kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

শুভ জন্মদিন

আমার বন্ধু শেখ কামাল

সাইদুর রহমান প্যাটেল

৫ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমার বন্ধু শেখ কামাল

‘কেনরে বিধাতা পাষাণ হেন, চারদিকে তার বাঁধন কেন? ভাঙরে হূদয়, ভাঙরে বাঁধন, সাধরে আজিকে প্রাণের সাধন।’ কবিগুরুর কবিতার মতোই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। শেখ কামাল, হে প্রিয় বন্ধু আমার, শুভ জন্মদিন তোমায়।

শেখ কামালের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৩২ নম্বর বাড়িতে। ১৯৬৬ সালে আমি তখন গেণ্ডারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র এবং স্কুল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি। স্কুল পর্যায়ে ছাত্রলীগের কমিটির কথা শুনে অনেকেই হয়তো অবাক হবেন। কিন্তু তখনকার বাস্তবতায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্কুলের ছাত্ররাও পাকিস্তানি শাসকদের নির্যাতনের কারণে রাজনীতির ময়দানে নামতে বাধ্য হয়েছিল। সম্ভবত, স্কুল পর্যায়ে ছাত্রলীগের প্রথম কমিটি গঠিত হয়েছিল গেণ্ডারিয়া স্কুলেই। ওই কমিটি গঠিত হয়েছিল জগন্নাথ কলেজের তৎকালীন ভিপি রাজু ভাই, ছাত্রলীগ নেতা আলী রোজ ভাই, সাইফুদ্দীন ভাই প্রমুখের উদ্যোগে। সে সময় আমি, শিরু, নজরুলসহ কয়েকজন নিয়মিত জগন্নাথ কলেজের ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতাম। তাঁদের নির্দেশমতো এলাকায় রাজনৈতিক কর্মসূচি চালাতাম।

১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আমরা অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির ছাত্রদের নিয়ে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে মিছিল বের করি। পোস্তগোলার হাবিব ম্যাচ ফ্যাক্টরি পর্যন্ত রাস্তার দুই ধারে যত ইংরেজি সাইনবোর্ড ছিল সব নামিয়ে ফেলি। প্রতিটি গাড়ির ইংরেজি নামফলক কালো রং দিয়ে মুছে দিই। ফেরার পথে আরসিন কম্পানির গেটের সামনে সূত্রাপুর থানার ওসির নেতৃত্বে পুলিশ আমাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং ওসি আমাকে মারধর করেন। আমি রক্তাক্ত শরীর নিয়ে জগন্নাথ কলেজে যাই। রাজু ভাইরা সব শুনে সূত্রাপুর থানার ওসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা করেন। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় ‘গেণ্ডারিয়া স্কুলের ছাত্রদের ওপর সূত্রাপুর থানার ওসির আক্রমণ’ শিরোনামে তা ফলাও করে ছাপা হয়।

আমাদের এই রাজনৈতিক তৎপরতা বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেই থেকে তিনি নিয়মিত আমাদের রাজনৈতিক কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ এবং খোঁজখবর রাখতেন। এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুবাদে ওই বছরই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার সাক্ষাত্ হয়। প্রথম সাক্ষাতেই বঙ্গবন্ধু আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘ও আমার সরদার বল্লভভাই প্যাটেল।’

ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে যাতায়াতের সূত্র ধরেই বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। পর্যায়ক্রমে আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক গভীর হতে থাকে। আমরা দুজনই সমবয়সী বিধায় ক্রমান্বয়ে সেই যোগাযোগ আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে বন্ধুতে রূপ নেয়। আমি যতই তাঁর কাছে যাই, তাঁর আচার-আচরণে মুগ্ধ হই। বঙ্গবন্ধুর সন্তান ছাড়াও যদি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তাহলেও বলতে হবে, ব্যক্তি কামালের মতো সত্, যোগ্য ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ তৎকালীন সময়ে খুব দুর্লভ ছিল।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন শেখ কামাল। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের যুদ্ধকালীন সেনাপ্রধান এম এ জি ওসমানীর এডিসি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে আমি একক উদ্যোগে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠন করি। আমাদের দ্বিতীয় খেলা ছিল মোহনবাগানের সঙ্গে। সেই সময় মাঠে উপস্থিত ছিলেন শেখ কামাল।

শেখ কামাল যুদ্ধ-পরবর্তী দেশের উন্নয়নে সাংগঠনিক কাজে আমৃত্যু দক্ষতার পরিচয় দিয়ে গেছেন। ক্রীড়াক্ষেত্রে শেখ কামালের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি একজন ভালো ফুটবলার ও জনপ্রিয় বাস্কেটবল খেলোয়াড়ই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বিদগ্ধ ক্রীড়া সংগঠকও। তাঁর নেতৃত্বে এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। আবাহনী ক্লাব প্রতিষ্ঠার পেছনে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। ফুটবলে আধুনিক ধারা প্রবর্তনে তিনি আয়ারল্যান্ড থেকে প্রথিতযশা কোচ মি. হার্টকে নিয়ে আসেন। তাঁর কোচিংয়ে দেশের ফুটবল এগিয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধু যেমন একজন দেশপ্রেমিক ও ক্রীড়ানুরাগী ছিলেন, শেখ কামালও বাবার সেই গুণকে ধারণ করতেন মনেপ্রাণে। খেলার বাইরে তিনি খুব ভালো অভিনয় করতেন। নাটকের প্রতি খুব অনুরাগী ছিলেন। তিনি স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনও গড়ে তুলেছিলেন। ছাত্র হিসেবেও ছিলেন বেশ তুখোড়। লেখাপড়া করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অত্যন্ত সাদাসিধা জীবন যাপন করতেন শেখ কামাল। সব সময় তাঁর মাথায় ছিল তিনি কার ছেলে? এমন কিছু কখনো করতেন না, যাতে বাবার নামে এতটুকু অমর্যাদা হয়। যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন তাঁরা জানেন, কতটা আদর্শ জীবন যাপন করতেন শেখ কামাল।

বড় বেশি প্রাণোচ্ছল ছিলেন শেখ কামাল। তাঁর কথা এক দিনে লিখে শেষ করা যাবে না। তিনি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ আরো অনেক আগেই সমৃদ্ধিশালী হতো। এই আগস্টেই তিনি পৃথিবীতে এসেছেন আর এই আগস্টেই ঘাতকের নির্মম বুলেটে সপরিবারে তাঁকে চলে যেতে হলো। এ দুঃখ ভোলার নয়।

কামাল, বাংলাদেশের মানুষ তোমায় ভুলবে না কোনো দিন।

লেখক : স্বাধীন বাংলা ফুটবল

দলের সংগঠক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা