kalerkantho

বুধবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৭। ৫ আগস্ট  ২০২০। ১৪ জিলহজ ১৪৪১

জঙ্গিরা কিন্তু বসে নেই

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

৭ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জঙ্গিরা কিন্তু বসে নেই

গত ১ জুলাই ছিল ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে বর্বরতম জঙ্গি আক্রমণের চতুর্থ বার্ষিকী। দিনটি ছিল রমজান মাসের শুক্রবার। সেদিন ইফতারের কিছু পরেই আনুমানিক রাত পৌনে ৯টায় জঙ্গিরা বেকারিতে খেতে আসা দেশি-বিদেশি সব অতিথিকে জিম্মি করে ফেলে। কিছু না বুঝে পুলিশের পরিদর্শক রবিউল ইসলাম সেখানে হাজির হওয়া মাত্র জঙ্গিদের গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ফ্ল্যাশ নিউজ ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের প্রান্তসহ বিশ্বময়। সে রাত ছিল এক নিদারুণ যন্ত্রণাময় রাত।

মনে পড়ে, একটা বেসরকারি টিভি চ্যানেলে অনিশ্চয়তা, দুঃসহ চিন্তা আর সীমাহীন উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রায় সারা রাত লাইভ সংবাদভাষ্যে সংযুক্ত ছিলাম। সংবাদকক্ষ থেকে বারবার আমার কাছে জানতে চাওয়া হয়, এখন পুলিশের কী করা উচিত। আমি সবিনয়ে বলেছি—দেখুন, এ রকম উত্তেজনাকর মুহূর্তে যখন তাত্ক্ষণিক অ্যাকশন প্রয়োজন, তখন বাইরে থেকে কোনো রকম পরামর্শ দেওয়া সঠিক হবে না। এই সময়ে গ্রাউন্ডে যাঁরা ফোর্সের কমান্ডে আছেন, তাঁদের উপস্থিত বুদ্ধি, বিচক্ষণতা ও পেশাগত দক্ষতার দ্বারাই শুধু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। সারা রাত নির্ঘুম কাটানোর পর সকালে স্বস্তির খবর পেলাম, সেনাবাহিনীর কমান্ডো অপারেশনের মাধ্যমে জঙ্গিদের সবাই নিহত হয়েছে এবং বেকারির ভেতরে আটকে পড়া অন্য সবাইকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। যদিও জাপান, ইতালি, আমেরিকা, ভারত, বাংলাদেশের ২২ জন নিরীহ মানুষকে জঙ্গিরা হত্যা করেছে। এই খবরে দেশব্যাপী ভয়ানক শোকের ছায়া নেমে আসে।

হলি আর্টিজানে আক্রমণকারী সাতজন জঙ্গি নিহত হলেও বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলো এটাকে তাদের বড় সাফল্য হিসেবে ধরে নেয়। সুতরাং অতি উৎসাহে মাত্র সাত দিনের মাথায় ৭ জুলাই ঈদের দিন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় দেশের সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত শুরুর প্রাক্কালে জঙ্গিরা কর্তব্যরত পুলিশের ওপর এলোপাতাড়ি আক্রমণ চালায়। তাতে পুলিশসহ চারজন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়। সেই থেকে গত চার বছরের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে এই মর্মে উপসংহার টানা যায় যে গুলশানে জঙ্গি আক্রমণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সশস্ত্র জঙ্গি উত্থান, বিস্তার, জঙ্গি আক্রমণ ও জঙ্গি দমনের জায়গাটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্টের সৃষ্টি হয়। তাই গুলশানের জঙ্গি আক্রমণকে বলা যায় ওয়াটারশেড অব টেররিজম ইন বাংলাদেশ। গুলশান ও শোলাকিয়ার পর জঙ্গিরা যেন আরো মরিয়া হয়ে ওঠে। সেই থেকে আরো প্রায় দুই বছর ধরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মিরপুর, গাজীপুর, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জায়গায় একই রকম বড় আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু কোনোটাতেই তারা সফল হতে পারে না। জঙ্গিদের সব আক্রমণের উদ্যোগই প্রস্তুতিপর্বে নস্যাৎ করে দিতে সক্ষম হয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত প্রায় তিন বছর জঙ্গিরা বড় ধরনের কোনো তত্পরতা আর চালাতে পারেনি।

তবে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, জঙ্গিবাদ এবং তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িকতাবাদী রাজনীতি, যেখান থেকেই মূলত জঙ্গিদের উত্পত্তি, তার সব কিছুই আগের মতো বহাল আছে। মনে পড়ে, ওই সময়ে একটা বড় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারে জিহাদি ও জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধকরণের প্রচুর বই পাওয়া গিয়েছিল। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকও গুলশানে জঙ্গি হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে অনেক তথ্য-উপাত্ত পত্রিকায় এসেছিল। পরে কী করে যেন মূল মামলা থেকে বাদ পড়ে যায়। গ্রেপ্তারকৃত জঙ্গিদের বিচারের অগ্রগতি নেই বললেই চলে।

জামায়াতের সাবেক বড় নেতা জেএমবিপ্রধান মাওলানা সাঈদুর রহমান ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান জসিম উদ্দিন রাহমানি প্রায় ১০ বছর জেলে আছে, বিচারের কোনো অগ্রগতি নেই। বৈশ্বিক অঙ্গনে জঙ্গিরা তত্পরতা অব্যাহত রেখেছে, যদিও আগের মতো সক্ষমতা তাদের নেই। নাইজেরিয়ার বোকোহারাম ও সোমালিয়ার আলশাবাব অনবরত বড় বড় আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। জঙ্গিবাদের চরম মধ্যযুগীয় বর্বরতার উদাহরণ সৃষ্টিকারী আফগানিস্তানের তালেবান এখন আমেরিকার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাবুলে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে। বাংলাদেশের জঙ্গিরাও বসে নেই। গত বছর ঢাকা শহরে এবং এ বছরের শুরুতে চট্টগ্রামে জঙ্গিরা পুলিশের ওপর কয়েকবার বোমা হামলা চালিয়েছে। এর আগে তারা অধ্যাপক জাফর ইকবালকে হত্যা করার জন্য আক্রমণ চালিয়েছে। শোনা যায়, এখন নাকি জঙ্গিরা প্রচার চালাচ্ছে, জিহাদে যোগ দিলে করোনায় ধরবে না। করোনার ফলে দেশব্যাপী অনেক প্রান্তিক মানুষ অর্থনৈতিক অসহায়ত্বের মধ্যে পড়েছে। প্রলোভন দেখিয়ে জঙ্গিরা তাদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করবে। সুতরাং জঙ্গিরা বসে নেই। তাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও সর্বোচ্চ সতর্কতা রক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

 

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]

 

মন্তব্য