kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের শিকল ভাঙতে হবে

এ কে এম শাহনাওয়াজ   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের শিকল ভাঙতে হবে

যখন চলমান সময় স্বস্তি দিতে পারে না; সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি—সব ক্ষেত্রে স্থবিরতা, যুক্তিহীনতা, অন্যায় ও অমানবিকতা মানুষকে হতাশ করে দেয়; সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আসে বন্ধ্যত্ব তখন বেঁচে থাকার-এগিয়ে চলার আশায় আশ্বাসে মানুষ শুভ্র, নিষ্কলঙ্ক নতুন সকালের প্রত্যাশা করে। বদলে যাওয়া নতুন দিনের জন্য তাই অসহায় মানুষের ব্যাকুল প্রতীক্ষা। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতি কখনো স্থিতিশীলতা নিয়ে যৌক্তিক জায়গায় দাঁড়াতে পারেনি। এবার আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনক্ষমতাকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তা ও ঐকান্তিকতায় উন্নয়নের পথে পা দিয়ে দেশবাসী যখন নতুন ও উজ্জ্বল ভোরের স্বপ্ন দেখছে তখনই লাগামছাড়া দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন রাহুর ছায়া ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে।

উনিশ শতকের ইংরেজ ঐতিহাসিক আর্নল্ড টয়েনবি তাঁর বিখ্যাত সূত্র ‘Theory of Challenge and Response’ প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন, বিরুদ্ধ প্রকৃতি-পরিবেশ সব প্রাণীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একে মোকাবেলা করতে পারলেই টিকে থাকা, নয়তো হারিয়ে যাওয়া। লাখ লাখ বছর ধরে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে তেলাপোকা টিকে থাকলেও বরফযুগের অতিকায় প্রাণী ম্যামথ রূপান্তরিত উষ্ণ প্রকৃতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে নির্বংশ হয়েছে। আমরা এখন আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক জীবনসংগ্রামের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছি। বিএনপি-জামায়াত পরিচালিত জোট সরকারের সময় অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, সন্ত্রাসের বাড়বাড়ন্ত একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিল এ দেশের মানুষকে। রাজনৈতিক সংঘাত ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল। সব চরমই ধ্বংস বা রূপান্তরের পথ তৈরি করে। আমাদের সংঘাতের রাজনীতি পথ করে দিল রূপান্তরের। বিবদমান রাজনীতিকরাই ডেকে এনেছিলেন বিশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার। অতঃপর দুই বছরের চড়াই-উতরাইয়ে বড় সাফল্য একটি অবাধ নির্বাচনের পথ তৈরি হওয়া। দীর্ঘ সংগ্রামী ঐতিহ্য ধারণ করা বাঙালির বড় সুবিধা হাজার সংকটের পরও বারবার ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। নির্বাচন সামনে রেখে আবার স্বপ্ন বোনে। সেবার সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল আওয়ামী লীগ। জোট সরকারের শাসনকালের অপকীর্তি মুক্তমনের ভোটারকে বিক্ষুব্ধ করেছিল। বিপুলসংখ্যক ভুয়া ভোটার তালিকা ও সাজানো নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসন কর্মকর্তাদের বিন্যাস অকার্যকর হয়ে যাওয়ায় কার্যত বিএনপি ব্যাকফুটে চলে গিয়েছিল। নির্বাচনের মাঠে জামায়াত কখনো খুব ধর্তব্যের মধ্যে থাকে না। অতীতের নানা হতাশার কথা ভুলে মানুষ গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার আশায় ঐতিহ্যিক দল আওয়ামী লীগকেই মন্দের ভালো বলে বিবেচনা করছিল।

সবাই ভেবেছিল আন্তরিকতা নিয়েই আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিন বদলাতে চায়। অর্থাত্ অন্ধকারাচ্ছন্ন জরাগ্রস্ত দিনের শাপমুক্তি ঘটিয়ে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে টেনে নেওয়ার মতো নতুন দিনের যাত্রা শুরু করবে মহাজোট সরকার। সুন্দর সকাল দেখার স্বপ্নে বিভোর এ দেশের মানুষ সরল হিসাব কষেছিল। ভেবেছিল ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগ অনুকূল পরিবেশ পেলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী হবে। অতীতের ভুলভ্রান্তিগুলো এ বেলা শুধরে নেবে। অন্যায়, দুর্নীতি, সন্ত্রাস বিএনপিকে কিভাবে জনবিচ্ছিন্ন করেছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কাছে থেকে দেখেছে। উপরি পাওনা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ স্নাত এই দলটি পেয়েছে বিপুল জনসমর্থন। এসব কারণে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভেবেছিল এ দেশের নষ্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে জাতি এবার আওয়ামী লীগের হাত ধরে বেরিয়ে আসবে। ইতিবাচক রাজনীতির ধারায় ফিরবে দেশ। নেতৃত্বের মনোবল এবার আকাশছোঁয়া হবে। দলীয়করণের সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে নিঃশঙ্কচিত্তে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির দেশপ্রেমিক মানুষকে কাছে টেনে বন্ধু বাড়াবে। তারপর দিন বদলে দেওয়ার কঠিন অথচ মহত্ সংগ্রামে সবাই একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

কিন্তু প্রকৃত অর্থে আমাদের দেশের ক্ষমতার রাজনীতি আইনের শাসনকে স্বাধীন হতে দিল না। চলমান এই বাস্তবতা দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে বেপরোয়া করে তোলে। ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপির দুর্নীতিকে উন্মোচন করেছিল। হয়তো ক্ষমতায় থাকার সুবিধা তাদের দুর্নীতিবাজ করে তুলেছিল। আওয়ামী লীগ নেতাদের দুর্নীতির কিছু খতিয়ানও প্রকাশ্যে আসে। তবে বিএনপির তুলনায় তা ছিল নস্যি। হয়তো ক্ষমতায় না থাকার অসুবিধা এ ক্ষেত্রে কাজ করেছে। হেভিওয়েট দুর্নীতিবাজরা সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে আইনের হাতে ধরাশায়ী হয়েছিল তখন। এই ভূমিকম্পের পর এ দেশের স্বাপ্নিক মানুষ আশা করেছিল বিএনপির দুর্নীতিবাজদের পরিণতি দেখে অন্যরা শিক্ষা নেবে; কিন্তু বর্তমান সময়ে দুর্নীতিবাজরা সে শিক্ষা নিয়েছে বলে মনে হয় না। এ কারণে আইনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এ দেশের প্রায় প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে ঘুষ একটি অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের মধ্যে দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির খতিয়ান।

বড় বড় দুর্নীতিবাজ তো রাজনৈতিক শক্তিমানদের প্রশ্রয়েই পায়ের নিচের মাটি শক্ত করে। পাপুল, পাপিয়া, সাহেদ, সাবরিনারা এতটা পথ হাঁটতে পেরেছেন কেন, তা বুঝতে সাধারণ মানুষের তেমন অসুবিধা হয় না। বড় দাগে সরকারি টাকা লোপাট খুঁটি শক্ত না থাকলে কি আর করা যায়! রূপপুরের বালিশকাণ্ডের পর মনে হচ্ছিল সমুদ্রচোররা হয়তো সংযত হবে। কিন্তু সম্প্রতি এক জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পড়ে  তো থ বনে যেতে হলো। কত নির্বিঘ্নেই না বিশাল বিশাল দুর্নীতি করা সম্ভব এ দেশে। এবার প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ হরিলুটের কাহিনি। এই প্রকল্পে বরাদ্দ টাকা ছিল চার হাজার ২৮০ কোটি। এর মধ্যে তিন হাজার ৮৮৫ কোটিই বিশ্বব্যাংকের ঋণ। ঋণের টাকায় এখানে ঘি খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। এবার সমুদ্র নয়, মনে হয় মহাসমুদ্রচুরি। দুধে পানির পরিমাণ পরীক্ষার একটি যন্ত্রের বাজারমূল্য প্রকারভেদে ৬০ টাকা থেকে আট হাজার টাকা। অথচ টাকা বরাদ্দ হয়েছে তিন লাখ ৩২ হাজার। বর্জ্য রাখার একটি পাত্র কেনা যায় ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকায়। কিন্তু বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে আড়াই লাখ টাকা। প্রকল্প পরিচালকের অতিথির বসার চেয়ারের মূল্য বাজারদর সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার টাকা হলেও পাস করা হয়েছে ছয় লাখ। গাভি গর্ভবতী হওয়া না হওয়ার পরীক্ষার জন্য এক ইউনিট কিটের বাজারমূল্য রকমভেদে ৯০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকা হলেও প্রকল্পের প্রস্তাবিত দাম ২৪ লাখ ১৫ হাজার। আর প্রকল্প কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে তো টাকার ফোয়ারা বইয়ে দেওয়া হয়েছে।

এমন ভয়ংকর বাস্তবতা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে অর্থাত্ দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন রোধ করতে হলে আইনের যথাযথ প্রয়োগের বিকল্প নেই। রাতের পরে দিন আসবে। এভাবে ঘুরে আসবে নতুন বছর; কিন্তু দিন বদলাবে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন রোধ করতে পারলেই সম্ভব নতুন সূর্যোদয়ের। না হলে পদ্মা সেতু হবে, মেট্রো রেল হবে, আরো দৃশ্যমান উন্নয়নও হয়তো আমরা দেখব। কিন্তু দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের পাগলা ঘোড়াকে থামাতে না পারলে সব কিছুই যে অর্থহীন হয়ে যাবে, তা কি আমাদের নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পারছেন? দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের শিকল ভাঙতে না পারলে সব আশার আলোই একসময় ম্লান হয়ে যাবে।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা