kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

নতুন আইন নয় সংশোধন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ

মো. শাহাদাৎ হোসেন এফসিএ   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নতুন আইন নয় সংশোধন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ

গত ২৪ আগস্ট মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভায় এই মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত অর্থাৎ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সরকারের সময়কালে প্রণীত কোনো আইন সংশোধনের প্রয়োজন হলে সেগুলো নতুন আইন না করে সংশোধন আকারে হবে (২৫ আগস্ট ২০২০ তারিখের বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত)। মন্ত্রিপরিষদের এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী। দেশের বিশেষ কোনো সেক্টর বা কোনো কার্যক্রমকে সঠিক ব্যবস্থাপনা বা নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করার জন্য সরকার আইন প্রণয়ন করে থাকে। পরিবর্তিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সে আইন সংশোধন করার প্রয়োজন হয় এবং সরকার সংশোধন করে থাকে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নের পেছনের ইতিহাস ভিন্নতর হয়ে থাকে। আমাদের দেশের জন্য তেমনি একটি ভিন্নতর সময়কাল ছিল ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত। এই সময়কালে সরকারের দায়িত্বে ছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু যে অবস্থায় দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন সে সম্পর্কে বলতে গেলে এককথায় বলতে হয়, নিষ্ঠুর ঔপনিবেশিক শোষণের অবসানে ৩০ লাখ শহীদের আত্মোৎসর্গের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেল, তখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি বলতে কিছুই ছিল না, তা ধ্বংসের শেষ সীমায় পৌঁছেছিল। দেশের সংবিধান প্রণয়ন করা হয় ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর। সংবিধান প্রণয়নের আগে বিভিন্ন বিষয়ে বেশ কিছু আদেশ জারি করা হয়, যা সংবিধানে যুক্ত করা হয়। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু সরকার সংবিধান প্রণয়নের পর ১৯৭৩ সালে আরো অনেক আদেশ জারি করে।

একটি রাষ্ট্র সৃষ্টির পেছনে থাকে লম্বা ইতিহাস। ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাক্ষরিত প্রথম সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রথম প্যারায় বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাস সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়, ‘আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।’ স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে, জাতীয় আয়সহ মাথাপিছু আয় অনেক বেড়েছে। বেড়েছে গড় আয়ু। সামাজিক, প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু দেশের ইতিহাস কোনো দিন পরিবর্তন হতে পারে না।

দেশ প্রতিষ্ঠালাভের সঙ্গে সঙ্গেই দাঁড় করানো হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রাষ্ট্রের অর্থ সংগ্রহের জন্য রাজস্ব বোর্ড, ঋণদানের জন্য ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। উদাহরণস্বরূপ সদ্যঃস্বাধীন দেশের আর্থিক নীতি, ঋণ সরবরাহ, বৈদেশিক বিনিময় ইত্যাদি বিষয় সঠিক পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য নিয়ে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ ১৯৭২’-এর মাধ্যমে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক যখন প্রতিষ্ঠা করা হয় তখন দেশের ব্যাংকিং অবস্থা বিশ্লেষণে লক্ষ করা যায়, দেশের ব্যাংকে এক আনার বৈদেশিক মুদ্রা ও গোল্ড রিজার্ভ ছিল না। বরং বাংলাদেশে প্রচলিত সাবেক পাকিস্তান সরকারের কিছু দায় গ্রহণ করতে হয়েছিল, যার মুদ্রাঙ্কের সমর্থনে ব্যবহূত সোনা ও অন্যান্য জামানত করাচিতে সংরক্ষণ করা হতো বলে এ সম্পদ থেকে দেশ বঞ্চিত হয়েছিল। দেশের বন্দর দুটি কার্যক্রমে না থাকায় রপ্তানির প্রবাহ ব্যাহত ছিল বিধায় বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের পথও ছিল বন্ধ। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে যে আদেশ জারি করা হয়, তা ওই অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্য নিয়ে করা হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়। যুদ্ধ চলাকালে কৃষিতে অনেক ক্ষতি সাধিত হয়েছিল এবং দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কৃষির উন্নয়নের ওপর বেশ গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ জাতীয়করণের নীতি ঘোষণা উপলক্ষে বেতার-টেলিভিশনে ভাষণদানকালে কৃষিব্যবস্থা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমাদের সমাজে চাষিরা হলো সবচেয়ে দুঃখী ও নির্যাতিত শ্রেণি এবং তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য আমাদের উদ্যোগের বিরাট অংশ অবশ্যই তাদের পেছনে নিয়োজিত করতে হবে।’ কৃষির প্রতি বঙ্গবন্ধুর এমন পরিকল্পনার সময়ই কৃষিক্ষেত্রে ঋণদানের অন্যতম প্রতিষ্ঠান কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জারি করা হয় ‘বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক আদেশ ১৯৭৩’। এমনিভাবে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত জারীকৃত প্রতিটি আইনের পেছনে আছে সেই সময়ের প্রেক্ষাপট। আইনগুলোর যতই বয়স হচ্ছে দেশের সার্বিক অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে এবং পরিবর্তিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আইনগুলো পরিবর্তনের প্রয়োজন হচ্ছে। তবে যদি ওই আইনগুলো রহিত করে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয় তাহলে আশঙ্কা করা যায় যে তখনকার যে প্রেক্ষাপটে ওই আইনগুলো প্রণয়ন করা হয়েছিল তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অজানা থেকে যাবে, যা মোটেই কাম্য নয়। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিপরিষদে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তা এই আশঙ্কাকে দূর করবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ইচ্ছা করলেও সেই ইচ্ছা যেন দায়িত্বে পরিণত হয়। প্রথমত, বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে জারীকৃত একটি আদেশ হালনাগাদকরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আদেশটি রহিত করে আইনে রূপান্তরিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। আদেশটি রহিত করে আইনে রূপান্তরিত করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ক্ষুণ্ন হতে পারে আশঙ্কায় ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি নিজের কাছে গ্রহণযোগ্য না হওয়ার কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘরের কিউরেটর মো. নজরুল ইসলাম খানের সহায়তায় বিষয়টি গত ১৫ আগস্ট মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে নিয়ে আসা হয়। প্রধানমন্ত্রী ২৪ আগস্ট মন্ত্রিসভায় যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তা ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি রক্ষার ক্ষুদ্র প্রয়াসের সফল বাস্তবায়নই প্রকাশ করে। দ্বিতীয়ত, আমি পেশায় একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সদস্য। আইসিএবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৩ সালের ৬ জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় রাষ্ট্রপতির আদেশ ২-এর মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু এই হিসাব পেশার এতটাই গুরুত্ব দিয়েছিলেন যে দেশ স্বাধীনতা লাভ করার মাত্র এক বছরের মাথায় প্রতিষ্ঠা করেন এই ইনস্টিটিউট। আর বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভায় এমন একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে সিদ্ধান্তের ফলস্বরূপ বাংলাদেশের হিসাব পেশার অন্যতম নিদর্শন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আইসিএবি এর ইতিহাস প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তের জন্য জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

লেখক : সাবেক সহসভাপতি, দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা