kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

ষষ্ঠ মহাবিলুপ্তি, পরিবেশ পদভার ও আমাদের বেঁচে থাকা

বিধান চন্দ্র দাস

৬ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ষষ্ঠ মহাবিলুপ্তি, পরিবেশ পদভার ও আমাদের বেঁচে থাকা

গত বছর জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি দপ্তর থেকে জীববৈচিত্র্যের ষষ্ঠ মহাবিলুপ্তির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের জন্য ভূপৃষ্ঠের অবনয়ন ঘটছে, যার নেতিবাচক অভিঘাত পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জন্য অমঙ্গল বয়ে এনেছে। এই গ্রহটিকে ঠেলে দিয়েছে জীববৈচিত্র্যের ষষ্ঠ মহাবিলুপ্তির দিকে। ভূতাত্ত্বিক স্বল্প সময়ের ব্যবধানে অতীতে যখনই পৃথিবীর তিন-চতুর্থাংশ জীবকুল ধ্বংস হয়ে গেছে তখনই জীবকুলের মহাবিলুপ্তি ঘটেছে বলে ধরে নেওয়া হয়। পৃথিবীতে জীবসৃষ্টির পর থেকে এ পর্যন্ত মোট পাঁচবার জীবকুলের এ ধরনের পরিণতি হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এখনই উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে জীববৈচিত্র্যের ষষ্ঠ মহাবিলুপ্তি সম্পন্ন হবে। আর তাই বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টির জন্য জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি ও বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদ্যাপনের স্বাগতিক দেশ কলম্বিয়া যৌথভাবে এ বছর এই দিবসটির প্রতিপাদ্য করেছে ‘জীববৈচিত্র্য’।

পৃথিবীতে জীববৈচিত্র্যের সর্বশেষ অর্থাৎ পঞ্চম মহাবিলুপ্তি সংঘটিত হয়েছিল আনুমানিক ৬.৬ কোটি বছর আগে। সেই সময় পৃথিবীর তিন-চতুর্থাংশ জীবকুল ধ্বংস হয়েছিল। পঞ্চম সেই মহাবিলুপ্তিসহ আগের চারটি মহাবিলুপ্তি সংঘটিত হয়েছিল প্রাকৃতিক কারণে। বিশেষ করে ভূতাত্ত্বিক বিপর্যয়, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, হিমবাহ, জলবায়ু পরিবর্তন, উল্কাপাত, গ্রহাণু ও ধূমকেতুর আঘাত, সমুদ্রের পানিতে অক্সিজেনের অবস্থান্তর ইত্যাদি কারণে অতীতে জীবকুলের পাঁচটি মহাবিলুপ্তি সংঘটিত হয়েছিল।

প্রতিটি মহাবিলুপ্তির পর সময়ের ব্যবধানে পৃথিবীতে আবির্ভাব ঘটেছে নতুন প্রাণের। পঞ্চম মহাবিলুপ্তির সময় পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ডাইনোসর দল। সেই সুযোগে স্তন্যপায়ীরা নতুনভাবে বিবর্তিত ও বিকশিত হতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় আনুমানিক তিন লাখ বছর আগে সৃষ্টি হয় বর্তমান মানব প্রজাতি।

সৃষ্টির পর থেকেই মানুষ ধীরে ধীরে পৃথিবীর দখল নিতে থাকে। সময়ের ব্যবধানে জল, স্থল, অন্তরীক্ষে মানুষ তার প্রভুত্ব স্থাপনে অগ্রসর হয়। বনভূমি, প্রাণিকুল আর প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করে গড়ে তোলা হয় সভ্যতা। বিষ আর বর্জ্যে ভরে ফেলা হয় মাটি, পানি আর আকাশ। পরিবেশ পদভার (ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট: ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যে পরিমাণ বৈশ্বিক প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে) ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিনষ্ট হতে থাকে পরিবেশের ভারসাম্য। আর এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে থাকে জীবকুল।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপও বৃদ্ধি পায়। পৃথিবীর বর্তমান জনসংখ্যা সাত শ আশি কোটি। প্রথম শিল্পবিপ্লবের শুরুতে (অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি) এই সংখ্যা ছিল মাত্র আশি কোটি। জাতিসংঘের ওয়েবসাইট (জুন ২০১৯) অনুযায়ী ২০২১ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা দাঁড়াবে এক হাজার ৯০ কোটি। সন্দেহ নেই, জনসংখ্যা যত বাড়বে, জীববৈচিত্র্য তথা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর তত বেশি চাপ তৈরি হবে। পরিবেশ পদভার হবে ঊর্ধ্বমুখী।

বর্তমানে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ আমরা ব্যবহার করছি—সুস্থায়ীর হিসেবে তাতে প্রায় পৌনে দুই গুণ (১.৭) পৃথিবীর প্রয়োজন। শুধু জনসংখ্যা নয়, প্রাকৃতিক সম্পদের অসম ভোগও সংকট তৈরি করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নত ও অনুন্নত দেশে  পরিবেশ পদভারের মধ্যে প্রকট বৈষম্য আছে। আর এসবের অভিঘাত চূড়ান্তভাবে গিয়ে পড়ছে জীববৈচিত্র্যের ওপর। ফলে ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য।

বর্তমানে জীবপ্রজাতির বিদায় নেওয়ার হার—বিগত ১০ লাখ বছরের তুলনায় দশ থেকে এক শ গুণ বেশি। আগের মতো প্রাকৃতিক কোনো কারণ নয়—মানবসৃষ্ট কারণেই জীববৈচিত্র্য আজ ষষ্ঠ মহাবিলুপ্তির দ্বারে দাঁড়িয়ে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে পৃথিবীর বুক থেকে তিন-চতুর্থাংশ জীবকুল বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আর তেমনটি ঘটলে আমরাও পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব।

আমাদের বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের জোগান দেয় জীববৈচিত্র্য। পানি ও বাতাসকে করে বিশুদ্ধ। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও বর্জ্য পরিশোধনে জীববৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হ্রাসকরণেও জীববৈচিত্র্যের ভূমিকা অপরিসীম। ভারসাম্যময় পরিবেশের জন্য জীববৈচিত্র্য অপরিহার্য। কাজেই জীববৈচিত্র্য থাকা না থাকার ওপরেই নির্ভর করছে আমাদের বেঁচে থাকা।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের ভয়াবহতায় পরিবেশবিজ্ঞানীরা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব  দিয়ে আলোচনা করছেন। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি দপ্তর থেকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২০’ উপলক্ষে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে ‘জীববৈচিত্র্য  হ্রাস ও কভিড-১৯’ শিরোনামের একটি লেখায় বলা হয়েছে: কভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, মাুনষের স্বাস্থ্য ও পৃথিবী নামক গ্রহটির সুস্থতা একই সূত্রে বাঁধা। জীবের আবাসস্থল খণ্ড-বিখণ্ড হওয়া কিংবা নষ্ট হয়ে যাওয়া, অতি আহরণ, বন্য প্রাণীর বেআইনি ব্যবসা, দূষণ ও আগ্রাসী প্রজাতির আক্রমণে জীববৈচিত্র্য এখন গভীর সংকটে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।

ব্যক্তি পর্যায়ে কী ব্যবহার করব ও কতটুকু ব্যবহার করব—এই বিবেচনা জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গান্ধীজি একবার বলেছিলেন: ‘পৃথিবীতে যে সম্পদ আছে তা মানুষের জন্য যথেষ্ট, কিন্তু লোভীদের জন্য নয়।’ গান্ধীজির এই কথা এখন খুব বেশি প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলো যদি তাদের পরিবেশ পদভার লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস করতে পারে—তাহলে জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ অনেকটাই কমে যায়। আশা করা যায়, কভিড-১৯-উত্তর সময়ে উন্নত বিশ্ব বিষয়টি বিবেচনায় নেবে।

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গবেষক ও বিজ্ঞানীদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রজাতি শনাক্তকরণ, তাদের জীবনচক্র উদ্ঘাটন ও ব্যবহারসহ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের কলাকৌশল আবিষ্কার—গবেষক ও বিজ্ঞানীদেরই করতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বর্তমানে পৃথিবীতে বেঁচে থাকা সমগ্র জীববৈচিত্র্যের অতি অল্প অংশই আমরা চিনি ও জানি। কয়েক বছর আগের করা একটি হিসাবে দেখানো হয়েছে, বিশ্বে প্রায় ৮৭ লাখ জীব প্রজাতি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৬ লাখ প্রজাতি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

আসলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে শনাক্তকরণ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। যে প্রজাতিটিকে সংরক্ষণ করতে চাইছি তাকেসহ তার সঙ্গে বাস্তুতাত্তিক সম্পর্কযুক্ত অন্যান্য জীব প্রজাতিকেও চেনা প্রয়োজন। এই ধাপটিকে বাদ রেখে কোনো প্রজাতি বা প্রজাতিগুলোর সংরক্ষণ সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে উদ্ভিদ ও মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মোটামুটি সন্তোষজনক একটি তালিকা করা গেলেও অমেরুদণ্ডী প্রাণী, যারা সমগ্র জীববৈচিত্র্যের প্রায় সাড়ে সাতাত্তর শতাংশ—তাদের সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। সব থেকে বড় কথা, অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের অধিকাংশ গ্রুপের কোনো বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশে নেই। দেশে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মসূচিকে কার্যকরভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে এই শূন্যতা পূরণ করা দরকার। বিভাগভিত্তিক ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা ছাড়া বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্যের নিয়মিত জরিপ, শনাক্তকরণ, ভাউচার নমুনা সংরক্ষণসহ নানা ধরনের গবেষণা ও বিভিন্ন গ্রুপের বিশেষজ্ঞ তৈরি সম্ভব নয়। একমাত্র গবেষণার মাধ্যমেই হুমকিগ্রস্ত প্রজাতিকে আগাম চিহ্নিত ও সে অনুযায়ী সুপারিশ তৈরি করা সম্ভব। ষষ্ঠ মহাবিলুপ্তির হাত থেকে জীববৈচিত্র্যকে আমাদের বেঁচে থাকার জন্যই রক্ষা করতে হবে। 

লেখক: অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা