kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

করোনায় তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার প্রয়োজন

ড. মো. সিরাজুল ইসলাম

২৯ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনায় তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার প্রয়োজন

করোনা মহামারি আরো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, বিজ্ঞানী মহলে এই ফিসফাস অনেক আগে থেকেই চলছিল। এটা ‘সারস’, ‘মারস’-এর চেয়েও ভয়ানক। কম করে হলেও এই ডিসেম্বরের আগে কোনো ‘টিকা’র সম্ভাবনা নেই। অতঃপর এর কার্যকারিতা বাস্তবে অবলোকন করা, আর সঙ্গে সঙ্গে সারা পৃথিবীর জন্য সাত বিলিয়ন ‘টিকা’ তৈরি! আরো এক বছর সর্বনিম্ন। এরই মধ্যে ওষুধ আবিষ্কার করতে পারলে ভালো। তবে এটি নির্মূল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ভাইরাসটি অতি সংক্রামক আর বর্তমানের এই সংযুক্ত পৃথিবীতে, মানুষে মানুষে ব্যাপক যোগাযোগের ফলে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়াতেই থাকবে। প্রতিরোধক আর প্রতিষেধক যত শক্তিশালী হবে, তত এর তাণ্ডব কমতে থাকবে বা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে, তবে শেষ হবে না!

যা হোক, এই মুহূর্তে সমাধান ঘরে বসে থাকা। কিন্তু ঘরে বসে থাকলে তো আর দুনিয়া চলে না। ফলে এ সময়ে আরেকটি সমাধানের কথা আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে, আর তা হচ্ছে ‘ঘরে বসে কিভাবে কাজ করা যায়’। এ প্রসঙ্গে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ফলে আজকাল ঘরে বসেও অনেক কাজ করা সম্ভব হচ্ছে—এটা অফিস হোক আর বাজার করা হোক। স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় তথা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রেও এর ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে আজকাল। ফলে তথ্য-প্রযুক্তির এই নতুন ধারণাগুলোর ব্যবহারের মাধ্যমে, এই করোনাকালে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার কিছু উপায় আমাদের অবশ্যই খুঁজতে হবে।

আমাদের একান্ত সৌভাগ্য যে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডার একটি অন্যতম হচ্ছে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’, যা মূলত এই তথ্য-প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করেই রচিত। ‘ডিজিটালাইজেশন’ বা তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে সরকার এরই মধ্যে এর সফল বাস্তবায়নে যথেষ্ট অগ্রসর হতে সক্ষম হয়েছে, যা কিনা আমাদের জন্য এক চরম সৌভাগ্য। অন্যথায় এই করোনাকালে সম্ভবত আমাদের আরো অনেক বিপদে পড়তে হতো। এ প্রসঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এই করোনাকালে বিশেষভাবে নজর দেওয়া প্রয়োজন, যাতে অর্থনৈতিক কার্যাবলিকে মোটামুটি চাঙ্গা রাখা যায়।

তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে অফিস-আদালতে কাজ চালু রাখতে পারা তেমনি একটি বিশেষ প্রয়োজন। করোনা শুরু হওয়ার আগে থেকেই এ ধরনের কিছু ধারণা ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করছিল, যেমন—‘হোম অফিস’ বা বাড়ি থেকে কাজ করা। ‘গুগল’ অফিসের ধারণাটিও জনপ্রিয়, খোলা অফিস, কোনো নির্দিষ্ট স্থান নেই বসার। অফিস নিজের ল্যাপটপে, আর যোগাযোগ বেশির ভাগ সময় অনলাইন মিটিং বা ই-মেইলে। একইভাবে ‘হোম অফিস’-এর ধারণাটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে আসছিল যে অনেক ক্ষেত্রে অফিসে এসে কাজ করার চেয়ে একে বেশি কার্যকর মনে করা হচ্ছিল। ফলে অনেক বড় বড় কম্পানি তাদের ভাড়া করা বড় অফিস ছেড়ে দিয়ে, ছোট অফিসে এসে বেশির ভাগ কর্মচারীকে বাড়িতে বসে কাজ করার অনুমতি দিচ্ছিল। ভাড়া বাঁচল, একই সঙ্গে বাঁচল অফিসে আসা-যাওয়ার সময়। রাষ্ট্রের উপরি পাওনা, ট্রাফিক জ্যাম লাঘব। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে ঢাকায় কর্মরত একজন মধ্যমসারির সরকারি কর্মকর্তার গড়ে তাঁর অফিস চলাকালে প্রায় অর্ধেকই নাকি কেটে যায় মিটিংয়ে যোগ দিতে গিয়ে, এ অফিস থেকে ওই অফিসে দৌড়াতে দৌড়াতে আর ট্রাফিক জ্যামে আটকে থেকে। অবশ্য প্রাইভেট-পাবলিক সবার জন্যই এটি প্রযোজ্য। কোথাও মিটিংয়ে বেরিয়েছেন তো আজকের দিনটা শেষ! যদি আমাদের অফিসগুলো তাদের ভার্চুয়াল সুযোগ-সুবিধাগুলোর উন্নয়ন সাধন করত, তাহলে ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম কমে যেত অর্ধেক, আর সঙ্গে সঙ্গে বায়ুদূষণ।

করোনা অভিজ্ঞতার পর শিক্ষাক্ষেত্রেও একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আশা করা যাচ্ছে। সার্বিকভাবে বিশ্বব্যাপী এরই মধ্যে অনেক পরিবর্তন দৃশ্যমান। হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এত দিন গর্ব করে আসত তাদের বিশালায়তন লাইব্রেরি আর তাতে সারি সারি তাক করা দুষ্প্রাপ্য সব বইয়ের জন্য। আফসোসের বিষয়, অচিরেই প্রিন্ট বইয়ের ধারণা সম্ভবত বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। তার পরিবর্তে আসছে ই-বুক, ই-জার্নাল। আজকালকার ছেলে-মেয়েদের মোবাইল ফোনেই থাকে ডজনখানেক বইয়ের কপি।

অনলাইন কোর্স আর পাঠদান পদ্ধতিও এগোচ্ছিল তার আপন গতিতে। তবে এই করোনাকালে এর প্রয়োগ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রায় এক যুগ আগে থেকেই ‘গুগল ক্লাসরুম’ বা ‘ব্ল্যাকবোর্ড’ জাতীয় অনলাইন শিক্ষাদান প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। এ ধরনের নতুন নতুন আরো অনেক প্রযুক্তি আসছে প্রতিনিয়ত। আজকাল এর ব্যবহার দিনকে দিন বাড়ছে। এসবের ওপর ভিত্তি করে ‘কোর্স এরা’ বা ‘এডেক্স’-এর অনলাইন কোর্সগুলো এর মধ্যেই বেশ জনপ্রিয়। যুক্তরাষ্ট্রের দুই নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় ‘হার্ভার্ড’ আর ‘এমআইটি’ মিলে এই ‘এডেক্স’ প্রগ্রামটি চালু করেছে। এই করোনা উপলক্ষে ‘কোর্স এরা’ এর মধ্যেই অনেক কোর্সের ফি মওকুফ করে দিয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য।

শিল্পক্ষেত্রে রোবটের ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াও বেগবান হতে পারে। কেননা এই করোনাকালে মানুষের সংস্পর্শ যত এড়ানো যায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী আপনার দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সাহায্য করতে পারে উড়ন্ত ড্রোন। ড্রাইভারবিহীন গাড়ি তো এর মধ্যেই বাজারে এসে গেছে। উবার বেশ কয়েক দিন চালিয়েছিল, পরে অবশ্য বন্ধ করে দিয়েছে। তবে এই প্রযুক্তিগুলো পাইপলাইনে আছে। অনলাইন শপিং আরো দুই যুগ আগে থেকেই শুরু আর উন্নত বিশ্বে এরই মধ্যে এর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠে এসেছিল। খাবার থেকে শুরু করে ফার্নিচার—সব কিছুই আজকাল সেখানে অনলাইনে বেচাকেনা হয়। এই করোনাকালে তাই ‘অ্যামাজন’-এর আয় বেড়েছে বহুগুণ। করোনাকালে বাংলাদেশের মতো দেশেও তা বাড়ছে দিন দিন। অনলাইন ব্যাংকিং সেবাও প্রায় সব ব্যাংকই শুরু করে দিয়েছে। এর আরো প্রসার প্রয়োজন। আর তাহলে সকালবেলা উঠে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ব্যাংকগুলোর সামনে লম্বা লাইন অনেকটাই কমে যেত। সর্বোপরি সবচেয়ে বড় পাওনা হতে পারে ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম অনেকটাই কমে যাওয়া। এতে  শহরটি হয়তো ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যেত।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী এই অনলাইন সুযোগ-সুবিধাগুলোর ফলে পরিবেশের উন্নয়ন হতে পারে বিভিন্নভাবে। প্রথমত মানুষের চলাচল কম হওয়ায় প্রকৃতি কম বিরক্ত হবে, একই সঙ্গে গাড়ির ব্যবহার কমে যাওয়ার জন্য বায়ু ও শব্দদূষণ কমে যাবে বহুগুণ; দ্বিতীয়ত অফিস-আদালতের জায়গা বেঁচে যাওয়ায় জমির ওপর চাপ কমবে; তা ছাড়া অটমেশনের ফলে অনেক শিল্পে দূষণের পরিমাণ কমে যাবে। যেমন—এই করোনাকালে বলা হচ্ছে, মাত্র কয়েক মাসের লকডাউনে গ্রিনহাউস গ্যাস উদিগরণ প্রায় ৮ শতাংশ কমে গেছে এবং আরো কমছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশ্ব যেভাবে এগিয়ে চলছে, তাতে একসময় না একসময় এই প্রযুক্তিগুলো এমনিতেই আমাদের গ্রহণ করতে হতো। সার্বিকভাবে এটি পরিবেশবান্ধবও বটে। এই দুর্যোগে তাই সবার সুস্থতা কামনা করছি আর আশা করছি ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের লক্ষ্যে, অনলাইন প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনীতির দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব মহল সচেষ্ট হবে।

 

লেখক : অধ্যাপক, সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও পরিচালক, সেন্টার ফর ইনফ্রাস্ট্রাকচার রিসার্চ অ্যান্ড সার্ভিসেস, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা