kalerkantho

শুক্রবার। ২৬ আষাঢ় ১৪২৭। ১০ জুলাই ২০২০। ১৮ জিলকদ ১৪৪১

জোনভিত্তিক লকডাউন ও সমন্বিত বাস্তবায়ন

ড. প্রণব কুমার পাণ্ডে

৩০ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



জোনভিত্তিক লকডাউন ও সমন্বিত বাস্তবায়ন

কভিড-১৯ মহামারি আকার ধারণ করেছে। অনেক উন্নত রাষ্ট্র এই মহামারি মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বছরের শুরুর দিকে কিছুটা কম ঝুঁকিপূর্ণ থাকলেও তিন মাস ধরে ব্যাপক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বাংলাদেশে ৮ মার্চ প্রথম কভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হলেও এর সংক্রমণের মাত্রা প্রায় দুই মাস নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকলেও গত এক মাসে এখন এটি ব্যাপক আকার ধারণ করছে। গত তিন সপ্তাহে শনাক্তের হার টেস্টের তুলনায় প্রায় ২০ থেকে ২৪ শতাংশ। ফলে রোগী সংক্রমণের সংখ্যা বিবেচনা করলে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে বাংলাদেশে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কভিড-১৯ সংক্রমণের পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। কভিড-১৯-এর সংক্রমণ প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকাসহ পাশের কয়েকটি জেলায় বেশি পুঞ্জীভূত থাকলেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন যে ঈদের ছুটির আগে মানুষের ব্যাপক ছোটাছুটি সারা দেশে কভিড-১৯-এর সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে যে দেশের অনেক জেলায় ব্যাপকসংখ্যক কভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং মানুষ মারা যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান রোগীর সংখ্যা বিবেচনা করে এই মরণঘাতী ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সরকার জোনভিত্তিক লকডাউন বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে।

কভিড-১৯ সংক্রমিত রোগীর সংখ্যার ওপর নির্ভর করে দেশের বিভিন্ন স্থানকে লাল, হলুদ ও সবুজ—এই তিনটি জোনে বিভক্ত করা হয়েছে আবার লকডাউন বাস্তবায়ন করার জন্য। সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক যেকোনো স্থানে শেষ ১৪ দিনে প্রতি এক লাখ জনসংখ্যায় ৬০ বা তার বেশি রোগী শনাক্ত হলে সেই অঞ্চলকে লাল জোন হিসেবে বিবেচনা করে লকডাউন কার্যকর করা হবে। তবে একই সময়ে এবং একই জনসংখ্যায় যদি ৩ থেকে ৫৯ রোগী শনাক্ত হয়, তাহলে সেই অঞ্চলকে হলুদ জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। এই নির্দেশনার আলোকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রোগীদের সংখ্যা বিবেচনায় পুরো দেশকে বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লাল জোনে লকডাউন কার্যকর করার সরকারের সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের নাটকীয়তা এরই মধ্যে দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে।

সরকার প্রথমে ঢাকার পূর্ব রাজাবাজারকে লাল জোন হিসেবে চিহ্নিত করে লকডাউন কার্যকর করে। এই একটি মাত্র স্থানে লকডাউন করার মূল কারণ ছিল, এখান থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করে দেশব্যাপী লাল জোনে লকডাউন কার্যকর করা। এই পরিপ্রেক্ষিতে এই লকডাউন কার্যকর করার দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে। সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ অন্যান্য বিভাগের সহায়তায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন কভিড-১৯-এর বিস্তার মোকাবেলায় লকডাউন বাস্তবায়ন করেছে। দুর্ভাগ্যক্রমে লকডাউন বাস্তবায়নকালে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাজাবাজার এলাকায় লকডাউন কার্যকর করার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতির মধ্যে ছিল লকডাউন চলাকালে সাহায্য প্রয়োজন—এমন পরিবারের একটি তালিকা প্রস্তুত করা, কভিড-১৯-এর উপসর্গ আছে—এমন রোগীদের কভিড-১৯ পরীক্ষার স্যাম্পল গ্রহণের স্থান নির্বাচন করা, মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য ভ্রাম্যমাণ দোকানের সংখ্যা নির্ধারণ করা এবং অন্যান্য সেবা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক নির্বাচন করা। তবে লাল জোনে বসবাসরত বেসরকারি খাতের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ক্ষেত্রে অফিসে যেতে হবে কি না সে সম্পর্কে সরকারি কোনো নির্দেশনা ছিল না।

ঢাকার পূর্ব রাজাবাজারে লকডাউন কার্যকর করার প্রথম দিকে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ এই অঞ্চলকে মডেল হিসেবে লকডাউন কার্যকর করে এখান থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চেয়েছিল, যাতে তারা অন্যান্য অঞ্চলে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সঠিকভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন করে কভিড-১৯-এর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

দেশব্যাপী জোনভিত্তিক লকডাউন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় উল্লেখ করা হয়েছে। সমন্বয়হীনতার একটি উদাহরণ হলো লাল ও হলুদ জোনে লকডাউনের সময় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রথমে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে দুই ঘণ্টার মধ্যে হলুদ জোনে ছুটি বাতিল করে আবার প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই ধরনের সিদ্ধান্ত স্পষ্টই ইঙ্গিত দেয় যে দেশে কভিড-১৯ সম্পর্কিত বিষয়ে কাজ করা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের বিষয়টি। এমনকি আমরা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অদক্ষতার বিষয়ের দিকে আঙুল তুলতে দেখেছি। কারণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় লাল ও হলুদ জোনের যেসব অঞ্চলে লকডাউন কার্যকর করা হবে সেই এলাকার পরিবারগুলোর তালিকা প্রদান করতে ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের জোনভিত্তিক কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণের কৌশলের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ধারণা করা যেতে পারে সরকারের লকডাউন কার্যকর করার সরকারি নীতিগুলো সম্পর্কে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সুস্পষ্ট ধারণা নেই।

আমাদের বুঝতে হবে যে আমরা এপ্রিল ও মে মাসে যথাযথ লকডাউন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছি, যা সারা দেশে কভিড-১৯-এর বিস্তারকে আরো শক্তিশালী করেছে। এটা ঠিক যে এই সময়কালে সত্যিকার অর্থে সম্পূর্ণ লকডাউন বাস্তবায়ন করা সরকারের পক্ষে অনেকটা কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ একটি বিশাল সংখ্যার জনগণকে প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভর করে সংসার নির্বাহ করতে হয়। এই বাস্তব সত্যটি আমরা উপেক্ষা করতে পারি না যে সরকার অফিস, গার্মেন্টশিল্প এবং অন্য খাতগুলো আবার চালু করতে বাধ্য হয়েছে দরিদ্র মানুষের জীবিকা নির্বাহের বিষয়টি মাথায় রেখে। আবার এটাও সত্যি যে অনেক মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারি নির্দেশাবলি না মেনে যত্রতত্র ঘোরাঘুরি করেছে। এই সময় তাদের সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করে উদ্দেশ্যমূলক চলাচলের জন্য তেমন কোনো শাস্তি প্রদান করা হয়নি বিধায় এক ধরনের শৈথিল্য পরিলক্ষিত হয়েছে সর্বক্ষেত্রে।

পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লাল ও হলুদ অঞ্চলে সফলভাবে লকডাউন কার্যকর করার জন্য সরকারের উচিত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের সচেতনতার মাত্রা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কয়েক দিন আগে টেলিভিশনে একটি সংবাদে দেখলাম, একটি বিভাগের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক এবং একটি জেলার সিভিল সার্জন রোগীর সংখ্যার ভিত্তিতে অঞ্চলগুলোর সংজ্ঞা সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করছেন। কভিড-১৯ মোকাবেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের মধ্যে এ ধরনের ব্যাখ্যা কভিড-১৯ মোকাবেলার জন্য ভালো ফল বয়ে নিয়ে আসবে না।

বিশ্বব্যাপী গবেষক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্টে ধারণা করেছেন যে সাধারণভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এবং বিশেষত বাংলাদেশ ও ভারতে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে কভিড-১৯-এর সংক্রমণ শিখরে পৌঁছে যেতে পারে। এসব প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে শীত শুরুর আগে এই দেশগুলো যদি কভিড-১৯-এর সংক্রমণ রুখতে ব্যর্থ হয়, তবে এই ভাইরাসের মাধ্যমে অনেক মানুষ সংক্রমিত হতে পারে।

সুতরাং সরকারের উচিত জোনভিত্তিক লকডাউনের কৌশলটি কিছুটা হলেও বল প্রয়োগের মাধ্যমে কার্যকর করা। এই কার্যক্রমে কোনো কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের অনীহা বা অসহযোগিতা গ্রহণযোগ্য হবে না। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহামারি চলাকালে এই অবস্থার উন্নয়নে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। দুর্ভাগ্যক্রমে কিছু দায়িত্বত্বশীল কর্তৃপক্ষের ভুলের কারণে কভিড-১৯-এর অবস্থা দিন দিন মারাত্মক আকার ধারণ করছে। সরকার কভিড-১৯ সংক্রমণ রোধে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন যে আমরা আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় অতিবাহিত করছি। তবে আমরা অবশ্যই একদিন এই মহামারিটি কাটিয়ে উঠব। এই লক্ষ্য অর্জনে কয়েকটি নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং তাদের কার্যকর করা প্রয়োজন। আমরা যদি আবারও পুরো লকডাউন কার্যকর করতে ব্যর্থ হই, তবে আমাদের সামনে আরো কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।

 

লেখক : অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা