kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৬ সফর ১৪৪২

বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় দেশপ্রেমিক যুবসমাজ

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক

১২ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় দেশপ্রেমিক যুবসমাজ

আজ বিশ্ব যুব দিবস। ১৯৯৮ সালে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স অব মিনিস্টার রেসপনসিবল ফর ইয়ুথ’-এ যুবসমাজের উন্নয়নের লক্ষ্যে ১২ আগস্ট আন্তর্জাতিক যুব দিবস হিসেবে উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ দিবসটিকে বিশ্ব যুব দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশের জাতীয় যুবনীতিতে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের ‘যুব’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। জাতীয় যুব কাউন্সিল গঠন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উন্নত নৈতিক মূল্যবোধের আলোকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুবদের মানবসম্পদে পরিণত করা, সব জায়গায় যুব নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জাতীয় যুবনীতিতে উল্লেখ রয়েছে।

স্বাধীনতার আগেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার যুবসমাজের মুক্তির কথা চিন্তা করেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় অধ্যায়ও যুব বয়সের। বাংলার ভাষাসংগ্রামীরা ছিলেন ছাত্র, যুবক, তরুণ। বাংলা ভাষার ওপর আঘাতে ১৯৪৮ সালে প্রতিবাদী মুজিবও ছিলেন যুবক। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বাংলা ভাষার বিলয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে শিক্ষাব্যবস্থা। বোবাপুরীতে পরিণত হবে সমগ্র বাংলা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত দেশপ্রেমী যুবরাই বাংলার সংশয়-সংকটে ছিনিয়ে এনেছে উজ্জ্বল আলোর দিশা। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশ ছিল তরুণ-যুবসমাজ। ১৯৫৩ সালে ৩৩ বছরের টগবগে বাঙালি যুবক শেখ মুজিবুর রহমানই হয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘...এবং দেশের প্রায় শতকরা সত্তরটা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম হলাম। যুবক কর্মীরা আমার দিকে ঝুঁকে পড়ল। কারণ আমিও তখন যুবক ছিলাম।’

বঙ্গবন্ধুর সব ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলা, বাঙালি, বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি। তাঁর যুবসমাজ ভাবনার গভীরেও রয়েছে বাঙালির সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক মুক্তি ও বিশ্বরাষ্ট্রে বাঙালির মাথা উঁচু করে নেতৃত্ব দেওয়ার দর্শন। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘আজকের যুবকরাই আগামীকাল দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করিবে। একটি দেশের সমস্যা ও সম্ভাবনা দুটিই দেশের যুবসমাজের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। কোনো দেশের যুবসমাজ যদি কর্মঠ হয় এবং তারা কাজের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ পায়, তাহলে ওই দেশের উন্নতি কেউ আটকাইতে পারে না। যুবসমাজের দীপ্ত মেধা এবং সতেজ জ্ঞানের গতি এই সবুজ-শ্যামল বাংলাকে প্রকৃত সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করিতে পারে। তাই এ ব্যাপারে তাহাদের প্রস্তুত হইতে হইবে। তাহাদের মত ও পথ ঠিক করা এবং কথা ও কাজে সংগতি থাকিতে হইবে। ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকিলে যুবসমাজ সফল হইবে।’ ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে দেশবাসীর উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা গড়িয়া তোলার জন্য শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগের চাইতে উত্কৃষ্ট বিনিয়োগ আর কিছু হইতে পারে না।...দারিদ্র্য যাতে উচ্চশিক্ষার জন্য মেধাবী ছাত্রদের অভিশাপ হয়ে না দাঁড়ায় সেই দিকে দৃষ্টি রাখিতে হইবে।’ ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশেই শিক্ষার কথা বলা হয়েছিল। সদ্য যুদ্ধজয়ী রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে বঙ্গবন্ধু প্রতিরক্ষা খাতের চেয়ে শিক্ষা খাতে বেশি বরাদ্দ রেখেছিলেন। আগামী প্রজন্মের যুবসমাজকে গড়ে তুলতে তিনি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

বাংলার যুবসমাজ যেন নিজেকে দক্ষ করতে পারে, কর্মমুখী হতে পারে, দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে, বঙ্গবন্ধু মনে-প্রাণে সে কামনা করতেন। যুবসমাজের উদ্দেশে তিনি বিভিন্ন উপদেশ, নির্দেশনামূলক বক্তৃতা-বিবৃতিও দিতেন। ১৯৭৩ সালের ১৯ আগস্ট যুবক ও ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘বাবারা একটু লেখাপড়া শিখ। যতই জিন্দাবাদ আর মুর্দাবাদ করো, ঠিকমতো লেখাপড়া না শিখলে কোনো লাভ নেই। আর লেখাপড়া শিখে যে সময়টুকু পাবে বাপ-মাকে সাহায্য করো। প্যান্ট পরা শিখছ বলে বাবার সাথে হাল ধরতে লজ্জা করো না। ...গ্রামে গ্রামে বাড়ির পাশে বেগুনগাছ লাগিও, কয়টা মরিচগাছ লাগিও, কয়টা লাউগাছ ও কয়টা নারিকেলের চারা লাগিও। বাপ-মাকে একটু সাহায্য করো। শুধু বিএ-এমএ পাস করে লাভ নেই।...বুনিয়াদি শিক্ষা নিলে কাজ করে খেয়ে বাঁচতে পারবে।’

যুবসমাজ নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিন্তা-দর্শনের মূল উৎসও বঙ্গবন্ধু। ১৬ জানুয়ারি ২০১২ সালে জাতীয় যুব দিবসের ভাষণে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, “সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলতেন, সোনার বাংলা গড়তে হলে ‘সোনার মানুষ চাই’। এই সোনার মানুষই হলো যুবসমাজ। দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ যুবক ও যুব মহিলা। এই বিশাল যুবসমাজের শক্তি, উদ্যম, সাহস আর কর্মস্পৃহা আমাদের দেশকে আরো উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। আমরা এবার সরকার গঠনের পর যুবকদের শ্রম ও মেধার যথাযথ ব্যবহারের দিকে নজর দিয়েছি।” তিনি আরো বলেছেন, ‘স্মরণ রাখবে তোমাদের কেউ যেন বিপথে ঠেলে দিতে না পারে, দলীয় স্বার্থে ও ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে।’ যুবসমাজকে গড়ে তুলতে শেখ হাসিনার বিভিন্ন উদ্যোগের সুফলও আজ দৃষ্টিগ্রাহ্য। সাম্প্রতিক সময়ে করোনা ও বন্যা দুর্যোগেও কৃষিব্যবস্থা বা খাদ্যসংকট তেমনভাবে দেখা দেয়নি। দেশের মানুষও মনে করে, শেখ হাসিনা সৎ, যোগ্য শাসক, দেশিকোত্তম ব্যক্তি। তাঁর সংস্পর্শে এসে অনেক আমলা, রাজনীতিবিদ, নেতাকর্মী সততার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। শেখ হাসিনার দুর্নীতিবিরোধী কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগও প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু প্রশাসন, সরকার ও দলকে ম্যানেজ রাখতে কিছুসংখ্যক স্তুতিকারক পেশাজীবী, রাজনীতিবিদ, যুবক-যুবতির কৃত্রিম চেতনা ও ‘মিমিক্রি পারফর্মিং’-এর খবর অনেক সময় মিডিয়ায় ভাইরাল হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও সরকার সম্পর্কে তাদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডও প্রকাশিত হচ্ছে।

যুবকদের গুরুত্ব সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘দেশে দুর্নীতি প্রতিরোধ করার দায়িত্ব শুধু মন্ত্রী বা সদস্যদের নহে। এ ব্যাপারে যুবসমাজকে দায়িত্ব পালন করিতে হইবে। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যুবকদের উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে ১৯৭৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারিতে তিনি বলেছিলেন, ‘ওয়াদা কর দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করবি।...আমি যেখানে আছি, সেখানে কেন তোরা উহা বন্ধ করিতে পারবি না।...চোখের আড়াল হলেই তোরা লটর-পটর করিস। কিন্তু তোরা লটর-পটর না করিলে আর কেহ লটর-পটর করিতে পারিবে না।’ তাই আবার বলিতেছি, ‘আমার বাণী যেন নীরবে-নিভৃতে না কাঁদে।’ অতএব, বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেমিক যুবসমাজ হতে হলে যোগ্যতা, দক্ষতার পাশাপাশি নীতি-নৈতিকতা, দায়িত্ব-কর্তব্যবোধে দেশের প্রতি ভালোবাসা থাকতে হবে। তাহলেই সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলার পথ মসৃণ হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার শাসনামলে মুজিবপ্রেমী জনগণের কামনাও তাই।

লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা