kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

ক্রিকেটের এ আরেক রূপ

ইকরামউজ্জমান

৮ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ক্রিকেটের এ আরেক রূপ

ক্রিকেটের সবচেয়ে কুলীন সংস্করণ টেস্ট ম্যাচ। টেস্ট ক্রিকেট মাঠে নেমে ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের শতভাগ সুস্থ ক্রিকেটাররা নিজ নিজ দেশের গৌরবের জন্য লড়বেন। লড়বেন দুই দেশের ক্রিকেট সম্মানের স্মারক ‘উইজডেন ট্রফি’ ধরে রাখা আর অধিকার করার লড়াইয়ে! তিন টেস্টের ‘রেইজ দ্য ব্যাট’ সিরিজ। আমরা দেখব উভয় দেশের খেলোয়াড়দের জার্সিতে লেখা থাকবে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’—বিশ্বজুড়ে চলা বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা।

প্রায় চার মাস পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আবার মাঠে ফিরে আসছে। শেষবারের মতো আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে গত ১৩ মার্চ। ক্রিকেটকে আবার মাঠে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে স্মরণীয় ভূমিকা পালন করছে ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। যারা গত ৯ যুগ ধরে পরস্পর পরস্পরের বিপক্ষে টেস্ট চত্বরে প্রাণবন্ত ক্রিকেট খেলে অনেক রোমাঞ্চ, ঘটনা, অনেক স্মৃতি আর উত্থান-পতনের জন্ম দিয়ে ক্রিকেট ইতিহাসকে আলোকিত করেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথম টেস্ট খেলেছে ১৯২৮ সালে। এরপর ১৯৫০ সালে ২২ বছর পর ১১টি টেস্ট খেলার পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জিতেছে লর্ডসে। উভয় দেশ এ পর্যন্ত ৩৭টি সিরিজের আওতায় খেলেছে ১৫৭টি টেস্ট ম্যাচ।

আজ ৮ জুলাই ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটনে প্রথম টেস্ট শুরু হবে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত পরিবেশে। পাশাপাশি অবশ্য বিভিন্ন ধরনের শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। এরপর পরবর্তী দ্বিতীয় ও তৃতীয় টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে যথাক্রমে ১৬ ও ২৪ জুলাই ম্যানচেস্টারে। ‘আইসোলেশন’, ‘কোয়ারেন্টিন’, ‘নেগেটিভ’ ছাড়পত্র নিয়েই মাঠে নামবেন খেলোয়াড়রা। তবে মনে এক ধরনের অস্বস্তি থেকে মুক্তি নেই।

ক্রিকেটবিশ্বের চোখ এখন ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটনে নিবদ্ধ। প্রচুর উৎসাহ, পাশাপাশি উদ্বিগ্নতা এবং প্রচণ্ড হতাশাও আছে। টেস্ট ম্যাচ শুরু হবে ঠিকই, তবে স্টেডিয়াম থাকবে দর্শকশূন্য। যাঁরা খেলার প্রাণ, আসরের মূল গায়েন, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণাদাতা, মাঠ জমিয়ে রাখেন এবং যাঁরা ক্রিকেটের সৌন্দর্য। ক্রিকেট মাঠে থাকবে না মধুর কোলাহল আর আনন্দ। থাকবে না মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন। বিরাজ করবে শব্দহীন নীরবতা। ক্রিকেটের আসর মানেই উৎসব—সেই পরিবেশ এবার টেস্ট ক্রিকেট মাঠে পুরোপুরি অনুপস্থিত থাকবে।

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ইউরোপ থেকে উৎপত্তি প্রাণঘাতী ফ্লুর জন্য অতীতেও ক্রিকেট মাঠ থেকে অনুপস্থিত ছিল এবারের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে।

এরপর একটি সময়ে ক্রিকেট আবার স্বাভাবিক নিয়মেই মাঠে ফিরে এসেছে। কিন্তু এবারের সংক্রমণ বা করোনাভাইরাস পুরো বিশ্বের সব ধরনের জীবনপ্রবাহকে উলট-পালট করে দিয়েছে এরই মধ্যে। বদলে দিয়েছে বিভিন্ন ধরনের সংস্কৃতি ও আচার-আচরণ। এই সংক্রামক রোগ এখনো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। কবে সম্ভব হবে তা একমাত্র পরম করুণাময় ছাড়া কেউ জানেন না। টেস্ট ক্রিকেটের ১৫৩ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে গ্যালারিতে একজনও দর্শক থাকবেন না। এটি আরেক ধরনের নতুন অভিজ্ঞতা।

দর্শক ছাড়া টেস্ট ম্যাচের লড়াই। উভয় দলের খেলোয়াড়রা মনোবিদদের সাহায্য নিয়েছেন। শূন্য মাঠে কিভাবে একটি পরিবেশ সৃষ্টি করে ‘মাইন্ড সেটের’ মাধ্যমে ক্রিকেটের মধ্যে ঢুকে যাওয়া। বিষয়টি খুব সহজ নয়। পাল্টে গেছে ক্রিকেটের সংস্কৃতি। মাঠে ক্রিকেটাররা মুখের ‘লালা’ বলে লাগাতে পারবেন না বলকে চকচকে রাখার জন্য। পারবেন না হাত মেলাতে, একে অপরকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বাস করতে। এবার তাঁরা উচ্ছ্বাস করবেন মাঠে অন্যভাবে। টেস্ট ম্যাচ চলাকালে কোনো খেলোয়াড় করোনায় আক্রান্ত হলে তাঁর পরিবর্তে আরেকজন খেলতে পারবেন। যে দেশে খেলা হচ্ছে সেই দেশের আম্পায়াররাই খেলা পরিচালনা করবেন। নিরপেক্ষ আম্পায়ার নেই। অর্থাৎ ইংল্যান্ডের আম্পায়াররা তাঁদের দেশে খেলা পরিচালনা করবেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের অলরাউন্ডার অধিনায়ক জেসন হোল্ডার এরই মধ্যে বলেছেন, টেস্ট চলাকালে মাঠে তিনি ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ‘বার্মি আর্মি’কে মিস করবেন।

এদিকে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক টিম পাইন মাঠে কোনো দর্শক থাকবেন না, এটাকে কোনো সমস্যা মনে করেন না। তাঁর বক্তব্য হলো, ‘আমার মনে হয় না দর্শকের ব্যাপারটা খুব বেশি প্রভাব ফেলবে। মাঠে নামার সময় পিচের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াতেও মনোযোগ থাকবে সবার। ব্যাট-বলের লড়াই শুরু হলে দর্শকের ব্যাপারটা মাথায় থাকবে না কারো।’ অপর বাংলার সাহিত্যিক ও ক্রিকেট সাহিত্যিক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর ‘মৃগ নেই মৃগয়া’ (প্রথম প্রকাশ ফাল্গুন, ১৩৭২) বইয়ে লিখেছেন, দর্শকের মর্জিতেই ক্রিকেট। দর্শক যদি দেখতে না আসে, তবে কোথায় খেলা। কোথায় বা পৃথিবীর জীবননাট্য? (পৃষ্ঠা ৫৭)।

মাঠভরা ক্রিকেট থাকবে। সেই ক্রিকেট দেখার প্রচণ্ড ক্ষুধা আর আবেগ থাকা সত্ত্বেও অনেকেই বাধ্য হয়ে দেখবেন টেলিভিশনে। এটাই বাস্তবতা। মহামারির কাছে মানুষ কত অসহায়। অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে টেলিভিশনের পর্দায় এবার অনেক বেশি চোখ লেপ্টে থাকবে। অতএব ক্রিকেট বাণিজ্য রমরমা। টিকিট থেকে প্রাপ্ত অর্থ বড় সহজেই চলে আসবে টেলিভিশন রাইট থেকে।

মাঠে গিয়ে ক্রিকেট উপভোগ বিষয়টি অন্য এক ধরনের সংস্কৃতি। অদ্ভুত ধরনের আবেগ, নেশা, ভালোবাসা ও টান। মাঠের জীবন্ত ক্রিকেট তাঁদের নেশার মতো টানে।

সাউদাম্পটনে প্রথম টেস্টের ইংল্যান্ডের অধিনায়ক অলরাউন্ডার বেন স্টোকস। ইংল্যান্ড দলের নিয়মিত অধিনায়ক জো রুটের অনুপস্থিতিতে। বেন স্টোকসের আগে আরো ১১ জন ক্রিকেটার একটি করে টেস্টে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে জেসন হোল্ডার অলরাউন্ডার ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের অধিনায়ক। এর আগের সিরিজ ইংল্যান্ড জিতেছে ২-১ টেস্টে। প্রথম টেস্টে বাজে ভাবে হেরে যাওয়ার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বিতীয় টেস্টে হেডিংলিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিরিজ জিতেছে ইংল্যান্ড। এবারের লড়াইয়ে যেটি লক্ষণীয় হবে সেটি হলো, দুই দলের পেসারদের চূড়ান্ত শক্তি পরীক্ষা। পেস আক্রমণে উভয় দল কেউ কারো চেয়ে কম নয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুর্বলতা হলো ব্যাটিং। এখানেই তারা ইংল্যান্ড থেকে পিছিয়ে থেকে মাঠে নামবে। মনে রাখতে হবে, ইংল্যান্ড গত ২০১৪ সালের পর থেকে দেশে কোনো সিরিজ হারেনি। পরিসংখ্যান এবং গত কয়েক বছরের পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে দুই দলের বেশ কিছু মিল থাকলেও ইংল্যান্ড কিন্তু এগিয়ে আছে। প্রথম টেস্টে নিয়মিত অধিনায়ক জো রুটের অনুপস্থিতি অন্য ব্যাটসম্যানদের সামাল দিতে হবে। যদি ওয়েস্ট ইন্ডিজের টপ অর্ডাররা ফর্ম ফিরে পান, তাহলে সিরিজভাগ্য কী হবে এটার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা