kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৩ আষাঢ় ১৪২৭। ৭ জুলাই ২০২০। ১৫ জিলকদ  ১৪৪১

টিকে থাকার বাজেটের অগ্রাধিকারসমূহ

ড. আতিউর রহমান

৫ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



টিকে থাকার বাজেটের অগ্রাধিকারসমূহ

পৃথিবীজুড়েই বইছে করোনার ঝড়। আগেও সংকট এসেছে। তবে এমন করে একসঙ্গে দুনিয়াজুড়ে আসেনি। বিগত কয়েক দশক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য নিরসনের যে সুফলগুলো আমরা পাচ্ছিলাম, মনে হয় একধাক্কায় সেসব ধুয়েমুছে যাচ্ছে। এই মহামারির টিকা বা উপযুক্ত ওষুধ বাস্তবে না পাওয়া পর্যন্ত মানুষের মন থেকে ভয় দূর হবে না। সরবরাহ ও চাহিদা—উভয় ক্ষেত্রেই সারা বিশ্বেই চোট লেগেছে। এই স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে ছোটখাটো ব্যবসায়ীসহ অনেক পরিশ্রমী মানুষই পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করতে দ্বিধান্বিত। অন্যদিকে মানুষ বিমানসহ সব পাবলিক পরিবহনে উঠতে ভয় পাচ্ছে, রেস্তোরাঁয় খেতে যেতে চাইছে না। দল বেঁধে আনন্দে তাদের অনীহা, পর্যটনে বের হতে চাইছে না, এমনকি ডাক্তারের কাছে যেতেও তাদের রাজ্যের ভয়। তাই করোনাকে পরাজিত করার আভাস না পাওয়া পর্যন্ত চলতি বছরে বিশ্বের প্রবৃদ্ধির হার পুনরুদ্ধার আসলেই ঝুঁকিপূর্ণ। আইএমএফ বলছে, জুনের দিকে তারা বিশ্বপ্রবৃদ্ধির হার আরেক দফা কমানোর চিন্তা করছে। তবে আশার কথা, আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার বড় ধরনের ‘জাম্প’ করবে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটি আশা করছে। কিন্তু এই অর্থবছরে বাংলাদেশের জন্য তারা ২ শতাংশের বেশি প্রত্যাশা করছে না। বিশ্বব্যাংকও এ রকম প্রত্যাশা করছে।

তবে আমার ধারণা, এ বছর প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের নিচে হবে না। চেষ্টা করলে ৬ শতাংশও অর্জন সম্ভব। তবে সে জন্য আমাদের আরো কৌশলী হতে হবে। আমাদের শক্তি ও সামর্থ্য কোথায় তা আন্দাজ করতে হবে। আমার মতে, এখনো কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিই আমাদের শক্তির বড় উৎস। এই উৎস আমাদের বিনিয়োগ অবশ্যই বাড়াতে হবে। এর সঙ্গেই সম্পৃক্ত আমাদের ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প এবং ব্যবসার খাত। এখনো এ দুই খাতই আমাদের কর্মসংস্থানের প্রধানতম উৎস। সম্প্রতি পোশাক ও চামড়াসহ বেশ কিছু রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রসার ঘটায় গ্রাম থেকে বিপুলসংখ্যক নারী ও পুরুষ আনুষ্ঠানিক শিল্প খাতে কাজ পেয়েছে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে করোনা সংকটের কারণে এই রপ্তানি পণ্যগুলোর চাহিদা কমে আসছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদেশে কর্মরত অদক্ষ শ্রমিকদের কাজ হারানোর ভয়। নগরায়ণ প্রসারিত হওয়ায় প্রচুর মানুষ অসংগঠিত ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ পেয়েছিল। এসব খাতেও লেগেছে করোনার ধাক্কা। পরিশ্রমী মানুষগুলো হাত গুটিয়ে বসে আছে। মরণের ভয়ে জীবিকা রক্ষার আশাও তারা ছেড়ে দিয়েছে। আমাদের স্বাস্থ্য খাত যদি কেরালার মতো শক্তিশালী ও গণবান্ধব থাকত, তাহলে হয়তো অনেকেই কাজে নেমে পড়ত। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে কভিড চিকিৎসার যে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে, তা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। এমনই এক অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রান্তজনের জীবন চলাই দায়। নতুন করে আরো ১০-১২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যফাঁদে আটকা পড়েছে। এই স্বাস্থ্য সংকট দীর্ঘতর হলে প্রান্তজনের এই হার আরো বাড়বে। তাই আসন্ন বাজেটকে টিকে থাকার বা বেঁচে থাকার বাজেট বলতে আমার একটুও দ্বিধা নেই। সত্যিটা মেনে নিয়ে আমাদের চিরায়ত শক্তির উৎস কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে আস্থায় নিয়ে আমাদের এ বছরের বাজেটকে একেবারেই ‘আউট অব বক্স’ বা সৃজনশীল হতে হবে। সে জন্য কয়েকটি মোটাদাগের অগ্রাধিকারের কথা বলতে পারি।

১. মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যা যা দরকার, সেসব দিকেই প্রথমে এবারের বাজেটকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আগে মানুষ, তারপর অর্থনীতি। স্বাস্থ্য খাতকে আরো শক্তিশালী করার জন্য বরাদ্দ অবশ্যই দ্বিগুণেরও বেশি করা চাই। পাশাপাশি সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘকালীন অবকাঠামো, মানবসম্পদ ও সরকারি ব্যয়, বেসরকারি খাতের অংশীদারি গড়ে তোলার জন্য নীতি-কাঠামোর বিস্তার এই বাজেটেই করতে হবে। মনে রাখা চাই, বাজেট শুধু অঙ্কের কচকচানি নয়; বাজেট মানুষের স্বপ্ন দেখানো ও পূরণের দলিল। তাই এই সংকটকালে নীতিনির্ধারকদের দরদি মনের গভীরতম অনুভূতির প্রতিফলন এই দলিলে দেখতে চাইবে জনগণ। সেই অর্থে বাজেটের একটি মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকাও রয়েছে। বাজেট বাস্তবায়নে যুক্ত নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা পর্যন্ত সবার মানসিকতায় যে ইতিবাচক পরিবর্তন দরকার, তার এক ধরনের প্রতিফলন বাজেট প্রস্তাবে থাকা বাঞ্ছনীয়। সরকারের বাইরে থাকা অংশীজনদের সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়নে কী ধরনের সংযোগ থাকবে, সেটাও মানুষ জানতে আগ্রহী। তাই স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি গরিব ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রচলিত সামাজিক সুরক্ষা, খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি নতুন করে ব্যাপক নগদ সহায়তার প্রস্তাব বাজেটে থাকা উচিত।

২. একই সঙ্গে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোর জন্য আরো সুদ ভর্তুকি দিয়ে প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর আকার বাড়ানো এবং এমএফআইয়ের সঙ্গে অংশীদারি বাড়িয়ে দ্রুত এসবের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক যাদের আগে ঋণ দিয়েছে, যাদের টিন নম্বর আছে এবং যাদের ট্রেড লাইসেন্স আছে, তাদেরই ঋণ দিতে চাইবে; অন্যদের নয়। অথচ ৮০ লাখের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ৯০ শতাংশের এসব কাগজপত্র নেই। এদের চেনে এমএফআইগুলো। এদের জন্য ঘোষিত পুনরর্থায়ন কর্মসূচির বরাদ্দের পরিমাণ মাত্র তিন হাজার কোটি টাকা। তবু মন্দের ভালো। কিন্তু আরেকটু সৃজনশীল ও সাহসী হলেই বাংলাদেশ ব্যাংক এই প্যাকেজটি আরো কয়েক গুণ বাড়াতে পারে। অথবা এসএমইর জন্য ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজেও এদের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব (এই বরাদ্দের অর্ধেক পুনরর্থায়নের আওতায় দেওয়া হবে)।

৩. যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান এবং চলমান সংকটকালে রাজস্ব আদায়ের যে সংশোধিত টার্গেট ধরা হয়েছে, তা অর্জনও প্রশ্নসাপেক্ষ। তাই আয় বুঝে ব্যয় করার বাস্তবতা মেনে নিয়ে এ বছর অতি প্রয়োজনীয় খরচগুলোর দিকেই নজর দেওয়া সমীচীন হবে। অপ্রয়োজনীয় জনপ্রশাসন খরচ কমিয়ে উৎপাদনমুখী ও জনকল্যাণমুখী খরচ কী করে বাড়ানো যায়, এবারের বাজেট নিশ্চয়ই সেদিকেই নজর দেবে।

৪. পড়ন্ত রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আয়ের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে আরো বেশি সহযোগিতা পাওয়ার জন্য এখন থেকেই আগামী অর্থনৈতিক কূটনীতি সচল করতে হবে।

৫. সামর্থ্যবান প্রবাসীদের অনলাইনে আরো বেশি করে ট্রেজারি বন্ড, প্রবাসী আয় বন্ড, প্রিমিয়াম ইনভেস্টমেন্ট বন্ড কেনার যাবতীয় সুযোগ দ্রুতই বৃদ্ধির চেষ্টা করতে হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।

৬. ডিপোজিট পেনশন স্কিমের করমুক্ত বিনিয়োগের পরিমাণ দ্বিগুণ করা, পেনশনধারী ও নারীদের সঞ্চয়পত্রের সীমা আরেকটু বাড়ানো এবং তাদের ব্যাংকে রাখা এফডিআর হার আরেকটু বাড়াতে রেমিট্যান্সের মতো ২ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেওয়ার কথা বাজেট প্রণেতারা ভাবতে পারেন।

৭. পুনরর্থায়ন আরেকটু বাড়িয়ে, সরকারকে আরেকটু ঋণের সুবিধা বাড়িয়ে এ বছরের বাজেট ঘাটতি প্রচলিত ৫ শতাংশের চেয়ে আরো ২-৩ শতাংশ বাড়ালে তা খুব অযৌক্তিক হবে না। ব্যক্তি খাতের ঋণের যে ধারা, বিশ্বব্যাপী তেলের যে অবস্থা, অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদার যে দুরবস্থা, তাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ে এ বছর তেমন না ভাবলেও চলবে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক যদি তার ব্যালান্সশিটে আরেকটু চাপ নেয়, তাহলে খুব একটা অযৌক্তিক হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য সে চাপ নিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে রাজস্ব বরাদ্দের সৃজনশীলতা ও সদিচ্ছা। এরই মধ্যে নগদ সহায়তা, সুদে ভর্তুকি, গার্মেন্টের বেতনসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে সরকার হাত খুলেছে। প্রচলিত ব্যয় কমিয়ে মানুষ বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব সমর্থন আরো বাড়ালে এ যাত্রায় আমরা নিশ্চয় ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও কর্ম হারানোর ধাক্কা বেশ খানিকটা সামলাতে পারব।

৮. স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি খাতে বাস্তবেই সরকার কত টাকা খরচ করছে তা সঙ্গে সঙ্গে জানার সুযোগ নেই। বাজেটের এই দিকটা আরো স্বচ্ছ করা নিশ্চয় ডিজিটাল প্রযুক্তির এই যুগে সম্ভব। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতেই এই হিসাবটি জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। মানুষকে আশ্বস্ত করার জন্যই এর প্রয়োজন রয়েছে। আশা করছি, এবারের বাজেট বক্তৃতায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী এ দিকটায় নজর দেবেন।

সংকট উত্তরণে বাড়তি সম্পদ যেমন দরকার, তেমনি আয় বৃদ্ধির নয়া পথও খুঁজতে হবে। ঠিকমতো উদ্বুদ্ধ করতে পারলে জনগণও সংকটকালে বাড়তি রাজস্ব দিতে অনাগ্রহী হবে না। যেমন—প্রতিটি মোবাইল ফোন কলে, মেসেজে, এমএফএস ও এজেন্ট ব্যাংকিং এবং ব্যাংক ট্রানজেকশনে যদি মাত্র এক পয়সা কভিড সারচার্জ আরোপ করে এ থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব একটি আলাদা তহবিলে রাখা যায়; এবং ওই অর্থ সংকটকালীন স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করার একটি সুস্পষ্ট ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে জনগণ নিশ্চয়ই সরকারের এ আহ্বানে সাড়া দেবে। বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের সময় সরকারের এমন আহ্বানে জনগণ বিপুলভাবে সাড়া দিয়েছিল। এমনকি পদ্মা সেতু নির্মাণেও তারা এগিয়ে আসতে আগ্রহী হয়েছিল জাতীয় স্বার্থের বিবেচনার জায়গা থেকে। রাজস্ব আদায় ও সময়ের চাহিদা অনুযায়ী খরচের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার জন্যই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। দুর্যোগে-দুঃসময়েই বড় বড় সংস্কারের উত্তম সময়। আশা করছি, টিকে থাকার এই বাজেট দেওয়ার সময় মাননীয় অর্থমন্ত্রী স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি-কাঠামো দেওয়ার পাশাপাশি এসব নীতি বাস্তবায়নে আমাদের জাতীয় ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জোরদার করার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করবেন।

 

লেখক : বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা