kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

বাঁধ নিয়ে আবারও কি ভুলের দিকে!

গৌরাঙ্গ নন্দী

২৭ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাঁধ নিয়ে আবারও কি ভুলের দিকে!

বর্তমানে বাঁধ, বিশেষত উপকূলের নদীগুলোর বেড়িবাঁধ নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে বাঁধ উপচে, ভেঙে নোনা পানির তলায় বসতি ডুবেছে। ঝড়ে যে ক্ষতি হয়নি, পানি আটকে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। ফলে এখন একটাই কথা—বাঁধ চাই; মজবুত, টেকসই ও স্থায়ী। এ জন্য বিবিধ কর্মসূচিও পালিত হচ্ছে। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতের পরও এমনটি হয়েছিল।

প্র্রকৃতপক্ষে বেড়িবাঁধই কি উপকূলীয় অঞ্চলের সব কিছুর নিয়ন্তা? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যটির দিকে তাকাতে হয়। ১৯৬০-এর দশকে উপকূলীয় বাঁধ বা পোল্ডার ব্যবস্থা (কোস্টাল এমব্যাংকমেন্ট প্রজেক্ট—সিইপি) বাস্তবায়নের পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিবেশে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়ে। অবশ্য বাঁধের পর এখানে কৃষি, বিশেষত ধানের ফলন ভালো হয়েছিল। তবে নোনা ও স্বাদু পানির মিশ্রণে যে ব্রাকিশ ওয়াটার জোনটি ছিল, তা পাল্টে স্বাদু পানি কেন্দ্রিক পরিবেশ গড়ে ওঠে। পাশাপাশি এ অঞ্চলের নদ-নদী দিয়ে বয়ে যাওয়া ৩০ মিলিয়ন টন পলি নদী-খাল-নালা বেয়ে কৃষিজমিতে (বিল বা প্লাবনভূমি) যেতে না পেরে নদীর তলদেশে জমা হতে থাকে। নদীগুলোর বুক জমির চেয়ে উঁচু হয়ে যায়। কৃষিজমি পরিণত হয় জলাধারে। দেখা দেয় দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা। যশোর থেকে শুরু হয়ে ক্রমেই দক্ষিণের খুলনা ও সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হতে থাকে। উপরন্তু সুন্দরবনের মধ্যকার নদীগুলো ভরাট হয়ে যায়, অধিক লবণাক্ততা ও জলমগ্নতা দেখা দেয়।

আবার ১৯৮০-র দশকের শুরুতে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর ঋণের টাকায় শুরু হয় চিংড়ি চাষ। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের যুক্তিতে এ অঞ্চলের কৃষিজমিকে পরিণত করা হয় নোনা জলাধারে। নোনা ঠেকানোর জন্য দেওয়া বাঁধ কেটেই নোনা পানি আনা হয়। অন্যের জমিতে জোর করে নোনা পানি প্রবেশ করিয়ে চিংড়িঘের তৈরি হতে থাকে। অপহরণ, খুন, গুম, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ—সব কিছু সংঘটিত হয়েছে চিংড়ি চাষের শুরুর পর্বে। এর প্রতিক্রিয়ায় সমাজের প্রচলিত বন্ধন, সমাজকাঠামো ভেঙে পড়ে, সন্ত্রাস বেড়ে যায় এবং সাধারণ মানুষ দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হতে থাকে। আর গোটা এলাকার মাটি ও পানিতে লবণাক্ততা ভয়ংকর মাত্রায় বেড়ে যায়।

চিংড়ি চাষের উদ্যোগ-আয়োজন শুধু ব্যক্তি উদ্যোগ ছিল না। রাষ্ট্র তথা সরকারের তৃতীয় ও চতুর্থ মৎস্য প্রকল্পের আওতায় চিংড়ি চাষকে উৎসাহিত ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে পানি ব্যবস্থাপনার নামে বাঁধের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব আরোপ করা হয়। বাঁধে নতুন করে স্লুইস গেট তৈরি করা হয়। আর যথেচ্ছ কাটা, ছিদ্র করা, পাইপ প্রবেশ করানো—এসব তো ছিলই। যেখানে চিংড়ি মালিকদের কথাই শেষ কথা; সাধারণ মানুষ, অল্প বা সামান্য জমির মালিকরা নিঃশব্দ অনুসারী-ভুক্তভোগী মাত্র। আর পাউবোর (পানি উন্নয়ন বোর্ড) লোকেরা তাদের আজ্ঞাবহ অনুচরের মতো। বাঁধ ইচ্ছামতো কাটাছেঁড়া, নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা একমাত্র চিংড়ি চাষির। কারণ তারা দেশে ডলার আনে।

যদিও ১৯৫২ সালের ‘এমব্যাংকমেন্ট প্রটেকশন অ্যাক্ট’ অনুযায়ী বেড়িবাঁধ নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের দায়িত্ব পাউবোর; কিছু ক্ষেত্রে মামলা করেই পাউবো দায়িত্ব শেষ করে। অবশ্য করারও কিছু নেই। কারণ কাটাছেঁড়ার বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা সম্পর্কিত। পুলিশ অবৈধভাবে বাঁধ কাটা, ফুটো করা অথবা বাঁধের ক্ষতিসাধনের জন্য কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে না। কারণ তারা প্রভাবশালী। আর এই অপরাধের শাস্তি মাত্র কয়েক শ টাকা। এ কারণে কেউ বাঁধের ক্ষতি করাকে কোনো গুরুতর অপরাধ বলে বিবেচনা করে না।

বাঁধের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপের ফলেই আইলার আঘাতে বেড়িবাঁধ ভাঙে। কারণ বাঁধের ওপর যথেচ্ছ নিয়ন্ত্রণ করায় তা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বাঁধের ভেতর দিকে অতিরিক্ত লবণাক্ততার প্রভাবে মাটির স্বাভাবিক শক্তিও নষ্ট হয়ে যায়। আর বাঁধ রক্ষার জন্য বাঁধের বাইরে (নদীর পারে) যে ভূমি ছিল, দীর্ঘদিনের কাটাছেঁড়ায় তা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে নদীর পানির চাপ সরাসরি বাঁধের গায়ে আছড়ে পড়ে।

আইলার পর বিশ্বব্যাংকের টাকায় বলেশ্বরপারের শরণখোলায় আকারে বড়, চওড়া বাঁধ দেওয়া হয়েছে। খুলনার দাকোপের ৩২ নম্বর পোল্ডারেও (কামারখোলা ও সুতারখালী) ওই প্রকল্পের আওতায় বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এবারের ঝড়ে ওই এলাকাগুলো সুরক্ষিত ছিল। খুলনার কয়রা, সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলায় আইলার পরে বাঁধ তৈরি হয়নি; এবারের আম্ফানে এই এলাকাগুলোতেই ক্ষতি হয়েছে বেশি। বলাই বাহুল্য, কয়রা, আশাশুনি ও শ্যামনগরে ৪০ বছর ধরে চিংড়ির চাষ হয়। শুরুতে এলাকার বাইরের লোকেরা চিংড়ি চাষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে এলাকার মানুষ, প্রধানত যাঁরা বেশি জমির মালিক তাঁরাই চিংড়ি চাষ করেন। চিংড়ি চাষের মুনাফা তাঁরাই ঘরে তোলেন। অবশ্য দীর্ঘদিন নোনা পানির চর্চায় এই এলাকায় এখন চিংড়ি চাষ ছাড়া আর কিছু হওয়ার মতো পরিবেশ নেই, আবার অনেক এলাকায় চিংড়ির ফলনও ভালো হচ্ছে না।

আমরা আগেই বলেছি, পশ্চিম উপকূলে পোল্ডারব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে ভূমি ও ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়েছে। গাঙ্গেয় বদ্বীপের সক্রিয় এই অংশে ভূমি নিম্নগমনের হারও দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি। পোল্ডারব্যবস্থার আগে ভূমি নিম্নগমনের পাশাপাশি ভূমির ওপর নদীর পলি অবক্ষিপ্ত হয়ে ভারসাম্য বজায় রাখত, যা পোল্ডারব্যবস্থায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিটভূমি মূলত প্লাবনভূমি। পোল্ডারব্যবস্থার আগে এসব এলাকার বেশির ভাগ বিল এলাকা ছয় থেকে আট মাস পানিতে ডুবে থাকত। শুধু শুষ্ক মৌসুমে এখানে একটি ফসল ফলত। এসব পিটভূমিকে পোল্ডারে রূপান্তর করায় এর বৈশিষ্ট্য বদলের পাশাপাশি এলাকার প্রচলিত মৎস্যসম্পদ বিলীন হয়েছে। কোনো কোনো গ্রামে গাছপালা মরে গিয়ে মরুময় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই এলাকার ২৪ ও ২৫ নম্বর পোল্ডারের নদীগুলো মরে-শুকিয়ে প্লাবনভূমিকে জলাবদ্ধ করেছে। ১৯৯৫-৯৬ সাল থেকে ভবদহ অঞ্চলে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এবারকার বর্ষায় আবারও ভবদহ এলাকার মানুষের চোখের পানি, নাকের পানি একাকার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মনে রাখতে হবে, এই এলাকার পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পলি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি মুখ্য। জনগণ এবং জনপ্রিয় দাবি—বড়, টেকসই ও স্থায়ী বাঁধ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমরা যদি পলি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি ১৯৬০-এর দশকের মতো উপেক্ষা করি, তাহলে কিন্তু এই অঞ্চলের বসতি টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। আর আমরা নদীকে শাসন করে বশে আনার চিন্তা থেকে বাঁধ দিয়ে তাকে আটকে মেরে ফেলছি, যার প্রতিশোধ প্রকৃতি কিন্তু নিচ্ছে। ইতিহাস বলছে, স্থায়ী বাঁধ ব্যবস্থার অনেক আগেই এখানে বসতি গড়ে ওঠে, মানুষ কিন্তু তখন প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই চলত—জলোচ্ছ্বাস ও নোনা পানি রুখতে তারা অষ্টমাসী বাঁধ দিত। নদীকে বশে আনার কার্যক্রম এবং পলির বিষয়টি একদম উপেক্ষা করায়ই নতুন বিপত্তির শুরু। আমরা আবারও কি সেই ভুলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?

লেখক : সাংবাদিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা