kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ শ্রাবণ ১৪২৭। ৭ আগস্ট  ২০২০। ১৬ জিলহজ ১৪৪১

মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা ও সমৃদ্ধি ধরে রাখার উপায়

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

২ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা ও সমৃদ্ধি ধরে রাখার উপায়

কভিড-১৯-কে কেন্দ্র করে পৃথিবী এখন মস্তবড় সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। কবে এর অবসান হবে কেউ জানে না। তবে করোনাভাইরাসের সঙ্গে বিশ্বের সর্বত্র মানুষকে আরো দীর্ঘদিন বসবাস যেমন করতে হবে, তেমনি অস্তিত্বের সংকট নিরসন করেই টিকে থাকতে হবে। বলা চলে, পৃথিবীব্যাপী করোনাভাইরাসের কারণে নতুন এক ব্যবস্থায় মানুষকে অভ্যস্ত হতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

আমাদের বুদ্ধিমান মানব তথা হোমো সেপিয়েন্স হিসেবে অভিহিত করা হয়। প্রায় ৭০ হাজার বছর আগে হোমো সেপিয়েন্সরা বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব সাধন করেছে। এক ধরনের শিক্ষা নিয়েই মানুষ ইতিহাসের এই বিশাল পর্ব পাড়ি দিয়েছে। সভ্যতায় উত্তরণের পরও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, নানা রকম জটিল রোগ ইত্যাদি তাদের নিত্যসঙ্গী ছিল। তবে এসবকে অতিক্রম করার জন্য স্থান ও গোত্র ভেদে নানা ধরনের প্রতিষেধক ও ভেষজ ওষুধ, শল্যচিকিৎসা উদ্ভাবন করতে শুরু করে। এভাবেই বলা চলে সভ্যতার নতুন ব্যবস্থায় উত্তরণের কিছুকাল আগে থেকে মানুষ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বুদ্ধি ও মেধার চর্চা থেকেই এসব প্রতিষেধক উদ্ভাবন করে। তবে এগুলো খুব ব্যাপকভাবে সমাজে প্রসারিত করার কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না, পৃষ্ঠপোষকতাও ছিল না। ফলে মানুষের চিকিৎসার অভাব প্রকট ছিল, মহামারিতে জনসংখ্যা প্রায়ই কমে যেত। বলা চলে, প্রাচীন যুগের শেষ ও মধ্যযুগে এসে কিছু চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবিত হলেও সেগুলো খুব বেশি জনগণের নাগালের মধ্যে দেওয়ার সুযোগ ছিল না। এর বাইরেও জীবনযাপনের অনেক বিষয় মানুষের জানা ছিল না।

মানুষ প্রয়োজনের তাগিদেই থাকার ব্যবস্থা, রান্নাবান্না, সীমিত কাপড়চোপড়, কিছু হাতিয়ার, গৃহস্থালি পণ্যসামগ্রী উৎপাদন করত। এসবই সম্ভব হয়েছে অপেক্ষাকৃত নতুন ব্যবস্থায় উন্নীত হওয়ার মাধ্যমে। এই সময় মানুষ অনানুষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ধারা কোথাও কোথাও শুরু করতে সক্ষম হয়। যেমন—গ্রিস, রোমসহ এই অঞ্চলের কিছু সভ্যতা শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের মেধা ও মননের বিকাশ সাধনের পথ উন্মোচন করে। আগে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে মানুষ যা শিখত ও বুঝত কয়েক হাজার বছরে সেটি শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে অল্প সময়ে অনেকের মধ্যেই বিকশিত করার সুযোগ করে দেওয়া হলো। এ পথেই মানুষ উন্নতি ও সমৃদ্ধির ধারায় অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পায়। তার পরও জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা দ্রুতগতিতে অগ্রসর হওয়ার পথে নানা ধরনের বাধা ছিল। মধ্যযুগ পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও মহামারি রোধ করা যায়নি। প্লেগ, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, হলুদজ্বর, ডায়রিয়া ইত্যাদির কোনো চিকিৎসা মানুষের জানা ছিল না। সে কারণে অসংখ্য মানুষ এসব মহামারিতে মৃত্যুবরণ করেছিল। ১৩৪৬-৫৪ সালে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে প্লেগ রোগে প্রায় ২০ কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৮-২০ সালে স্প্যানিশ ফ্লুতে পাঁচ কোটির বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করে, ৫০ কোটির বেশি মানুষ এই ফ্লুতে আক্রান্ত ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী নতুন ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। ১৫০টির মতো দেশ স্বাধীন হয়। পৃৃথিবীতে জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসা বেশ দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকে। এর পরও ২০ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত মানুষ পয়ঃপ্রণালি, মহামারি, স্বাস্থ্যসম্মত জীবন ইত্যাদি আশাব্যঞ্জকভাবে ব্যবহার করতে শেখেনি।

আমাদের দেশের আশির দশকে আমরা কলেরা, ডায়রিয়া ইত্যাদির চিকিৎসায় অভ্যস্ত হতে শুরু করি, অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে থাকি। এই সময়ে এসে আমরা স্যানিটারি ল্যাট্রিন ধারণার সঙ্গে গ্রামগঞ্জে পরিচিত হতে থাকি। এখনো পৃথিবীর অনেক দেশ স্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষার এসব বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত নয়। আশির দশকে এইচআইভি ভাইরাস সংক্রমণের পর আমরা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ প্রতি রোগী অনুযায়ী দেওয়ার কথা শিখেছি। এর আগে এটি আমাদের ডাক্তারদেরও জানা ছিল না। কিন্তু এইচআইভির পর চিকিৎসাব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন শুরু হয়।

সম্প্রতি বেশ কিছু ভাইরাস মানুষকে যেভাবে সংক্রমিত করছে তাতে মানুষের পুরনো ধ্যান-ধারণা, সামাজিক শিষ্টাচার, আচার-আচরণ, বিশ্বাস ও বোধ আর গ্রহণযোগ্য নয় বলে বৈজ্ঞানিকভাবে ধারণা প্রদান করছেন। সেখান থেকেই এবার করোনাভাইরাসের কারণে আমরা এখন মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস, পিপিই, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান, হাত ধোয়া, কোলাকুলি না করা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা ইত্যাদি নানা ধারণার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি। দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে মানুষ এসবের অনেক কিছুই বিশ্বাস করতে পারছে না, আবার অভ্যস্তও হতে পারছে না। কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞান বলছে, এসব ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার কোনো উপায় নেই। সুতরাং নির্ধিদ্বায় বলা যায়, মানুষকে অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত শিখতে হবে এবং জীবন-জীবিকার সঙ্গে একাত্ম থাকতে হবে। সেটি করতে হলে মানুষকে নতুন ব্যবস্থা সৃষ্টি করতে হবে, পুরনো অকার্যকর ব্যবস্থা ত্যাগ করতে হবে। সেখান থেকেই লোক সমাবেশ এড়িয়ে চলা, ঘরে বসে অনলাইন পদ্ধতিতে কাজ করার শিক্ষায় শিক্ষিত হতেই হবে। মানুষকে এখন দ্রুতই সর্বত্র আগের সমাগম এড়িয়ে সীমিত পর‌্যায়ে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে কাজ করার শিক্ষা নিতে হবে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, প্রশাসনব্যবস্থা, উৎপাদন, বিপণন, বাজারজাতকরণ, যোগাযোগব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইত্যাদিকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব শাখায়ই ব্যাপকভাবে পঠন-পাঠন, শিখন, গবেষণা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনের প্রক্রিয়ায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে যুক্ত হতেই হবে। মানুষের অস্তিত্বের সংকট অতিক্রম করে যে অর্থনৈতিক উন্নতি বিগত বছরগুলোতে সাধন করা সম্ভব হয়েছে সেটিকে সামাজিক, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সমৃদ্ধিতে এগিয়ে নেওয়া তখনই সম্ভব হবে, যখন আমরা মানুষের অস্তিত্বের সংকট জড়িয়ে রয়েছে এমন সব ব্যাধি, মহামারি, পশ্চাৎপদতা, অনগ্রসরতা, অনভিজ্ঞতা, কুসংস্কার, কুশিক্ষা, অশিক্ষা ইত্যাদি দূর করে নতুন ব্যবস্থার নতুন চিন্তাধারার মানুষ গড়ে তোলার পরিকল্পনায় সবাই একত্র হই; তাহলেই নতুন ব্যবস্থায় আমরা উন্নতি ও সমৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে পারব।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা