kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

এই সময়

রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ

তারেক শামসুর রেহমান

৩ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ

সারা বিশ্ব যখন করোনাভাইরাস মহামারি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত, ঠিক তখনই রোহিঙ্গাদের নিয়ে বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। করোনাভাইরাসের কারণে চাপা পড়ে গেছে রোহিঙ্গা সমস্যাটি। ২৬ জুনের একটি খবর—২৬৯ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে একটি নৌকা মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করতে চাইলে মালয়েশিয়ার কোস্ট গার্ড তাদের বাধা দেয়। একই প্রক্রিয়ায় অন্য একটি নৌকা ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের সমুদ্রসীমায় প্রবেশ করে সমুদ্রে এক মাসের বেশি সময় অপেক্ষার পর ইন্দোনেশিয়ার জেলেরা তাদের উদ্ধার করে। প্রায় একই সময় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মুহিউদ্দিন ইয়াসিন আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর নেতাদের এক টেলি সম্মেলনে সাগরে ভাসা রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করতে বাংলাদেশকে আহ্বান জানান, যা বাংলাদেশ প্রত্যাখ্যান করে। ওই টেলি কনফারেন্সে মিয়ানমারের প্রতিনিধিও অংশ নেন। আলজাজিরা জানায়, মিয়ানমারের প্রতিনিধি আবারও জানান রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নন, রাখাইনে বসবাস করার তাদের কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। আলজাজিরা ২৬ জুনের আরেকটি প্রতিবেদনে আমাদের জানিয়েছে, রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ২০০ রোহিঙ্গা বসতি পুড়িয়ে দিয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়েছে রাখাইন ত্যাগ করতে। আরেকটি খবরে দেখা গেছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তিনজন সেনা সদস্যকে রাখাইনের ঘটনাবলির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কোর্ট মার্শাল করে শাস্তি দিয়েছে, যদিও তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতির যখন আরো অবনতি ঘটেছে, তখন গত ২৯ জুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর সঙ্গে ফোনে আলাপ করেছেন। ওই ফোনালাপে তিনি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসনে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় ভূমিকা প্রত্যাশা করেছেন।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে প্রকাশিত এসব ঘটনা কতগুলো প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। এক. গেল ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত এক সিদ্ধান্তে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অত্যাচারের নিন্দা জানানো হয়েছিল (নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৮ ডিসেম্বর)। কিন্তু নতুন করে বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে মিয়ানমার সাধারণ পরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্তকে আদৌ কোনো গুরুত্ব দেয়নি। দুই. রোহিঙ্গা সংকট একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। আর তা হলো তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া। রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে মিয়ানমার বারবার বলে আসছে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়। সর্বশেষ আসিয়ান নেতাদের টেলি সম্মেলনেও মিয়ানমারের প্রতিনিধি একই কথা বলেছেন। এর অর্থ, সারা বিশ্বের মতামতের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রশ্নে তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। তিন. মিয়ানমারের কৌশল হচ্ছে, রাখাইনকে রোহিঙ্গামুক্ত করা। রোহিঙ্গা বাড়িঘরের কোনো অস্তিত্ব নেই। তাদের জমি এখন চীন ও জাপানি বিনিয়োগকারীদের দেওয়া হয়েছে। রাখাইনে চীন একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে (kyaukphyu), যেখান থেকে দেশটি বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর নজর রাখতে পারে। এখানে চীনের স্বার্থ অনেক বেশি। সুতরাং চীন কখনোই মিয়ানমারের স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেবে না। রোহিঙ্গামুক্ত রাখাইনে চীন তার স্বার্থকে বড় করে দেখছে। চার. গেল ফেব্রুয়ারি মাসে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছিল। তাতে রোহিঙ্গা নিপীড়ন বন্ধ, কোনো সামরিক ব্যবস্থা না নেওয়া, আলামত নষ্ট না করা, আদালতে চার মাস অন্তর প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। আদালতের আদেশ মিয়ানমার মানছে না। তিনজন সেনা সদস্যের বিচার লোক-দেখানো। আইসিজের আদেশ মিয়ানমারকে বাধ্য করেনি রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে এবং তারা নেবেও না। পাঁচ. আসিয়ান শীর্ষ টেলি কনফারেন্সে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান না হলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য রিক্রুট করবে। এ ধরনের আশঙ্কাকে ফেলে দেওয়া যায় না। এতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ছয়. রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ছে এবং মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এ ঘটনা বাংলাদেশের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় এই সুযোগ নিয়েছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি এখন ‘ডিপ ফ্রিজে’ চলে গেছে। মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা ছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যার কোনো সমাধান হবে না।

 

 লেখক : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা