kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

দিল্লির চিঠি

হীনম্মন্যতার শিকার হয়নি ভারত

জয়ন্ত ঘোষাল

৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



হীনম্মন্যতার শিকার হয়নি ভারত

সিকিমের সীমান্তে নাথুলাপাস খুলে দেওয়া হলো। প্রধানমন্ত্রী তখন মনমোহন সিং। ২০০৬ সালে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করল সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী। চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করা হলো সীমান্ত। সিকিমের ওপর নিজেদের অধিকার চীন প্রত্যাহার করে যখন ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ভারতের মানচিত্রে সিকিমের অন্তর্ভুক্তি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। কিন্তু চীন তখন থেকেই ভারতকে বলছে নাথুলাপাস দিয়ে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য হোক। যেদিন সিকিমের এই অবাধ বাণিজ্যের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠান হলো, সেদিন আমন্ত্রিত হলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যাননি। সিকিমের মুখ্যমন্ত্রীকে সামনে রেখে তা ছিল কেন্দ্রেরই অনুষ্ঠান।

তখন মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে বুদ্ধদেব বাবুর সম্পর্ক খুবই ভালো। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আর্থিক সংস্কার ও শিল্পায়নের দর্শনের জন্য শুধু দেশ নয়, বিদেশের পত্রপত্রিকায়ও তাঁকে ভারতের সংস্কারবাদী দেং জিয়াও পিং বলে অভিহিত করা হচ্ছে। মনমোহন সিং নিজে সংসদে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুখ্যমন্ত্রী বলে অভিহিত করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সার্টিফিকেট, তা-ও আবার কোনো অকংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রীর জন্য। তা কিন্তু যে সে ব্যাপার নয়।

এ রকম এক পটভূমিতে মনমোহন নিজে বুদ্ধবাবুকে সেদিনের আনুষ্ঠানে সিকিমে থাকার জন্য অনুরোধ করেন। বুদ্ধবাবু কিন্তু সে প্রস্তাবে রাজি হননি। বিনীতভাবে তিনি তাঁর অপারগতা জানাতে দিল্লি এসে মনমোহনের সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করলেন। বুদ্ধবাবু না গেলেও কোনো প্রতিনিধি মন্ত্রীকে অনুষ্ঠানে থাকার জন্য চাপ ছিল। কিন্তু যত দূর মনে পড়ছে বুদ্ধবাবু সেদিন ওই অনুষ্ঠানে রাজ্য সরকারের কোনো প্রতিনিধিও পাঠাননি। বুদ্ধবাবুর সব কথা শুনে মনমোহন অবশ্য তাঁকে বলেন, ‘আপনার যুক্তি অকাট্য। চিন্তা করবেন না। নাথুলাপাস খোলাটা প্রতীকী পদক্ষেপ। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য এটি করা হচ্ছে; কিন্তু সীমান্তে কড়া প্রহরার ব্যবস্থা করছি। চীনকে ওখান থেকে ডাম্পিং করতে দেব না।’ বুদ্ধবাবু মনমোহনকে বিশ্বাস করতেন।

আরেকটি ঘটনা। তখন ভারতের বিভিন্ন সমুদ্রবন্দরের আধুনিকীকরণ বেসরকারীকরণ নিয়ে সরকারের শীর্ষ স্তরে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। এই কাজগুলো পাওয়ার জন্য বেশ কিছু চীনা কম্পানি ভারত সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছে। চীন সরকারও এসব কম্পানির বরাত পাওয়ার জন্য জোরদার লবি করছিল। চীন দেশে তো বেসরকারি সংস্থাগুলোও আসলে রাষ্ট্রেরই নিয়ন্ত্রণে। বহু বেসরকারি শিল্পপতি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। তখন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রজেশ মিশ্র আর উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদভানি। দুজনের মধ্যে মতপার্থক্য যতই থাক না কেন, চীনের এই আর্থিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দুজনেই একমত ছিলেন। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে মন্ত্রিসভার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটির বৈঠকে এই চীনা বরাত আটকে দেওয়া হয়। মন্ত্রিসভার এই কমিটির আরেক সদস্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেজও চীনের প্রকাশ্য সমালোচক ছিলেন। অটল বিহারি বাজপেয়ির জমানায় চীন ছাড়পত্র পায়নি। এরপর মনমোহন সিং যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন চীন নতুন করে উদ্যোগ নেয়। চীনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাটের সম্পর্ক খুব ভালো ছিল। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ‘বন্ধুত্ব’ও কোনো গোপন বিষয় নয়। রাষ্ট্রদূত বুদ্ধবাবু ও প্রকাশ কারাটকে এ রকম একটা সময়ে এক নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান। একেবারে চীনা সরকারের নেমব্লেম দেওয়া নৈশভোজের আমন্ত্রণপত্র এলো বুদ্ধবাবু ও প্রকাশ কারাটের কাছে। কারাট বুদ্ধবাবুকে বলেন, নৈশভোজের আমন্ত্রণ রক্ষা করাটা উচিত। না যাওয়া অভব্যতা হবে। আর নৈশভোজ তো নৈশভোজ। কোনো আনুষ্ঠানিক এজেন্ডা বা রাজনৈতিক আলোচনারও অবকাশ নেই। এত এক্সচেঞ্জ অব আইডিয়া। বুদ্ধবাবু রাজি হলেন। রাজ্য সরকারের সাদা অ্যাম্বাসাডর গাড়িতে সেদিন দুজনে চলে গেলেন চীনা দূতাবাসে। সেদিন চীনা রাষ্ট্রদূত নৈশভোজে কথায় কথায় বুদ্ধবাবুকে অনুরোধ করেন, যাতে তিনি মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে এই বন্দরের বরাত নিয়ে কথা বলেন। চীনারা কাজটা ভালো করতে পারবে আর এতে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কটাও আরো ভালো হবে। অটল বিহারি বাজপেয়ির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা যেভাবে এই বরাতের বিরোধিতা করেন, মনমোহন জমানায় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা আর কে নারায়ণনও একইভাবে এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন। মনমোহনের সঙ্গে বুদ্ধবাবুর সম্পর্ক মধুর বলেই তাঁরা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে এই প্রকল্পের সবুজসংকেতের জন্য ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। বুদ্ধবাবু কিন্তু সেদিন রাষ্ট্রদূতের মুখের ওপরই বলে দেন, ‘কমরেড, জাতীয় নিরাপত্তাটা রাজ্য সরকারের বিষয় নয়। এটা কেন্দ্রের ব্যাপার। আর নিরাপত্তা খুবই সংবেদনশীল বিষয়। আমি একজন মুখ্যমন্ত্রী হয়ে কখনোই এসব ব্যাপারে নাক গলাতে পারি না।’

সম্ভবত ১৯৪৯ সালে সমাজতন্ত্রী চীন গঠনের সময় থেকেই ভারতের ভেতরে ঢোকার রণকৌশল একই রকম থেকে গেছে। মাও জেদং থেকে দেং-জিয়াও পিং চীনের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক বিরাট রূপান্তর হয়। কিন্তু দেংয়ের জমানায়ও ভারতের ব্যাপারে চীনা রাষ্ট্রনীতি বদলায়নি। দেং অবশ্য সীমান্তে হানার চেয়ে বেশি জোর দেন ভারতের বাজারে চীনা সম্প্রসারণে। সাদা বাংলায় বলা যায়, চীন ভারতের বাজার দখলে একইভাবে আক্রমণাত্মক। সেকাল থেকে একাল।

একে অনেক বিশেষজ্ঞ নাম দিয়েছেন  The China Syndrome. ভারত আর চীনের মধ্যে এই টেনশন আর সাম্প্রতিক আকসাই চীন ও তারপর লাদাখ কাণ্ডের পর আরো তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ২০১২ সালে ভারতীয় গোয়েন্দারা রিপোর্ট দেয়, চীন ভারতে আক্রমণ হানতে পারে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে ভারতীয় সেনাও সীমান্তে আক্রমণাত্মক ভারতীয় ফরোয়ার্ড নীতি গ্রহণ করে। চীন তখন জানিয়েছিল ভারত  ‘China-will-attack-India’ লাইন নিয়ে আসলে নিজেদের সেনাবাহিনী সীমান্তে বাড়াতে চাইছে। এ হলো এক ধরনের ‘প্রিটেকস্ট’। তখন আক্রমণ না হলেও দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস-অনাস্থা ক্রমে বাড়তেই থাকে।

বারাক ওবামা তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনিও চীনের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক ভালো করতে সচেষ্ট হন। এমন একটা সময়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চল এলাকা বিশেষত অরুণাচল প্রদেশের উন্নতির জন্য এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে ভারত ঋণ চায়; কিন্তু যেহেতু চীন অরুণাচল প্রদেশকে ভারতের অঙ্গরাজ্য বলতে মানতে নারাজ, তাই এ ব্যাপারে তারা আপত্তি তোলে। সে সময়ে কূটনৈতিক ধারণা ছিল, ওবামার চীনের প্রতি নরম মনোভাবের জন্য এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ভারতকে সেবার অর্থ দিতে রাজি হলো না। আমেরিকা-প্যাসিফিক ফ্লিট কমান্ডারকে চীন জানায়, ভারত মহাসাগরকে চীন প্রভাবিত এলাকা হিসেবে মেনে নেওয়া প্রয়োজন। ভারতের মনোভাব হলো নামটা ভারত মহাসাগর বলে এই এলাকা যেন ভারতের নিয়ন্ত্রণে। ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তিতে চীনের আপত্তি ছিল। পরমাণু সরবরাহ গোষ্ঠী  (NSG)-তে চীনের আপত্তি নথিভুক্ত হয়। এরপর ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে মুম্বাইয়ে যে পাকি সন্ত্রাসের ভয়াবহ ঘটনা হয়, ভারতীয় গোয়েন্দাদের ধারণা ছিল এ ঘটনার পেছনেও ছিল চীন।

এই কারণে চীন যে ভারতে সীমানায় ঢুকে আক্রমণ হানতে পারে তা অনেক দিন থেকেই ভারতীয় গোয়েন্দারা মনে করছেন এবং অ্যালার্ম দিচ্ছেন। ২০০৯ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অরুণাচল প্রদেশ সফরে যান বলেও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে চীন। এবং তারপর অরুণাচল সীমানা দিয়ে তারা তখনো চীনা সেনার অনুপ্রবেশ ঘটায়।

ভারত-জাপান আঁতাত ও ভারতকে এই এলাকায় চীনের বিরুদ্ধে ভারসাম্য রচনার জন্য ব্যবহার করার মার্কিন কৌশল—এসবেও চীন ক্ষিপ্ত হয়। যে চীনকে একদিন নেহরু নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য করানোর জন্য নিজেদের মানে ভারতের দাবি উত্থাপন করা থেকে সরে আসে সেই চীন আজ ভারত আর জাপানের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হওয়ার ঘোরতর বিরোধিতা করছে।

২০০৭ সালে দ্য সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সির  (CIA) ভারত-চীন সংক্রান্ত কিছু রিপোর্ট ‘ডি ক্লাসিফায়েড’ হয়। এই রিপোর্টটির নাম ছিল, ‘ফ্যামিলি জুয়েলস’। এই রিপোর্টে বলা হয়, ’৬২ সালে নেহরু গোটা বিশ্বের কাছে ভারতকে যেভাবে তুলে ধরেছিলেন এক সফল রাষ্ট্রনেতা হিসেবে; শুধু সীমান্ত সমস্যা নয়, নেহরুর ভাবমূর্তিকে দুনিয়ার সামনে হেয় করাও ছিল এক বড় উদ্দেশ্য। সিআইয়ের রিপোর্টে বলা হয়,  “The Chinese aim was not only to demolish Nehru’s rising stature in the developing world but also to make sure that India’s rise as challanger to Chinese primacy in the region was ripped in the bud.”

এই রিপোর্টে আরো লেখা আছে, চীন কৌশল নেয়, নেহরু আসলে আমেরিকার বন্ধু, ভারতীয় কমিউনিস্টদের দিয়ে এই প্রচার গড়ে তোলা।

আজ এত বছর পর মনে হচ্ছে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিই হলো প্রকৃতির আইন। মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১৪ সাল থেকে পৃথিবীর সামনে ভারতকে মাথা তুলে দাঁড় করানোর চেষ্টা যে করেন এ ব্যাপারে তো কোনো সন্দেহ নেই, চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করলেও তিনি হিন্দি-চীনি ভাই-ভাই রোমান্সে বিগলিত হয়ে যাননি। চীনের হ্যাঁ-তে সর্বদা হ্যাঁ মেলাতে রাজি হননি। এত দিন চীন যুদ্ধ না করলেও বারবার অনুপ্রবেশ করে নিজেদের সার্বভৌম স্বার্থের হুংকার দিয়ে স্নায়ুর চাপ তৈরি করত। চেষ্টা ছিল, মোদির নেতৃত্বে ভারতের উত্থানকে আবার দুনিয়ার সামনে মসিলিপ্ত করা। এ যাত্রা চীন সফল না হলেও আবার যে আক্রমণ হবে না তা কেউ বলতে পারে না। এবার ভারতীয় সেনাবাহিনী তার যোগ্য জবাব দিতে সচেষ্ট হয়েছে। হীনম্মন্যতার শিকার হয়নি ভারত।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা