kalerkantho

সোমবার । ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭। ১০ আগস্ট ২০২০ । ১৯ জিলহজ ১৪৪১

করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য টিকা ও একটি আবেদন

আ ব ম ফারুক

১৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য টিকা ও একটি আবেদন

করোনাভাইরাসের আক্রমণে দিশাহারা বিশ্বে ধনি-গরিব-নির্বিশেষে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু আর শত শত মানুষের নিদারুণ কষ্টকর দম বন্ধ করা ভোগান্তি ও উত্কণ্ঠার পরিপ্রেক্ষিতে এই ভাইরাসটি প্রকৃতিদত্ত বিপদ, নাকি কোনো কোনো লোভী মানুষের সৃষ্ট আপদ—এই বিতর্ক তোলার সময় এখন নয়। সারা বিশ্বের মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপন্নকারী এ রকম মহামারির যাতে ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে তার জন্য এই মহামারির অনুপুঙ্খ তদন্ত এবং সে অনুযায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা গ্রহণ মানবজাতির স্বার্থেই অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এখন আমরা সে বিতর্ক চাই না। এখন মানুষ বাঁচানো জরুরি।

তাই বিশ্বের মানবদরদি বিজ্ঞানীরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ ইত্যাদির পার্থক্য ভুলে গিয়ে এই মুহূর্তে সারা পৃথিবীতে করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কারের জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছেন। এর মধ্যে শতাধিক গবেষণা বেশি উল্লেখযোগ্য। আবার এর মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় মনে হচ্ছে ১৫টিকে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা এবং বিভিন্ন ওষুধ কম্পানি খুবই ব্যয়বহুল গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছে। এদের কর্মকৌশল বিভিন্ন রকম, টিকার ধরনও বিভিন্ন। ইন-অ্যাক্টিভেটেড ভাইরাস, মেসেঞ্জার আরএনএ, জিন বেসড, সিনথেটিক ডিএনএ, জিনোমের গঠন, স্পাইকের প্রোটিন ইত্যাদি তাত্ত্বিক কর্মকৌশল নিয়ে কাজ করছে। কারণ করোনার ঘন ঘন রূপ পরিবর্তন বা মিউটেশন করার ক্ষমতা। টিকা আবিষ্কারের জন্য গবেষকরা যে বিভিন্ন কর্মকৌশল অবলম্বন করছেন তাতে সুবিধা হলো, এতগুলোর মধ্যে কোনো না কোনো একটি টিকা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যদি একাধিকও কার্যকর হয় তাতেও ভোক্তারই সুবিধা। বাজারে যেকোনো জিনিসের জন্যই প্রতিযোগিতা থাকা ভালো।

টিকা যে শুধু ইঞ্জেকশন আকারে তৈরির চেষ্টা হচ্ছে তা নয়। মুখে খাওয়ার কিংবা ন্যাসাল স্প্রে অথবা ইনহেলার ধরনের করা যায় কি না তারও চেষ্টা চলছে। মুখে খাওয়ার টিকার প্রচলন তো কয়েকটি রোগের বিরুদ্ধে আমাদের আছেই। এখন নতুনত্ব হবে যদি ন্যাসাল স্প্রে বা ইনহেলার আকারে কোনো টিকা আসে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষকরা বলছেন, তাঁরা নাকি এই নতুন ধরনের টিকা নিয়ে বেশ এগিয়েও গেছেন। আরো একটি নতুনত্ব হতে পারে, যদি করোনার বিরুদ্ধে কার্যকর টিকাটি অণুজীবের কালচার মিডিয়া থেকে তৈরি না হয়ে শাকসবজি, যেমন—টমেটো, আলু, লেটুসপাতা এগুলো থেকে তৈরি হয়, তাতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও খরচ দুই-ই কমবে বলে আশা করা যায়। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব অটোয়া এ রকম একটি গবেষণা চালাচ্ছে।

গত মাসে বিশ্বের বিভিন্ন ল্যাবের গবেষণার অগ্রগতি পর্যালোচনা করে আমরা যে রকম অনুমান করছিলাম, আশা ও স্বস্তির বিষয় যে টিকার গবেষণার অগ্রগতি প্রায় সে রকমই মিলে গেছে। যদিও কোনো প্রতিষ্ঠানই তাদের গবেষণা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফলাফল না জানাতে গোপনীয়তা রক্ষা করে, তবু গবেষকরা না চাইলেও তাঁদের সম্পর্কে অনেক খবরই বিভিন্নভাবে জানা হয়ে যায়। তাই এসব খবরকে একত্র করে চারদিকের করোনার শঙ্কার মধ্যেও আমরা এখন এতটুকু প্রত্যাশা করতে পারি যে আগামী মাসেই ইনশাআল্লাহ করোনার কমপক্ষে একটি টিকা মানুষের শরীরে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ নয়, বরং প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহারের জন্যই আসছে।

আমরা গত মাসে যে রকম বলেছিলাম, করোনার টিকা আবিষ্কারের প্রতিযোগিতায় এখনো সবচেয়ে এগিয়ে আছে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও সুইডিশ ওষুধ কম্পানি এসট্রা জেনেকার টিকা। মানবদেহে তাদের ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রায় শেষের পথে এবং এখন পর্যন্ত তাদের ফলাফল নিয়ে তারা খুবই আত্মবিশ্বাসী। এ কারণে এরই মধ্যে তারা যুক্তরাজ্য, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, চীন, ভারত, ব্রাজিলসহ সারা পৃথিবীতে ১০টি কম্পানির সঙ্গে এই টিকার ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। ভারতে এটি উৎপাদন করবে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টিকা উৎপাদনের কারখানা সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া। তারা আগস্টে বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য সব প্রস্তুতি সেরে রেখেছে। ভারতের আরেকটি কম্পানি ভারত বায়োটেক জানিয়েছে, তারাও আগামী ১৫ আগস্টে ভারতের স্বাধীনতা দিবসের দিন করোনার টিকা আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে ছাড়বে। এখন তারাও মানবশরীরে ফেজ-৩ ট্রায়াল চালাচ্ছে। যদি তা-ই হয়, তাহলে তারাই হবে শুধু ভারতের নয়, বরং পৃথিবীতে সর্বপ্রথম করোনার টিকার আবিষ্কর্তা। কোনো কারণে তা সম্ভব না হলে মনে হচ্ছে প্রথম হবে অক্সফোর্ড ও এসট্রা জেনেকার টিকা। ভারত বায়োটেক একা এই টিকা নিয়ে কাজ করছে না। তার সঙ্গে আছেন ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি নামের ভারতের দুটি বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা।

এরপর এগিয়ে আছে ফেজ-৩ ট্রায়াল চালানো চীনের সিনোফার্ম, সিনোভ্যাক বায়োটেক এবং যৌথভাবে ক্যানসিনো বায়োলজিকস ও চীনের সামরিক বাহিনীর রিসার্চ ইউনিট। এ পর্যন্ত নাকি তাদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোতে ফলাফল যা এসেছে তা বেশ ইতিবাচক। শেষোক্ত টিকাটির ফেজ-৩ ট্রায়াল শেষ হওয়ার আগেই চীনা সরকার তাদের সরকারি কর্মকর্তা ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের এই টিকা দেওয়া শুরু করে দিয়েছে। চীনের একটি টিকার ট্রায়াল বাংলাদেশেও করা হবে বলে জানা গেছে।

গবেষণার পর্যায়ক্রমিক অগ্রগতির বিচারে চীনের পরেই টিকা আবিষ্কারের গবেষণায় পরবর্তী নাম আসে যুক্তরাষ্ট্রের। সেখানে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় আকারের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালটি চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার ও জার্মানির বায়োএনটেক। তারা গত মে মাসে এই ট্রায়াল শুরু করে। তাদের ফলাফল খুবই উৎসাহব্যঞ্জক এবং মৃদু জ্বর ও টিকা দেওয়ার জায়গায় সামান্য ফোলা ও ব্যথা ছাড়া অন্য কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এমনকি তারা এখন স্বল্প না মাঝারি ডোজ ব্যবহার করবে তা নিয়ে এখন কাজ করছে। আমেরিকার আগামী শরতে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের মধ্যে তারা টিকা বাজারে আনবে বলে আশাবাদী।

যুক্তরাষ্ট্রের কেমব্রিজের মডার্না সময়ের বিচারে কিছুটা পিছিয়ে গেছে। তারা এই মাসে তাদের ফেজ-৩ ট্রায়াল শুরু করেছে। তা শেষ না হলেও ফলাফল এরই মধ্যে আশানুরূপ মনে হওয়ায় তারা ক্যাটালেন্টের সঙ্গে টিকার বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য চুক্তিতে এসেছে এবং আগামী নভেম্বরে এই টিকা বাজারে আসবে।

একইভাবে হঠাৎ করে ফ্রান্সের সানোফি ও যুক্তরাজ্যের গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের যৌথ টিকার ফেজ-৩ ট্রায়াল পিছিয়ে গিয়ে এখন অক্টোবরে তা শুরু করা হবে বলে তারা বলেছে; যদিও যুক্তরাষ্ট্রের কম্পানি ট্রান্সলেটকে তারা বিপুল পরিমাণের সম্মিলিত উৎপাদনের জন্য সঙ্গে নিয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ইনোভিও ফার্মাসিউটিক্যালসের জিনভিত্তিক টিকা অনেক বিজ্ঞানীর আগ্রহ সৃষ্টি করেছে মানবদেহে তাদের চমৎকার ফলাফলের জন্য। তাদের ইমিউনোলজিক্যাল রেসপন্স রেট অনেক ওপরে। কিন্তু দ্রুতই তারা বাজারে আসতে পারবে না। কারণ তারা কোনো কারণে বাজারে আসার আগে আরো বড় ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানোর পরিকল্পনা করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার ওয়েস্টার ইনস্টিটিউটের টিকারও চমৎকারিত্ব রয়েছে। তারা কোনো ভাইরাস নয়, বরং কৃত্রিম বা সিনথেটিক ডিএনএ ব্যবহার করছে। তাদের ফলাফল বিষয়ে এখনো জানা বাকি। তবে জীবজন্তুর ওপর পরীক্ষায় তারা বেশ সফলতার দাবিদার।

যুক্তরাষ্ট্রের জনসন অ্যান্ড জনসনের ওষুধ কম্পানি জেনসেন এবং বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বেথ ইসরায়েল ডিয়াকোনেস মেডিক্যাল সেন্টার অনেক বড় আয়োজন করে প্রাণিদেহে তাদের টিকার পরীক্ষা শুরু করেছিল গত মার্চে। ফলাফল ইতিবাচক হওয়ায় আগামী সেপ্টেম্বরের পরিবর্তে এই জুলাই মাসের মাঝামাঝি তারা যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়ামে মানবদেহে পরীক্ষা শুরু করবে এবং সব কিছু ঠিক থাকলে ২০২১ সালের শুরুতে বাজারে আসবে। তবে অন্যতম একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মানুষ বাঁচাতে এবং করোনা মহামারিকে যত দ্রুত সম্ভব পৃথিবী থেকে বিদায় করতে তারা স্বল্পমূল্যে এই টিকা বিক্রি করবে এবং এই টিকা থেকে কোনো মুনাফা করবে না বলে জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি প্রতিষ্ঠান সরেনটো থেরাপিউটিকস জানিয়েছে, তাদের টিকার উপাদান করোনার স্পাইকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে বলে সে আর সংখ্যা বাড়াতে পারবে না। ফলে শ্বাসতন্ত্রে সে কোনো সংক্রমণ ঘটাতে পারবে না। প্রাণিদেহে সাফল্যের পর এখন তারা মানবদেহে ফেজ-১ ট্রায়াল শুরু করবে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তর পার হয়ে বাজারে আসতে তার ঢের দেরি আছে।

অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের গবেষণাধীন টিকাটির উপাদান হলো করোনার স্পাইকগুলোর প্রোটিনের অনুরূপ প্রোটিন, যা এসব প্রোটিনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করবে এবং এসব প্রোটিনওয়ালা করোনা শরীরে ঢুকলে তাকে মেরে ফেলবে। এটি আগামী বছর বাজারে আসবে বলে জানা গেছে।

একই রকম ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য রয়েছে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল স্কুলের গবেষণাধীন টিকার। এই টিকা আগামী মাসে অর্থাৎ আগস্টে মানবশরীরে ট্রায়ালে যাবে। এর আরো বৈশিষ্ট্য হলো যে এই টিকা দিয়ে করোনায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করাও নাকি সম্ভব হবে। কিন্তু এই টিকা-কাম-ওষুধ আগামী বছরের আগে বাজারে পাওয়া যাবে না।

এদিকে রাশিয়ার সেচেনভ ফার্স্ট স্টেট মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি অতি সম্প্রতি জানিয়েছে, তাদের আবিষ্কৃত করোনার টিকার ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ হয়েছে এবং আগামী দু-এক মাসের মধ্যেই তারা এই টিকা বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা নিয়েছে।

নাইজেরিয়া গত মাসে করোনার একটি টিকার গবেষণায় সাফল্যের কথা জানিয়েছে। দেশটির এডিলিকে ইউনিভার্সিটির ওগবোমোশোর ট্রিনিটি ইমিউনোডেফিসিয়েন্ট ল্যাবরেটরি এবং হেলিক্স বায়োজেন কনসাল্টের গবেষকরা এটির আবিষ্কারক। তবে তাঁরা এখনো কার্যকারিতা পরীক্ষার প্রথম পর্যায়ে রয়েছেন এবং ব্যাপক পরীক্ষা আগামী মাসগুলোতে সম্পূর্ণ হওয়ার পর ২০২২ সালে বাজারে আসতে পারে।

মাম্পস, রুবেলা ও মিসেলসের টিকাগুলো করোনার টিকা নয়। কিন্তু করোনায় আক্রান্ত হলে রোগীদের হৃদ্যন্ত্রের যেসব গোলযোগ সৃষ্টি হয়, সেগুলো এসব টিকা দিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে। বিশেষ করে, গুরুতর অসুস্থ ও বয়স্ক করোনা রোগীর বেলায় এসব টিকার কার্যকারিতা দেখা গেছে।

কিন্তু আমরা আজ টিকা আবিষ্কারের বৈশ্বিক কর্মকাণ্ডের বিবরণের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি উন্নত মানের ওষুধ কম্পানির করোনার টিকা গবেষণায় সাফল্যের কথাটি গর্বের সঙ্গে বলতে চাই। এর গবেষকরা অপেক্ষাকৃত তরুণ, কিন্তু অত্যন্ত মেধাবী। তাঁরা অন্য দেশের দেখাদেখি করোনার গবেষণা অনুকরণ করেছেন তা নয়, বরং বাংলাদেশে করোনার যে প্রজাতিগুলোর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে সেগুলোর জিন সিকোয়েন্স বের করে তারপর তাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্টভাবে কার্যকর একটি টার্গেট কোডিং সিকোয়েন্স নির্ণয় করে তার বিরুদ্ধে কার্যকর হবে এমন টিকা উদ্ভাবনে ব্রতী হয়েছেন এবং প্রাথমিকভাবে প্রাণিদেহে এর পরীক্ষায় করোনা প্রতিরোধে সাফল্য পেয়েছেন। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার এবং আমরা এ জন্য গর্ব অনুভব করি। আমরা করোনার টিকা উদ্ভাবনের এই প্রাথমিক সাফল্যের জন্য গ্লোব বায়োটেক এবং এর গবেষকদের অভিনন্দন জানাই। তাঁদের টার্গেট কোডিং সিকোয়েন্স এই বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন কর্তৃক স্বীকৃত ও প্রকাশিত হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিটি এই গবেষণার মৌলিকত্বের পরিচয় এবং আমাদের গবেষকরা যে মৌলিকভাবে অর্থাৎ তাঁদের নিজস্ব মেধায় টিকা গবেষণার কাজটি করেছেন এবং প্রাণিদেহে প্রাথমিক পরীক্ষায় সাফল্য পেয়েছেন তা শুধু এই কম্পানি নয়, বরং আমাদের বাঙালি জাতির জন্য একটি বড় অর্জন। এর ভালো দিকটি হলো, যেহেতু টিকাটি এখানকার করোনাভাইরাসের কোডিং সিকোয়েন্সকে মাথায় রেখে তৈরি, তাই অন্য সব টিকা বাংলাদেশে করোনার বিস্তার ঠেকাতে যদি ব্যর্থও হয়, তবু এটি ব্যর্থ হবে না। আমরা প্রত্যাশা করব, কম্পানিটি এখন প্রাণিদেহে বড় আকারের পরীক্ষা শুরু করবে এবং এরপর মানবদেহে ফেজ-১, ২ ও ৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলো যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে সঠিকভাবে সম্পন্ন করবে। আমাদের শুভ কামনা থাকল, প্রতিটি পর্যায়ে তারা যেন ইতিবাচক ফলাফল পায়। এভাবে আমাদের দেশের মানুষের জীবন যেমন বাঁচবে, এই দেশটির অর্থনীতি যেমন আবার চাঙ্গা হবে, তেমনি বাংলাদেশও করোনার টিকা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে সফল হয়ে বিশ্বে একটি মর্যাদার আসন লাভ করবে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে ইনশাআল্লাহ শিগগিরই করোনার এক বা একাধিক টিকা বিশ্ববাজারে আসছে। টিকা বাজারে আসার পূর্বক্ষণে আমরা জনস্বার্থে কয়েকটি প্রস্তাব রাখতে চাই। প্রথমত, ভারতের সঙ্গে আমাদের সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক অনেক গভীর। এর মূলে রয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের রক্তের বন্ধন। ভারতের সিরাম ইন্ডিয়া বা ভারত বায়োটেক যারাই টিকা বাজারে আনুক, সুপ্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বমূলক সম্পর্কের কারণে আমরাও সেই টিকার কিছু অংশ বাংলাদেশের জন্য পেতে চাই। এই চরম বিপদের দিনে আমরা বাংলাদেশের জনগণ বন্ধুপ্রতিম ভারতবাসীর প্রতি এই সহযোগিতার আহ্বান জানাই, যা আমাদের মৈত্রীর বন্ধনকে আরো দৃঢ় করবে।

দ্বিতীয়ত, চীনও আমাদের অন্যতম নিকট-প্রতিবেশী। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অনেক উন্নতি হয়েছে। চীনের সঙ্গে বর্তমানের দ্বিপক্ষীয় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতের সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্ভাবনার বিষয়টি বিবেচনা করে এই মহামারি থেকে পরিত্রাণের জন্য আমরা চীনের কাছেও তাদের আবিষ্কৃত টিকা চাইতে পারি। চীন যেহেতু এরই মধ্যে এ ব্যাপারে আশ্বাসও দিয়েছে, সে ক্ষেত্রে উভয় সরকারের উদ্যোগে একটি রূপরেখা এখনই তৈরি করে ফেলা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের অবকাঠামো এখন বেশ শক্তিশালী। কিছু কম্পানির ওষুধ এখনো নিম্নমানের, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর একটি সংবাদ। তার পরও আমাদের ওষুধশিল্পে এখন বিশ্বমানের কারখানাও রয়েছে, যেগুলো অত্যন্ত উঁচুমানের ওষুধ তৈরি করে। ভারত বা চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণে আমরা নিশ্চয়ই তাদের কাছ থেকে কিছু টিকা অনুদান পাব। কিন্তু আমাদের বিপুল জনসংখ্যা এবং ভারত বা চীনের কারখানা যত বড়ই হোক, তাদের উৎপাদন সামর্থ্যের বিষয়টিও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে টেকনোলজি ট্রান্সফার, আন্ডার লাইসেন্সিং বা কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং ইত্যাদি ব্যবস্থার মাধ্যমে আমাদের দেশের কোনো কোনো ওষুধ কারখানায় এই টিকা উৎপাদনের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যায় কি না, তা বিশেষভাবে বিবেচনার জন্যও আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই।

চতুর্থত, জাতিসংঘের কাছে আমাদের একটি জোরালো নিবেদন আছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-দেশ-সামাজিক বা আর্থিক অবস্থান-নির্বিশেষে বিশ্বের সব বিবেকসম্পন্ন সচেতন মানুষের হয়ে আমরা দাবি করতে চাই যে যারাই করোনার টিকা আবিষ্কার করুক, তা কোনো দেশের বা কম্পানির কুক্ষিগত না রেখে পৃথিবীর সব মানুষের ব্যবহারের অধিকারের আওতায় আনা হোক। যারা এই টিকা আবিষ্কার করবে তাদের আর্থিক ক্ষতি হবে না, যদি জাতিসংঘের উদ্যোগে একটি সাধারণ তহবিল গঠন করে কম্পানির কাছ থেকে শত শত কোটি ডোজ টিকা কিনে নিয়ে প্রতিটি দেশে তা পূর্ণ চাহিদা অনুযায়ী দেওয়া হয়। কলেরা-বসন্ত-পোলিও ঠেকিয়ে প্রমাণিত হয়েছে যে বিশ্বজনীন উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষ মহামারি ঠেকাতে পারে। করোনা ঠেকানো ও মানুষ বাঁচানোর জন্য আজ এমন উদ্যোগ আবার নিতে হবে। কিন্তু এসব টিকা যদি কিনে নিতে হয়, তাহলে কম্পানিগুলোর ব্যবসা হয়তো ভালো হবে, বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষ তা কিনতে পারবে না। করোনার এসব টিকা নিশ্চয়ই অনেক দামি হবে। ছয় মাস ধরে বিশ্বজুড়ে চলমান করোনার তাণ্ডবে বেশির ভাগ মানুষের আর্থিক অবস্থা শোচনীয়। তাদের পক্ষে ইচ্ছা থাকলেও এই টিকা হয়তো কিনে নেওয়া সম্ভব হবে না। ফলে তারা মারা যাবে। আমরা কখনোই এ রকম অন্যায্য, অমানবিক পৃথিবী চাই না। আমরা ভবিষ্যতের একটি ন্যায্য, সহানুভূতিশীল ও মানবিক পৃথিবীর জন্য এখনই উদ্যোগ নিতে পৃথিবীর মানবকুলের একজন হিসেবে বিশ্বের সব মানুষের পক্ষ থেকে আসুন জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানাই, যাতে করোনার নব-আবিষ্কৃত টিকা সারা পৃথিবীতে সর্বজনীনভাবে বিনা মূল্যে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। মানুষ বাঁচলে ভবিষ্যতে ব্যবসার সুযোগ থাকবে, বিধ্বস্ত অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু মানুষকে বাঁচানো না গেলে এর কোনোটাই সম্ভব হবে না। অল্প কিছু ধনী দেশ বা মানুষ দিয়ে তো দুনিয়া চলবে না।

লেখক : অধ্যাপক ও পরিচালক, বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার; সাবেক চেয়ারম্যান, ফার্মেসি বিভাগ ও ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগ; সাবেক ডিন, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা