kalerkantho

মঙ্গলবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৭ । ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৪ সফর ১৪৪২

পরিবর্তনের জন্য সংঘবদ্ধ কাজের দরকার হবে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

১১ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পরিবর্তনের জন্য সংঘবদ্ধ কাজের দরকার হবে

সবাই নিশ্চিত যে করোনা একসময়ে পরাজিত হবে, তবে সবাই এটাও নিশ্চিত যে করোনা-পরবর্তী সময়ে পৃথিবীটা আর আগের মতো থাকবে না। যাঁরা আশাবাদকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চান তাঁরা ভাবছেন ভালোর দিকেই যাবে। আমরাও আশাবাদী, তবে এটা ভেবে নয় যে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে হঠাৎ করেই মস্ত একটা পরিবর্তন এসে যাবে। পরিবর্তনের জন্য সংঘবদ্ধ কাজের দরকার হবে। আমরা আশাবাদী এটা ভেবে যে বিদ্যমান অমানবিক ব্যবস্থাকে বদলানোর জন্য মানুষ সংঘবদ্ধভাবে উদ্যোগ নেবে। জোট বাঁধবে।

এ প্রসঙ্গে আবার আসব; আপাতত খারাপ দিকটার কথাই ভাবা যাক। লক্ষণ তো এর মধ্যেই দেখা যাচ্ছে যে আগামী দিনে পুঁজিবাদের তাণ্ডব আরো বৃদ্ধি পাবে। ধনবৈষম্য অধিকতর প্রকট হবে। বেকারত্ব, ক্ষুধা, দারিদ্র্য—সব কিছুই বাড়বে। বহু মানুষ অভুক্ত থাকবে, অনেক মানুষ প্রাণ হারাবে। যুদ্ধ বলি আর প্রাকৃতিক দুর্যোগই বলি, সব ক্ষেত্রেই পুরুষদের তুলনায় মেয়েদের দুর্দশাটাই ঘটে অধিক; যতই আধুনিক ও ভদ্রবেশী হোক, পুঁজিবাদও সামন্তবাদের মতোই অসংশোধনীয় রূপে পিতৃতান্ত্রিক। মেয়েদের ওপর নির্যাতন তো বিদ্যমান রয়েছেই, আগামী দিনে নির্যাতনের পরিমাণ ও রূপ দুটিই দুঃসহ হয়ে উঠবে। পত্রিকায় দেখলাম, একজন গবেষক লিখেছেন যে করোনার ভেতর দিয়ে মেয়েরা দুই কদম এগিয়ে দশ কদম পিছিয়ে গেল। এ রকমের গবেষণা যদি ভ্রান্ত পরিণত হয়, তাহলে সেটা হবে আশার কথা। কিন্তু আশা করতে তো ভরসা হয় না। বড় রকমের নিগ্রহ ঘটবে শিশুদেরও। সেভ দ্য চিলড্রেন সংস্থাটি যথার্থই ধারণা করেছে যে এক কোটি শিশু আর বিদ্যালয়ে ফেরত আসবে না এবং অবশ্যই তাদের দেহে পুষ্টির অভাব ঘটবে।

করোনাভাইরাস ইতরবিশেষ করেনি, যাকে পেয়েছে তাকেই ধরেছে। অসুস্থ ও বয়স্কদের দ্রুত সরিয়ে নিয়েছে বাঁচার অধিকার থেকে। যাঁরা ধনী তাঁরাও প্রাণ হারিয়েছেন; তবু সেবা-শুশ্রূষা তাঁরা কিছুটা হলেও পেয়েছেন, গরিবের কপালে তা-ও জোটেনি। গরিব দেশগুলোর ওই একই অবস্থা। ধনী দেশ উঠে দাঁড়াতে পারবে, গরিব দেশগুলো তো আছেই ওপরে ওঠার ব্যাপারে ধনী দেশকে কাঁধ এগিয়ে দেওয়ার জন্য। সেই সঙ্গে তাদের নিজস্ব দুর্দশা যে অনেক অনেক বাড়বে সেটা একেবারেই সুনিশ্চিত। অক্সফোর্ডের গবেষকরা বলেছেন, সুবিধাভোগীদের তুলনায় সুবিধাবঞ্চিতদের বেলায় করোনার ঝুঁকি চার গুণ বেশি। মোটেই বাড়িয়ে বলেননি। করোনা-পরবর্তী সময়েও সুবিধাবঞ্চিতদের বঞ্চনা কমার কোনো কারণ নেই। বঞ্চনা বাড়বেই। কতটা বাড়বে সেটা নিয়েই যা প্রশ্ন।

চীনের জাতীয়তাবাদী পুনরুত্থানের কথা বলছিলাম, অন্যরাও জাতীয়তাবাদী হতে পিছপা হবে না। জার্মানির কিছুটা কম রক্ষণশীল চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে মন্তব্য করেছেন যে করোনা একটি বিশ্ব সমস্যা। তাই তার প্রতিরোধটা জাতীয়ভাবে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেই হওয়া দরকার; কিন্তু সেটা হয়নি। এমনকি অত্যন্ত জরুরি যে কাজ—টিকা উদ্ভাবন করা, সে কাজ এক দেশ আরেক দেশের সঙ্গে মিলেমিশে করেনি। করছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এমনিতেই পঙ্গু সংস্থা, এবার সে আরো পঙ্গু হবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লীগ অব নেশনস গঠিত হয়েছিল; কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থামাতে পারেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এলো জাতিসংঘ; কিন্তু জাতিসংঘ কার্যকর হয়নি। করোনার পর যে নতুন কোনো কার্যকর বিশ্ব সংস্থার স্থাপনা ঘটবে এমন আশা উদারনীতিকরা করতে পারেন; কিন্তু তাঁরা অবশ্যই হতাশ হবেন। উগ্রভাবে যা ঘটবে তা হলো জাতীয়তাবাদের কার্যকলাপ বৃদ্ধি। দুনিয়াটা ছত্রভঙ্গ নয়, ছিন্নভিন্নই হয়ে যাবে। বড়রা গিলে খাবে ছোটদের। আভাস তো পাওয়াই যাচ্ছে। ইসরায়েল যে গ্রাস করে ফেলতে চাচ্ছে ফিলিস্তিনিদের মাতৃভূমি, সেই লোলুপতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে এমন শক্তি কোথাও দেখা যাচ্ছে না, উল্টো তাকে উৎসাহিত করার মতো রাষ্ট্রশক্তি অনেক পাওয়া যাচ্ছে। এদের মধ্যে ভারতও আছে এবং থাকবেও। উগ্র হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ তাদের অস্ত্র। এই অস্ত্র প্রয়োগ করে আগামী দিনে দেশের অভ্যন্তরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন চালানোকে বীরত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে জাহির করতে তৎপর থাকবে।

২.

পুঁজিবাদ ধর্ম চেনে না, লাভ-লোকসান চেনে। পুঁজিবাদী করোনাভাইরাস তার জন্মদাতা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মতোই পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ। রোগেশোকে পীড়িত মানুষের যে পুরনো অভ্যাস ধর্মের কাছে আশ্রয় খোঁজা ও নিরাময় প্রার্থনা করা, করোনা সে কাজকে নাকচ করে দিয়েছে। এমনকি উপাসনালয়গুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার নির্দেশ জারি করেছে; সেখানে যতটুকু সামাজিকতা সম্ভব তা-ও তার অসহ্য। কিন্তু শাসকরা যে ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে থাকবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মানুষের অভাব ও ক্ষোভ যখন বাড়বে তখন ধর্মীয় উন্মাদনা বৃদ্ধি করে তাদের বিভক্ত, বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করার চেষ্টা যে কমবে না, বরং বাড়বেই—এটা হিসাবের মধ্যে রাখাই ভালো। বঞ্চিত মানুষকে দাবিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় বাহিনী, রাষ্ট্রের বিচারালয় ও আইন-কানুন, রাষ্ট্রানুগত গণমাধ্যমের প্রচারণা—এ সব কিছুর সঙ্গে ধর্মও ব্যবহৃত হবে। ব্যবহার থাকবে বর্ণ ও লিঙ্গগত ব্যবধানের।

নেপালেও দেখা যাচ্ছে জাতীয়তাবাদ বেশ শক্ত রকমেরই নাড়াচাড়া দিচ্ছে। এত দিন সেখানে ভারতের ছিল অপ্রতিহত একাধিপত্য। ভারতীয় মুদ্রা পেলে দোকানিরা খুশি হতো। নেপাল একে ভারতের নিকট-প্রতিবেশী, তায় নেপালের বেশির ভাগ মানুষই হিন্দু ধর্মাবলম্বী, তাই দুই দেশের মৈত্রী ছিল সুপ্রতিশ্রুত। কিন্তু এখন নেপালের সরকার বলছে, সীমান্তে তাদের যে জমি ভারতের আপাত কর্তৃত্বে রয়েছে, সেটা তারা নিয়ে নেবে। এই মর্মে তারা নিজেদের জাতীয় মানচিত্রও সংশোধন করে ফেলেছে। ধর্মের ভাই বলে ডাকাডাকিতে কাজ হবে বলে মনে হয় না। সীমান্ত বিরোধ অনিবার্য, বিশেষ করে প্রতিবেশী চীন যেহেতু বলবে এগিয়ে যাও, আমরা আছি তোমার সঙ্গে। নেপাল ভাবছে হিন্দু ভারতের তুলনায় অহিন্দু চীনই ভালো, পাশে এসে দাঁড়ায়। আর অভিনব যে ঘটনা তা হলো নিজের পেছনের জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগের স্রোতটাকে আরো শক্তিশালী করে তোলার জন্যই হবে নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দাবি করে বসেছেন যে অযোধ্যার রাম ভারতীয় ছিলেন না, ছিলেন নেপালি এক রাজকুমার। শুধু তা-ই নয়, অযোধ্যা নাকি নেপালেরই একটি গ্রামের নাম। খেলা বেশ জমবে মনে হয়। তবে এতে বাবরি মসজিদকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে যে রামভক্তরা রামমন্দির খাড়া করার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছে, তারা বিন্দুমাত্র নিরুৎসাহ হবে এমনটা মনে করার কারণ নেই। ধরেই নেওয়া যায় যে তারা আরো জঙ্গি হয়ে উঠবে। ওদিকে রামভক্তদের দ্বারা অনুপ্রাণিত না হলেও সমান্তরালে তৎপর হয়েছে তুরস্কের মুসলিম জাতীয়তাবাদী সরকার। সেখানে মন্দির নেই, তবে গির্জা তো আছে। অতিপ্রাচীন একটি গির্জার ওপর তারা মসজিদ পুনঃস্থাপনের আদালতি অনুমোদন পেয়ে গেছে। এখন আর রোখে কে! ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে উদ্দীপ্ত কামাল আতাতুর্ক একটি সমঝোতার ব্যবস্থা করেছিলেন। যে গির্জাকে মুসলমান শাসকরা মসজিদ বানিয়েছিলেন, কামাল আতাতুর্ক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন গির্জাও নয়, মসজিদও নয়, সেটি হবে স্বদেশি প্রাচীন সভ্যতার একটি জাদুঘর; উপাসনার বদলে লোকে সুযোগ পাবে ইতিহাসের নিদর্শন পর্যবেক্ষণের। কিন্তু জাতীয়তাবাদের নব-উত্থানের মুখে কামালের ধর্মনিরপেক্ষতা পিছু হটেছে; আগামী দিনে তুরস্ক এই ‘নবজাগরণে’র পথ ধরে আরো এগোবে—এই আশঙ্কা মিথ্যা হলে আমরা যারা খুশি হতাম তারা হয়তো হতাশই হব। করোনার ধরন-ধারণ দেখে মনে হচ্ছিল যে জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে ধর্মাচরণকে সে অপ্রাসঙ্গিক করে দেবে, ধর্মীয় অনেক কাহিনিকেই রূপকথায় পরিণত করে ছাড়বে; কিন্তু সে ক্ষমতা করোনার থাকবে না। কারণ তার পেছনে রয়েছে যে পুঁজিবাদীরা, তারা ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ফলপ্রসূ অভ্যাস পরিত্যাগ করার পরিবর্তে বরং আরো কঠিন হাতে ধর্মকে আঁকড়ে ধরবে। বিনা মূল্যে এমন অস্ত্র আর কোথায় পাবে? বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মের যতই বিরোধ থাক না কেন, পুঁজিওয়ালাদের জন্য দুটিই সমানভাবে ব্যবহার্য।

 

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা