kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

দীর্ঘমেয়াদি মানসিক মাসুল নেবে কভিড-১৯

এমা গোল্ডবার্গ

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নিজের প্রথম করোনাভাইরাস রোগীকে টানা ৪০ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা দিয়ে গত ৩০ মার্চ গলায় কাশি নিয়ে বাড়িতে ফেরেন অ্যাঞ্জেলা অ্যাস্টন। বুঝতে পারেন তিনি কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন। তবে একজন নার্স প্র্যাকটিশনার্স হিসেবে অ্যাস্টন (৫০) আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, তিনি এই লক্ষণগুলো ভালোভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারবেন। এর পরপর তিনি নিজের শয়নকক্ষে কোয়ারেন্টিনে চলে যান।

তবে অ্যাস্টনের অসুস্থতা যখন ৫০ দিনে গিয়ে গড়াল, তত দিনে তাঁর সব আত্মবিশ্বাস উধাও। মে মাসের শেষ পর্যন্তও তিনি প্রতিদিনই জ্বর ও অবসাদে ভোগেন। এভাবে আট সপ্তাহ অসুস্থ থেকে তিনি যখন বারবার একই কষ্টের কথা সহকর্মী, বন্ধু ও পরিবারকে বলতেন, তিনি হতাশ হয়ে পড়তেন।

এভাবে মানসিকভাবে যখন বিধ্বস্ত হয়ে পড়ার মতো অবস্থা, তখন মিসেস অ্যাস্টন একটি অনলাইন সাপোর্ট গ্রুপে প্রশান্তি খোঁজে পান। বডি পলিটিক নামের একটি জনকল্যাণমূলক সংগঠন এই গ্রুপ পরিচালনা করে, যেখানে সাত হাজারের বেশি মানুষ কষ্টকর অভিজ্ঞতা শেয়ার করে। তারা সবাই কভিড-১৯-এর দীর্ঘমেয়াদি বাহক (লং হলার)  হিসেবে মাসের পর মাস অসুস্থতায় ভুগছে।

মহামারির শুরুর দিকে রোগী এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সবার মধ্যেই ব্যাপক জনশ্রুতি ছড়িয়ে পড়ে যে কভিড-১৯ হলো একটি স্বল্পমেয়াদি অসুস্থতা। তবে কয়েক মাস ধরে এর দীর্ঘমেয়াদি বাহকদের প্রতি মনোযোগ পড়েছে। এ নিয়ে বডি পলিটিক ও সারভাইভার কর্পসের মতো অনলাইন সাপোর্ট গ্রুপগুলো অনানুষ্ঠানিক জরিপ চালিয়েছে।

ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি অব মেডিসিনের স্বাস্থ্য গবেষক নাতালিয়ে ল্যামবার্ট সম্প্রতি সারভাইভার কর্পসের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে কভিড-১৯-এর দেড় হাজার দীর্ঘমেয়াদি বাহকের ওপর জরিপ চালিয়েছেন। তাতে দেখা গেছে, এমন রোগীদের মধ্যে অষ্টম শীর্ষ লক্ষণ হচ্ছে উদ্বিগ্নতা, যাতে ৭০০ জনের বেশি আক্রান্ত। এর পরই রয়েছে বিষণ্নতা। এ ছাড়া ম্যারিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিনের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. তিওডোর পোস্তোলেচ আলাদা গবেষণায় দেখেছেন, এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক কভিড-১৯ রোগী উদ্বেগ, বিষণ্নতা, দুর্বলতার মতো মানসিক সমস্যায় ভুগছে। আবার সংক্রমিত না হয়েও মহামারি অব্যাহত থাকায় অনেক মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর মেন্টাল ইলনেস জানিয়েছে, তাদের হেল্প লাইনে মানসিক রোগের সেবা নেওয়া লোকদের সংখ্যা এখন ৬৫ শতাংশ বেড়ে গেছে।

দীর্ঘমেয়াদি বাহকদের মধ্যে বাল্টিমোরের মিডল স্কুলের শিক্ষক চিমার্স স্মিথ ছয় মাস ধরে কভিড-১৯ বহন করছেন। গত ২২ মার্চ তাঁর রোগটি শনাক্ত হয়। এর পর থেকে তাঁকে ১২ বারের মতো হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেতে হয়েছে। কষ্টের কারণে আত্মহননের কথা চিন্তা করতেন তিনি। পরে তিনি অনলাইন সাপোর্ট গ্রুপ বডি পলিটিক ও সারভাইভার কর্পসের সহায়তা পান এবং উন্নতি লাভ করেন। লস অ্যাঞ্জেলেসের অ্যাঞ্জেলা ভাসকুয়েজ নামের এক দীর্ঘমেয়াদি রোগী বলেন, ‘আমার একেকটি লক্ষণ এত কষ্টকর ছিল, যেন কয়েক ডজন মানুষের কষ্ট আমি একা পাচ্ছি।’ অবশ্য তারা এভাবে অনলাইনসেবা নিলেও এর কিছু ঝুঁকিও আছে। কারণ রোগ সম্পর্কে ভুল তথ্য ছড়ানোর আশঙ্কা প্রবল এবং তা বন্ধেরও ব্যবস্থা নেই।

মানসিক চাপ কমানোর জন্য সাধারণত মানুষ সামাজিক ও শারীরিক তৎপরতার ওপর নির্ভর করে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি রোগীরা তাতে অক্ষম। ল্যাম্বার্টের গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যায়াম কিংবা অন্যান্য শারীরিক তৎপরতায় অক্ষমতা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি কভিড রোগীদের পঞ্চম শীর্ষ লক্ষণ, যা ৯১৬ জন রোগীর মধ্যে পাওয়া গেছে। আবার অনেক দীর্ঘমেয়াদি বাহকরা বলছেন, তাঁদের বন্ধুবান্ধব, পরিবার, এমনকি চিকিৎসা সেবাদানকারীরা যখন তাঁদের লক্ষণগুলো নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকেন, তখন তাঁরা মানসিক সমস্যায় ভুগতে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রে মানসিক চিকিৎসাবিষয়ক সংগঠন ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব মেন্টাল হেলথের জরিপে দেখা গেছে, কাজ করতে অক্ষমতা এবং নিজেদের অনুৎপাদনশীল ভাবা মানসিক স্বাস্থ্যের বড় ক্ষতি করছে।

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে দীর্ঘমেয়াদি কভিড-১৯ রোগীদের জন্য সহায়ক মানসিক সম্পদ হচ্ছে বন্ধুবান্ধব, পরিবার ও সহকর্মীদের সমর্থন। ড. ল্যাম্বার্টের বলেছেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় জড়িত চিকিৎসকদের প্রতি তাঁর আহ্বান হচ্ছে করোনার নিত্যনতুন গবেষণার বিষয়ে আপডেট থাকা, যাতে তাঁরা রোগীদের সঠিক তথ্য দিয়ে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখতে পারেন। আর ক্লিনিক্যাল গবেষকদের প্রতি তাঁর আহ্বান, তাঁরা যেন রোগীর মানসিক স্বাস্থ্য ও রোগটির মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রাখেন।

সূত্র : দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

লেখক : নিউ ইয়র্ক টাইমসের এডিটরিয়াল বডির গবেষক

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা