kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

ইতিহাসের স্মরণীয় অ্যাথলেট সুলতানা কামাল

ইকরামউজ্জমান

১৩ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইতিহাসের স্মরণীয় অ্যাথলেট সুলতানা কামাল

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রায় ৫০ বছরের ইতিহাসে অ্যাথলেটিকস চত্বরে অল্প সময়ে সুলতানা আহমদ যে অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছেন, অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত, প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন এবং ক্রীড়াবিদদের মধ্যে ব্যতিক্রমী হতে পেরেছেন—এর আর নজির নেই ক্রীড়াঙ্গনে। এই সুলতানা আহমদই ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন।

স্বাধীন দেশে মাত্র তিনটি জাতীয় অ্যাথলেটিকস (১৯৭৩-১৯৭৫) প্রতিযোগিতা এবং দেশের বাইরে (প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ থেকে ক্রীড়াবিদ দল অংশগ্রহণ করে) ১৯৭৩ সালে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত গ্রামীণ ক্রীড়ায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ‘অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকে’ তাঁর জ্বলজ্বলে নৈপুণ্য চিরস্মরণীয়। তিনটি জাতীয় অ্যাথলেটিকস থেকে জিতেছেন ছয়টি স্বর্ণ ও তিনটি রৌপ্য। নিজের সৃষ্টি রেকর্ড নিজেই ভেঙেছেন। আর ভারতের গ্রামীণ ক্রীড়ায় নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করে লং জাম্পে রুপা জিতেছেন। এ ছাড়া এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের আরেক অ্যাথলেট শামীম আরা টনিও ১০০ মিটার স্প্রিন্টে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের বিদেশ থেকে এটাই প্রথম পদক জয়ের অভিজ্ঞতা। দেশের বাইরে থেকে প্রথম পদক জেতা শুরু করেছেন মহিলা অ্যাথলেটরা।

১৯৭৩ সালে ঢাকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় অ্যাথলেটিকসে সুলতানা আহমদ অংশ নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলের হয়ে। প্রথম ‘মিটে’ তিনটি স্বর্ণ এবং একটি রৌপ্য জিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। পেয়েছেন ‘সোনালি মেয়ে’ খেতাব ও ব্যাপক পরিচিতি। পারফরম্যান্সের বিচারে পুরুষ ও মহিলা ক্রীড়াবিদদের মধ্যে সেরা সাফল্য। অসাধারণ এই সাফল্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গৌরবান্বিত হয়েছে। স্বাধীনতার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়াঙ্গনের গৌরবময় অতীত ছিল—সেই মশাল স্বাধীন দেশে প্রথম প্রজ্বালন করেছেন সুলতানা আহমদ। বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিনিধিত্ব করে যে রেকর্ড প্রথম জাতীয় মিটে সৃষ্টি করেছেন, সেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে কোনো পুরুষ ও মহিলা ক্রীড়াবিদের এখন পর্যন্ত ভাঙা সম্ভব হয়নি।

সুলতানা আহমদ ক্রীড়াঙ্গনে জানান দিয়েছেন, সুযোগ থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে জাতীয় গেমসে অংশগ্রহণের চেয়ে গৌরবের আর কিছু হতে পারে না। বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি (বর্তমানে বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন) সুলতানা আহমদকে তাঁর অবিস্মরণীয় ও অনুকরণীয় পারফরম্যান্সের জন্য অ্যাথলেটিকসে বছরের সেরা (১৯৭৩) হিসেবে মনোনীত করে সম্মানিত করেছে। অ্যাথলেট সুলতানা আহমদ ছিলেন নিজেই নিজের তুলনা!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা ‘ব্লু’ সুলতানা আহমদ। এটা তাঁর অর্জন। এটা তাঁর প্রাপ্য। মেধা ও প্রতিভার পাশাপাশি সুলতানার ছিল আত্মবিশ্বাস, নিজের ওপর আস্থা এবং মনের দৃঢ়তা। তিনি তাঁর সামর্থ্যকে পরিশ্রম, অনুশীলন ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে কাজে লাগাতে পেরেছেন বলেই ক্রমে এগিয়ে গেছেন। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে তিনি আরো অনেক কিছু দিতে পারতেন, পারতেন কার্যকর ভূমিকা এবং অবদান রাখতে, যদি তিনি বেঁচে থাকতেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতা, স্বামী, শাশুড়ি এবং ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে অবস্থানরত পরিবারের সব সদস্যের সঙ্গে সুলতানা কামাল ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন, যা বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী দবির উদ্দিন আহমদ সাহেবের ছোট মেয়ে সুলতানা। বাড়ি, আত্মীয়-স্বজন এবং বান্ধবীদের কাছে বড় প্রিয় নাম ‘খুকী’। ষাট দশকের প্রথম থেকেই মাঠের সঙ্গে সম্পর্কের শুরু। সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও মুসলিম গার্লস স্কুলের ছাত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য মনঃসংযোগের মাধ্যমে নিরলস চেষ্টা। সুলতানার সুবিধা ছিল বাড়ির উদার পরিবেশ। বাড়ির সব সদস্য ছিলেন ক্রীড়ানুরাগী ও সংস্কৃতিমনা। এতে  ক্রীড়াচর্চার ক্ষেত্রে বাড়ি থেকে সব সময় সমর্থন এবং উৎসাহ পেয়েছেন। স্কুল ও আন্ত স্কুলের প্রতিযোগিতায় সেরা হিসেবে চিহ্নিত হতে সময় লাগেনি। ১৯৬৫ সালে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে প্রথম অংশগ্রহণ করেন তৎকালীন প্রাদেশিক অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায়। প্রথম থেকেই প্রিয় ইভেন্ট লং জাম্প এবং হাই জাম্প। এ ছাড়া ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়াতেন। ১৯৬৬ সালে প্রাদেশিক অ্যাথলেটিকসে লং জাম্পে প্রথম রৌপ্য পদক লাভ করেন। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬৭ সালে লং এবং হাই জাম্পে রৌপ্য পদক। এর পর থেকে এগিয়েই গেছেন। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবকে উপহার দিয়েছেন সুনাম।

১৯৬৮ সালের এপ্রিলে ঢাকায় শেষবারের মতো পাকিস্তান অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হয়। এই পাকিস্তান গেমস ভাস্বর হয়ে আছে চারজন বাঙালি মহিলা অ্যাথলেটের চোখ ধাঁধানো নৈপুণ্যে। তাঁরা হলেন রওশন আরা ছবি (৮০ মি. হার্ডলস), ইশরত আরা (হাই জাম্প), সুলতানা আহমদ (লং জাম্প) ও সুফিয়া খাতুন (১০০ মি. স্প্রিন্ট) স্বর্ণপদক। সুফিয়া পাকিস্তানের ‘দ্রুততম’ মহিলা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ছবি, ইশরত ও সুলতানা তখন কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী। সুলতানা পড়তেন ইডেন গার্লস কলেজে। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম মহিলা জাতীয় অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে অংশ নিয়ে সুলতানা আহমদ একটি স্বর্ণ ও একটি রৌপ্য পদক জিতেছেন। পাকিস্তানের দিনগুলোতে জাতীয় গেমস এবং মিটে বাঙালি মেয়েরা অ্যাথলেটিকস চত্বর থেকে পদক জিতেছেন সেই মধ্য পঞ্চাশ দশকের দিনগুলো থেকে। যেটি পুরুষদের পক্ষে সম্ভব হয়নি!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে অনার্সসহ মাস্টার্স করেছেন সুলতানা কামাল। ১৯৭৪ সালে বার্লিন যুব উৎসবে ক্রীড়াবিদ হিসেবে অংশ নিয়েছেন। মরণোত্তর জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৯৭ সালে। এই পুরস্কার অবশ্য তাঁর অনেক আগেই প্রাপ্য ছিল। বিব্রতকর বিষয়টি নিয়ে আজ আর লিখছি না।

বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থা ঢাকার ধানমণ্ডি মহিলা স্পোর্টস কমপ্লেক্সকে সুলতানা কামাল ক্রীড়া কমপ্লেক্স হিসেবে নামকরণ করেছে। এটি একজন অনুকরণীয় মহিলা ক্রীড়াবিদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন। সুলতানা কামাল নামটি যে ভোলার নয়।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা