kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৪ জুন ২০২০। ১১ শাওয়াল ১৪৪১

এই সময়

বিশ্বায়নের বিনির্মাণ

তারেক শামসুর রেহমান

২১ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিশ্বায়নের বিনির্মাণ

করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী যেসব পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ‘ডিগ্লোবালাইজেশন’ বা বিশ্বায়নের বিনির্মাণ। অর্থাৎ বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বিশ্বায়ন বিশ্বব্যাপী যে আবেদন সৃষ্টি করেছিল, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এবং তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিল্পোন্নত দেশগুলোর ব্যর্থতা বিশ্বায়নের সেই আবেদনকে ভেঙে দিয়েছে। বিখ্যাত নিউজ ম্যাগাজিন ইকোনমিস্টের গত ১৬ মের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছিল  Goodbye Globalisation—বিদায় বিশ্বায়ন। ইকোনমিস্টের মতে, বিশ্বায়নের ফলে বিশ্ববাণিজ্য উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল। এবং বিশ্বায়ন বিশ্ব অর্থনীতিকে দুই দশক ধরে নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু কভিড-১৯ মহামারি বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নামিয়েছে এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনা করতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের যথেষ্ট অবনতি ঘটিয়েছে এবং নতুন করে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করতে যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই চীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন।

নোভেল করোনাভাইরাস কভিড-১৯ পৃথিবীর ২১৩টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। গত ১৮ মে পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা তিন লাখ ১৭ হাজার ৫৬১, আর আক্রান্ত ৪৮ লাখ ৪৪ হাজার ৫৬৮ জন। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ৯১ হাজার ৯২ জন (আক্রান্ত ১৫ লাখ ৩২ হাজার ৮৬১ জন)। এই পরিসংখ্যানই আমাদের বলে দেয় বিশ্ব অর্থনীতির ব্যর্থতাটা কোথায়। বিশ্বায়ন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের ১ নম্বর অর্থনীতিতে পরিণত করলেও (২০১৯ সালে সাধারণ নিয়মে জিডিপির পরিমাণ ২১.৪২ ট্রিলিয়ন ডলার) স্বাস্থ্য সেক্টরে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা চরমে পৌঁছেছে। করোনাভাইরাস বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ায় অর্থনীতিতে যে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে, তা ১৯৩০ সালের পর বিশ্বে আরেকটি মহামন্দার জন্ম দিতে যাচ্ছে। বিশ্বের অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য এখন থমকে গেছে। মেক্সিকো যে গাড়ি রপ্তানি করত, তা শতকরা ৯০ ভাগ কমে গেছে। হিথরো বিমানবন্দরের (লন্ডন) যাত্রী মুভমেন্ট শতকরা ৯৭ ভাগ কমে গেছে। যাত্রীবাহী অনেক বিমান সংস্থা এখন তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে অথবা জনবল ছাঁটাই করবে। প্রশান্ত মহাসাগর দিয়ে কনটেইনার পরিবহন হ্রাস পেয়েছে শতকরা ২৩ ভাগ। অথচ বিশ্বায়নের অন্যতম বৈশিষ্ট ছিল অবাধ যাত্রী মুভমেন্ট, সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেওয়া, আর অবাধ বাণিজ্য। এখন তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সিএনবিসি গত ২৪ এপ্রিল (২০২০) তাদের এক প্রতিবেদনে সাতটি ক্ষেত্র উল্লেখ করেছে, যেখানে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী বেকার সমস্যা বেড়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে এই হার শতকরা ৪.৪ ভাগ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩.৮ ভাগ, জার্মানিতে ৫ ভাগ, অস্ট্রেলিয়ায় ৫.২ ভাগ আর চীনে ৫.৯ ভাগ। খুচরা বিক্রি অর্থনীতির অন্যতম শক্তি। কিন্তু দেখা যায়, চীনে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে এর পরিমাণ যেখানে ছিল ১০ ভাগ, সেখানে ফেব্রুয়ারি ২০২০-এ এর পরিমাণ কমেছে মাইনাস ১৫.৮ ভাগ। যুক্তরাষ্ট্রে ওই সময় এর পরিমাণ ০.০ ভাগ থেকে কমেছে মাইনাস ৬.২ ভাগ। পিএমআই (PMI- Purchasing Managers Index) অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম ইন্ডিকেটর বা নির্দেশক। PMI যদি ৫০-এর নিচে থাকে, তা অর্থনীতিতে সংকোচনের আভাস দেয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী চীনে সার্ভিস সেক্টরে  PMI-এর পরিমাণ ৪৩, যুক্তরাষ্ট্রের ৩৯.৮, জাপানের ৩৩.৮ আর ইউরো জোনের ২৬.৪। অন্যদিকে উৎপাদন খাতে

PMI চীনে ৫০.১, যুক্তরাষ্ট্রে ৪৯.২, জাপানে ৪৪.৮ আর ইউরো জোনে ৪৪.৫। অর্থাৎ শুধু চীনে উৎপাদন খাত সম্প্রসারিত হয়েছে, অন্যান্য অঞ্চলে সংকুচিত হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বিশ্ববাণিজ্যের যে প্রাক্কলন করেছে, তাতে দেখা যায় বিশ্ববাণিজ্যে ১২.৯ থেকে ৩১.৯ ভাগ পর্যন্ত ঘাটতি হবে। এই বাণিজ্যে প্রতিটি অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা বিশ্বায়ন বা মুক্তবাণিজ্যের পরিপন্থী। আইএমএফের মতে, বিশ্ব জিডিপি ২০২০ সালে হ্রাস পাবে মাইনাস ২.৫ ভাগ। যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি প্রবৃদ্ধি মাইনাস ৬ ভাগে হ্রাস পাবে। জাপান ও জার্মানিতেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি মাইনাস ৫ ও মাইনাস ৭ ভাগে হ্রাস পাবে। শুধু চীনে প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছে প্লাস ৫ ভাগের ওপরে। আইএমএফের মতে, ২০২০ সালে বিশ্ব প্রায় ৯ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হবে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বলছে, চলতি ২০২০ সালে ১৭০টি দেশে মাথাপিছু আয় কমবে।

আমরা পরিসংখ্যানগুলো উল্লেখ করলাম এ কারণে যে বিশ্বায়ন যে সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল, সেই সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটেছে এখন। বলা যেতে পারে বিশ্বায়নের ‘মৃত্যু’ ঘটেছে। তবে চীন ঘুরে দাঁড়াবে। এখন চীন একটি নতুন ধরনের বিশ্বায়নের জন্ম দিতে পারে। অথবা বিশ্বায়ন নতুন করে বিনির্মাণ হবে, যেখানে করপোরেট হাউসগুলোর প্রফিট বা লাভের চাইতে মানবিক বিষয়গুলো (যেমন স্বাস্থ্য খাত) গুরুত্ব পাবে বেশি।

লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা