kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

কভিড-১৯ বিজ্ঞানকে গতিশীল করেছে

জেনিফার ডৌডনা

২৭ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বহুকাল থেকে মানুষ রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে এসেছে। বিজ্ঞানে হয়তো কোনো বিষয় দীর্ঘদিন থেকেই চর্চার মধ্যে ছিল; কিন্তু ওই বিষয়টি যখন রোজকার জীবনের নিয়মিত অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে, তখন তা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তনের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

কভিড-১৯ আমাদের জীবনে যে পরিবর্তন এনেছে তার ক্ষেত্রেও এ কথাটি খাটে। জীবনের বহু কিছুর মতোই এই ভাইরাস বিজ্ঞান ও এর চর্চায়ও স্থায়ী পরিবর্তন এনেছে। বিজ্ঞানে পরিবর্তন এসেছে তিনভাবে—এর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা বেড়েছে, উদ্ভাবনগুলোর প্রকাশনা বাড়ছে এবং সহযোগিতা নিয়মতান্ত্রিক হচ্ছে ও বাড়ছে। কভিড-১৯ পরিস্থিতির পর বিজ্ঞান আর আগের অবস্থায় থাকবে না, আরো উন্নত হবে।

মহামারির কারণে মৌলিকভাবে পাল্টে যাচ্ছে বিজ্ঞান। তাত্ক্ষণিক উদ্ভাবন এবং ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির জন্য বিজ্ঞানে এখন যে বিনিয়োগ করা হচ্ছে তা বড় ধরনের স্বস্তি তৈরি করেছে সবার মধ্যে। বিষয়টি বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদেরও উৎসাহিত করবে। করোনাভাইরাসের জৈবিক কাঠামো, বিকাশ, প্রাণী দেহে অবস্থান, জেনেরিক গঠন এবং রোগের গতি-প্রকৃতি বোঝার জন্য মানুষের যে আগ্রহ, তা যথার্থ তথ্য জানার প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষাকেই প্রকাশ করে। অজ্ঞতা ও ভীতির স্থান যদি বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি দখল করে নিতে পারে, তাহলে মানুষের আচরণ ও সরকারি বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি এবং বড় ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাব আমরা।

বিজ্ঞানের প্রকাশনাও বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একবার এক বিজ্ঞানী আমাকে বলেছিলেন, প্রকাশিত না হলে বিজ্ঞানের কোনো অস্তিত্ব নেই। তাঁর যুক্তি ছিল, বিজ্ঞান চর্চার ফলাফল সাধারণ মানুষ এবং অবশ্যই অন্য বিজ্ঞানীদের আলোচনা, বিতর্ক ও পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল। এই প্রক্রিয়া উদ্ভাবনকে মানুষের কাছে সহজবদ্ধ করে তোলে এবং আরো উদ্ভাবনের উৎসাহ জোগায়।

পরিবর্তন এসেছে প্রকাশনা পদ্ধতিতেও। কয়েক মাস আগেও বিজ্ঞানভিত্তিক নিবন্ধগুলো প্রকাশ করা হতো বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনার পর। এতে সময় লেগে যেত। দেখা যায়, নতুন কিছু পাওয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ করতে বিজ্ঞানীদের মাসের পর মাস সময় লেগে গেছে। কিন্তু গত তিন মাসে এমন পরিস্থিতি আর নেই। উদ্ভাবনের সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে কভিড-১৯ সংক্রান্ত বিষয়গুলো দ্রুতই প্রকাশ পাচ্ছে। এতে সংকটও রয়েছে। এগুলো কোনো ধরনের পর্যালোচনা ছাড়াই প্রকাশ্যে আসছে। ফলে গবেষণার ভুলত্রুটিগুলো থেকেই যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব গবেষণাকে যথার্থ হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে, যা ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তবে পর্যালোচনার সুযোগ থাকলেই যে ঝুঁকি থাকে না—এমনটি নয়। সম্প্রতি হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন নিয়ে এমনই একটি ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেছে।

আরেকটি বিষয়েও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে—সহযোগিতা। গত কয়েক দশকে এমন নজির নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিজ্ঞানীরা এমন সুশৃঙ্খল, সহযোগিতাপূর্ণভাবে কাজ করেনি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত মার্চেই আমি এবং আমার সহকর্মীরা এই মহামারির জন্য ক্লিনিক্যাল টেস্টিং ল্যাব এবং ফাস্ট ট্র্যাক রিসার্চের জন্য শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানীদের সুবিশাল কনসোর্টিয়াম ‘ইনোভেট জেনোমিক্স ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠিত করেছি।

এই বৃহত্তর সহযোগিতা বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। চীন ও অস্ট্রেলিয়ার একটি গবেষক দল গত জানুয়ারিতে সার্স-কভ-২ ভাইরাসের জেনোম প্রকাশ করে। বিশ্বের যেকোনো স্থানের বিজ্ঞানীরা এখন এই জেনোম বিনা মূল্যে ব্যবহার করতে পারবেন। এখন গবেষণা চলছে পুরো বিশ্বে। এই গবেষণাই প্রয়োজনীয় টিকার কাছে আমাদের পৌঁছে দেবে।

দেড় শতাধিক মানুষের ওপর বেশ কয়েকটি টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হয়েছে। আরো কয়েক শ টিকা নিয়ে কাজ চলছে। এ ধরনের কাজ নজিরবিহীন। বিভিন্ন ওষুধ কম্পানি, হাসপাতাল, শিক্ষাবিদ ও সরকারি বিজ্ঞানীদের সহযোগিতার কারণে বিষয়টি সম্ভব হয়েছে। ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনের ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত টিকা সম্প্রতি মনটনায় ন্যাশনাল হেলথ ইনস্টিটিউট বানরের ওপর প্রয়োগ করেছে। অক্সফোর্ড তাদের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে আশাবাদী।

এ ধরনের সহযোগিতাকে উৎসাহিত করতে হবে। শুধু শিক্ষাবিদ ও কম্পানিগুলোর মধ্যেই নয়; বরং এই সহযোগিতা সম্প্রসারিত হতে হবে সীমান্তরেখা অতিক্রম করে। এ ক্ষেত্রে রাজনীতি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এমন ঝুঁকি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে তাদের সদস্যপদ ও তহবিল প্রত্যাহার করেছে। এ ধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গবেষণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

আমরা অবশ্যই একটি টিকা পাব, যা এই মহামারি পরিস্থিতিকে পাল্টে দেবে। নতুন একটি বিশ্ব পাব আমরা। পরিস্থিতি আমাদের দ্রুত গবেষণায় বাধ্য করেছে। তথ্য পাওয়া মাত্র আমরা তা প্রকাশ করছি। ভিন্ন পরিবেশ আর টাইমজোনের সঙ্গে কাজ করছি আমরা। মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বিজ্ঞানের এক নতুন যুগের সূচনা হচ্ছে।

লেখক : ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈবরসায়নবিদ

সূত্র : ইকোনমিস্ট

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা