kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৪ জুন ২০২০। ১১ শাওয়াল ১৪৪১

দুর্যোগ মাথায় রেখে বাজেট প্রণয়ন করুন

এম হাফিজউদ্দিন খান

২২ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুর্যোগ মাথায় রেখে বাজেট প্রণয়ন করুন

এবারের জাতীয় বাজেট প্রণয়নের বিষয়টি এমন একটি সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশে কোনো স্বাভাবিক অবস্থা জারি নেই। মানুষ ভালো নেই। করোনাভাইরাসের কারণে কেবল বাংলাদেশই নয়, সারা পৃথিবীই একটি স্থবির অবস্থার মধ্যে আছে। সে কারণে আমাদেরও একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে এনে দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশে দুই মাসের বেশি সময় ধরে এর প্রাদুর্ভাব চলছে। এখনো করোনাভাইসরাসের গতিবিধি ও আক্রমণ শেষ হয়নি। প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর হার বাড়ছে। প্রতিদিনই মানুষ মারা যাচ্ছে। ভয় এখনো পুরোপুরি কাটেনি; বরং বেড়েছে। সামনের দিনে কী হবে, এখনো পরিষ্কার করে বলা যাচ্ছে না। যদি রোগী আর শনাক্ত না হতো, মানুষ মারা না যেত, তাহলে বোঝা যেত যে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু এখনো এর রকম বোঝা যাচ্ছে না। করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, এটা উদ্বেগের কারণ। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যেখানে কমছে, বাংলাদেশে এর হার বেড়েছে।

এবারের বাজেটে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি সামনে রাখতে হবে এবং বেশি গুরুত্ব দিতে হবে সেটা হচ্ছে, নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এখন ভাবার সময় কম। কিভাবে পুরনো ঘাটতি পূরণ করা যায়, সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। করোনাভাইরাসের আক্রমণের ফলে নানাভাবে যে ক্ষতি ও সংকট তৈরি হয়েছে, লোকসান হয়েছে, সেসব কিভাবে পূরণ করা যায়, তা নিয়েই এবারের বাজেটে জোর দিতে হবে বলে আমি মনে করি। অর্থনৈতিকভাবে যে বিরাট ক্ষতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশ, সেখান থেকে আগে উত্তরণ দরকার। মন্দা না কাটিয়ে কোনোভাবেই নতুন সম্ভাবনা ও প্রকল্প নিয়ে কোনো বাজেট প্রণয়নের কোনো সুযোগ নেই।

আমি তো বিশেষজ্ঞ লোক নই। তবে সারা জীবন কাজ করেছি অডিট বিভাগে। কাজেই কিছু বিষয় বলতে পারি। সাধারণভাবে বলা যায়, এবারের বাজেট দিতে হবে সময় বুঝে। করোনার প্রকোপ ও বিস্তারের ফলে অর্থনৈতিক মন্দা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। গতানুগতিকভাবে নিয়মিত বাজেট ঘোষণার কোনো সুযোগ নেই। সময় এখন পুরোপুরি উল্টে গেছে এবং বাজেট নিয়ে অনেক ভেবেচিন্তে এর ঘোষণা দিতে হবে।

একটা জরিপে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য খাতে আমাদের দেশে সবচেয়ে কম বরাদ্দ থাকে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের এখানে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ সর্বনিম্ন। সে কারণে নানাভাবে আমাদের ভুগতে হয়। কেবল জেলায় জেলায় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বানিয়ে দিলেই তো হয় না। সে জন্য নানা ধরনের দাবি ও দায় আছে। প্রয়োজনীয় উপকরণ নেই। উপকরণ আছে তো ডাক্তার নেই। নার্স নেই, সহকারী ও যন্ত্রপাতি নেই। এভাবে তো ভালো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়। নতুন মেডিক্যাল কলেজ যেমন জরুরি, একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা আরো জরুরি। তা না হলে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বাজেটে এ বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।

আমাদের এখানে প্রাইভেট হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ছে। সেবার মানের কিন্তু উন্নয়ন হচ্ছে না। খরচ বেশি। মধ্যবিত্তের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। আবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পারে না। দেশের বাইরে যেতে হয়। আবার খরচ এত বেশি যে বাইরের তুলনায় এর বিচারই চলে না।

এবারের বাজেটে নতুন বড় প্রকল্পের কথা আপাতত ভাবা যাবে না। পুরনো ও চলমান যে প্রকল্পগুলোর কাজ এখনো শেষ হয়নি, কাজ চলছে, সেগুলো চালিয়ে নিতে হবে। যেমন—পদ্মা সেতু বা এমন আরো যে প্রকল্প আছে, সেগুলো থামানো যাবে না। কিন্তু নতুন করে মেগাপ্রজেক্টের কাজের কথা এখন ভাবা সংগত হবে বলে মনে করি না।

আমাদের রাজস্ব কম। সরকারের আয়ও সেভাবে হয়নি। কাজেই খরচ কিভাবে কমিয়ে রাখা যায়, সেটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। আমি বারবারই জোর দিয়ে বলতে চাই যে গতানুগতিক বাজেট ঘোষণা করার সময় এখন নয়। কাজেই নানা দিক ভেবে এবারের বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের নিয়ে বসতে হবে। কিভাবে বাজেট প্রণয়ন করলে করোনাকালে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে তুলে আনা সম্ভব হবে, নতুন করে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা যাবে, তা নিয়ে ভাবতে হবে।

যে খাতগুলো সরাসরি অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, বাজেটে সেই বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে। করোনাকালে তৈরি হওয়া যে ধাক্কা অর্থনীতিতে পড়েছে, তার জের কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। এখন পর্যন্ত যে ক্ষতি হয়েছে, নানা খাতে লোকসান হয়েছে, সেখান থেকে উদ্ধার পেতে হবে। সে জন্য চাই পরিকল্পিত বাজেট। বাজেট তো সামনে আসছে, এখনো আসেনি, কাজেই আমার প্রথম ও শেষ কথা হচ্ছে, সাধারণ বাজেট দেওয়ার কোনো সুযোগ এখন নেই। এটা মাথায় রেখে করোনাভাইরাসের ফলে দেশ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অর্থনীতিতে যে ধাক্কা লেগেছে তার থেকে কিভাবে উত্তরণ ঘটবে, তা বাজেট পেশের আগেই ভাবতে হবে।

সরাসরি মানুষ ও দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং যেসব উদ্যোগ জরুরি, কেবল সেই বিষয়ে বাজেট দিতে হবে। নতুন করে কোনো প্রকল্প নেওয়া যাবে না, যে প্রকল্প সরাসরি কাজে লাগছে না। সময় ভালো হলে পরে সেসব নিয়ে ভাবা যেতে পারে। এখন জনমুখী এবং অর্থনীতির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে যা কিছু করণীয়, কেবল সে বিষয়গুলো সামনে রাখতে হবে বলে আমি মনে করি।

 

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা