম্পে এসে খাবি খেল!

করোনাভাইরাসের বিপদ সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যত দ্রুত অবগত হয়েছিলেন তা ঠেকাতে যদি তত দ্রুত ব্যবস্থা নিতেন, তাহলে আজকের আমেরিকা কেমন থাকত? গত ২৮ জানুয়ারি ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণের একটি সুযোগ তাঁর সামনে এসেছিল। ওই দিন তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট সি ও’ব্রায়েন তাঁকে বলেছিলেন, ‘আপনার প্রেসিডেন্সিতে করোনাভাইরাস হবে সবচেয়ে বড় জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি।’ কিন্তু ট্রাম্প সেই সতর্কতা এড়িয়ে গেলেন। উল্টো কয়েক দিন পর তিনি বব উডওয়ার্ডের (প্রখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক) কাছে জানতে চান, ভাইরাসটি আসলেই কতটা মারাত্মক ও সংক্রামক। উডওয়ার্ডের নতুন বই ‘রেজ’-এর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

সতর্কতা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ফ্লুর সঙ্গে তুলনা দিয়ে ভাইরাসটিকে গুরুত্বহীন করে জনগণকে বিভ্রান্ত করলেন। তিনি বললেন, এটা চলে যাবে। তিনি তখন মাস্কের বিরোধিতা করলেন, বিশেষজ্ঞদের সাইডলাইনে ঠেলে দিলেন, বড় বড় সমাবেশ করলেন, লকডাউনের সমালোচনা করলেন এবং একই সঙ্গে কভিড-১৯ পরীক্ষার ব্যবস্থা ও সুরক্ষাসামগ্রী প্রস্তুত রাখতে ব্যর্থ হলেন। এর ফল কী হলো? যেখানে আমেরিকানরা বিশ্ব জনসংখ্যার ৪ শতাংশ, সেখানে আজ করোনাভাইরাসজনিত মৃত্যুতে আমরা বিশ্বের ২২ শতাংশ স্থান দখল করে নিয়েছি।

ধরুন, ট্রাম্প গত জানুয়ারি এমনকি ফেব্রুয়ারি মাসেও যদি জনগণকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করতেন, ব্যাপকভাবে পরীক্ষা উপকরণ বিতরণের নিশ্চয়তা দিতেন (যদিও সিয়েরা লিওনের মতো রাষ্ট্রও যুক্তরাষ্ট্রের আগেই তা করেছিল) এবং একটি শক্তিশালী কন্টাক্ট ট্রেসিং সিস্টেম গড়ে তুলতেন (তখন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও উন্নত কন্টাক্ট ট্রেসিং ব্যবস্থা ছিল কঙ্গোর); তাহলে কেমন দাঁড়াত পরিস্থিতি? কিংবা তিনি যদি মেক্সিকো সীমান্তে তাঁর দেয়াল নির্মাণের মতোই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অটল থাকতেন?

কভিড-১৯-এর কারণে ট্রাম্প নিজেকে যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট বলে দাবি করছেন। অথচ তিনি এমন যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট, যিনি নিজের জেনারেলদের কথা শুনলেন না, কখনো গোলাবারুদের আদেশ দিলেন না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফোর্ড প্লান্টকে প্রতি ঘণ্টায় একটি বি-২৪ বোম্বার তৈরির উপযোগী করে রাখা হয়েছিল। অথচ আমরা এখন পর্যন্ত কোনো জরুরি ব্যবস্থাই তুলে ধরতে পারিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও অনেক দ্রুতগতিতে ভাইরাসে মারা যাচ্ছে আমেরিকানরা।

এমন নয় যে মহামারি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র অপ্রস্তুত ছিল। ২০১৯ সালের অক্টোবরে ৩২৪ পৃষ্ঠার এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে মহামারি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রই হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রস্তুত রাষ্ট্র। এখন এটা কল্পনা করা যায় না যে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশ ভাইরাসটির মোকাবেলায় এভাবে খাবি খাবে।

এ বিষয়ে স্মল পক্স নির্মূলে অবদান রাখা রোগ নিয়ন্ত্রণ বিশারদ ল্যারি ব্রিলিয়ান্ট আমাকে বললেন, ‘আপনার-আমার করার সম্ভাবনা আছে এমন প্রতিটি পদক্ষেপেই প্রশাসন ভুল করে গেছে। আমরা এটাকে ঠেকাতে পারতম। এখন যে ঘটনাগুলো ঘটছে, তা ঠেকিয়ে দিতে পারতাম।’

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জেফরি শামান হিসাব করে দেখিয়েছেন যে যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি কাউন্টি মাত্র দুই সপ্তাহ আগে লকডাউন বা অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিত, তাহলে মে মাসের শুরু থেকে দেশটিতে ৯০ শতাংশ মৃত্যু এড়ানো যেতে পারত। তিনি আমাকে আরো জানিয়েছেন যে তাঁর দল জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারির কোনো প্রতিরোধ মডেল তৈরি করেনি। তবে তিনি বিশ্বাস করেন যে ওই সময় ব্যবস্থা নিতে পারলে যুক্তরাষ্ট্র কভিড-১৯-এর দক্ষিণ কোরিয়ার মৃত্যুহার নিয়ে স্বস্তিতে থাকত। এর অর্থ হতো, যুক্তরাষ্ট্র তার মৃত্যুহার ৯৯ শতাংশ কমিয়ে আনতে পারত।

ভার্জিনিয়া টেকের সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ লিনজে মার অবশ্য দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানি মৃত্যুহার অর্জন নিয়ে নিশ্চিত নন। কারণ উভয় দেশেরই মাস্ক পরার অনেক বেশি ঐতিহ্য রয়েছে। তবে তিনিও বিশ্বাস করেন, আমরা সম্ভবত জার্মান মাত্রাটি অর্জন করতে পারতাম। এর অর্থ হলো মার্কিনদের মৃত্যুহার ৮০ শতাংশ কমানো যেত।

ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার সংক্রমণ রোগ বিশেষজ্ঞ নাতালি ডিন বলেন, তিনি মানুষের শেষ হয়ে যাওয়া দেখে কষ্ট পাচ্ছেন। কারণ নির্বিকারভাবে এমন এক মৃত্যু সংখ্যা দেখতে হচ্ছে যে প্রতিদিন তা এক হাজার করে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শত বছর আগে ১৯১৮ সালের মহামারির সময় জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা মাস্ক পরায় উৎসাহ দেওয়ার বিষয়ে যেসব মৌলিক পদক্ষেপ চেয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো সে রকম মৌলিক কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি। বরং  মনে হচ্ছে, তিনি টিকা আসা পর্যন্ত ভাইরাসের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। অথচ সমর্থকদের ঠিকই বিভ্রান্তিতে উৎসাহ জোগাচ্ছেন। এক সমর্থক তো সেদিন ট্রাম্পের এক সমাবেশে সিএনএনকে বললেন, ‘কোনো কভিড নেই। এটা নকল মহামারি।’

এখন কথা হচ্ছে, একটি মহামারি মোকাবেলা যখন রাজনীতিতে পরিণত হয়, নেতৃত্ব যখন এতটা অনুপস্থিত থাকে, স্বাস্থ্য বার্তা যখন এতটা বিভ্রান্তিকর হয়ে পড়ে, বিজ্ঞান যখন এতটা কোণঠাসা হয়ে পড়ে; তখন এটা বোঝার বাকি থাকে না যে একটি দেশ বিশ্বে কিভাবে মহামারি মোকাবেলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুত থাকতে পারে, যার এক লাখ ৯০ হাজার নাগরিক একটি ভাইরাসে শেষ হয়ে যায়।

লেখক : দুইবারের পুলিত্জার পুরস্কার বিজয়ী সাংবাদিক

সূত্র : নিউ ইয়র্ক টাইমস

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা