kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

ক্ষতির কারণ হবে টিকা জাতীয়তাবাদ

তেদরোস আধানোম গেব্রিয়াসুস

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ক্ষতির কারণ হবে টিকা জাতীয়তাবাদ

দুর্ভোগ পোহাচ্ছে বিশ্ব, কিন্তু আলোর রেখাও দেখা যাচ্ছে। কভিড-১৯-এর বেশ কয়েকটি টিকা পরীক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। অনেক কারখানা এরই মধ্যে ডোজ উৎপাদন শুরু করেছে। তারা আশা রাখছে, এগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যাবে। ফলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে থাকা লোকজনকে টিকা দেওয়ার ব্যাপক আকারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন আমরা যদি আমাদের রক্ষীদের আশাহত না করি, তাহলে করোনাভাইরাসসৃষ্ট স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকট সমাপ্তির শুরু করা নিয়ে ভাবনাটা অসম্ভব কিছু নয়।

তবে অগ্রগতির পথে বাধাও আছে। সেটা হচ্ছে টিকা জাতীয়তাবাদ, যাতে কিছু দেশ নিজেদের টিকা নিয়ে একা থাকতে চায়। কিন্তু মহামারিকে যদি দ্রুত ও কার্যকরভাবে থামাতে হয়, তাহলে বিশ্বকে এই টিকা জাতীয়তাবাদ প্রতিরোধ করতে হবে। এ ধরনের জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সংকটের সমাপ্তি তো ঘটাবেই না; বরং দীর্ঘায়িত করতে পারে। এই মানসিকতা এমন পরিস্থিতি ডেকে আনবে, যা মার্চের শুরুর দিকে লকডাউনের সূচনাকালে দেখা গিয়েছিল। ওই সময় হঠাৎ করেই মাস্ক, গাউন ও স্যানিটাইজারের মতো ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) নিয়ে কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছিল। টিকা জাতীয়তাবাদের কারণে তেমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, যাতে টিকা, ওষুধ ও পরীক্ষার উপাদান সহজলভ্য হলেও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাওয়া যাবে না এবং পরিস্থিতির অবনতি ঘটাবে।

নিঃসন্দেহে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন হবে মূল্যবান এক সম্পদ। কিন্তু আমরা যদি এর স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা করতে না পারি, তাহলে অকারণেই মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা ঘটবে। এর ফলে একদিকে অপ্রয়োজনীয় টিকা মজুদের ঘটনা ঘটবে এবং অন্যত্র প্রাণঘাতী সংকট তৈরি হবে। সুতরাং টিকার বিষয়টি কারো একার স্বার্থের বিষয় নয়। সব সরকারেরই নিজেদের জনগণকে রক্ষার দায়িত্ব রয়েছে। তাই অনেক দেশ যখন দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগে পড়বে এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি ধীর হবে, তখন এই টিকা জাতীয়তাবাদ নিন্দার কারণ হবে।

প্রকৃতপক্ষে ধনী দেশগুলো এই বৈশ্বিক সংকট উত্তরণ থেকেও উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হতে চায়। অথচ গবেষণা, উন্নয়ন ও উৎপাদন এবং অপরিহার্য উপাদান ও ওষুধ সরবরাহ চেইন কোনো একটি দেশের হাতে নেই। সুখবর হচ্ছে, ১৭০টি দেশ টিকা জাতীয়তাবাদের মিথ্যা প্রলোভন ঠেকিয়ে দিয়েছে এবং বৈশ্বিক টিকাপ্রাপ্তির জোট কোভ্যাক্সের অধীনে একত্র হয়েছে। অন্য উদ্যোক্তারাও ঠিক পক্ষেই আছে। তারাও বিশ্বকে একাধিক ও কার্যকর টিকার সর্বোত্তম সুযোগ এনে দেবে। এখন এই অনেক টিকার উন্নয়ন ও বিতরণ কার্যক্রমে সমন্বয় সাধনের একটি বৈপ্লবিক উপায় হচ্ছে কোভ্যাক্স জোট। এটাই টিকা উৎপাদনের গতিকে বাড়িয়ে দিতে পারে।

সুতরাং টিকা বাজারে আনার প্রথম পর্যায়ে অংশগ্রহণকারী সব দেশে জনসংখ্যা অনুপাতে বিতরণ করতে হবে, যাতে সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা এবং মারাত্মক রোগে ভোগা ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়া যায়। তাদের মধ্যে থাকবে সামনের সারিতে থাকা স্বাস্থ্য ও সেবা খাতের লোকজন, বয়স্ক মানুষ এবং হৃদরোগ, ডায়াবেটিক রোগীসহ যেসব মানুষের মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি।

দ্বিতীয় ধাপে, কয়েক মাস পর আরো কয়েক গুণ ডোজ উৎপাদনে যেতে হবে। তখন সংক্রমণের কম ঝুঁকিতে থাকা এবং মারাত্মকভাবে আক্রান্ত ব্যক্তিদের টিকাটি দিতে হবে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য হবে ২০২১ সাল নাগাদ অন্তত ২০০ কোটি ডোজ টিকা সরবরাহ করা। যদিও তা প্রত্যেকের জন্য যথেষ্ট নয়, তবে এটা সংকটের তীব্র মাত্রা দূর করার জন্য যথেষ্ট হতে পারে এবং বিশ্বকে পরিত্রাণের পথে নিয়ে যেতে পারে।

বিশ্বের বড় অংশ এরই মধ্যে কোভ্যাক্সের সঙ্গে যুক্ত। কিছু দেশ যোগদান করবে কি না এখনো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং কয়েকটি দেশ তো একা থেকে যাওয়ার কথাই ভাবছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যত বেশি দেশ এতে জড়িত হবে, তত বেশি যৌক্তিক বিতরণ সম্ভব হবে এবং মহামারি দূর করার কাজ তত বেশি কার্যকর হবে। এখন পুরো পৃথিবী সেই প্রত্যাশার দিকে তাকিয়ে আছে যে সিদ্ধান্তহীন দেশগুলো ১৮ সেপ্টেম্বর ডেডলাইনের মধ্যেই কোভ্যাক্সে যোগ দেবে কি না।

এ মুহূর্তে বিশ্বকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ আপাতত সংকট অবসানের একটা সম্ভাবনা দেখা গেলেও সমাপ্তি রেখা স্পর্শ করতে অনেক সময় লাগবে। আমরা এখনো বিপদের মাঝামাঝিতেই আছি।

মহামারির অবসান এবং আমাদের অর্থনীতি পুনরায় শুরুর বিষয়টি আমাদের সম্মিলিত হাতে ন্যস্ত রয়েছে। আগামী দিনগুলোতে দেশগুলো টিকা ভাগাভাগি, নাকি অতিরিক্ত সরবরাহ ধরে রাখবে—সে সিদ্ধান্ত শুধুই বিশ্বের সংকট কাটিয়ে ওঠাকে নির্ধারণ করবে না, একই সঙ্গে নতুন দশকের সময়টিকে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মানদণ্ড নতুন করে নির্ধারণ করবে।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

লেখক : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা