kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

করোনার অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার উপায় কী

ব্যারি এইচেনগ্রিন

২০ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ডোনাল্ড ট্রাম্প আমাদের জানিয়েছেন, কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে আসার পর যখন কাজে ফেরা নিরাপদ হবে তখন অর্থনীতি আবার ‘দুর্দান্ত গতি’ পাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি যথার্থ বলছেন?

অন্তত এক দিক থেকে চিন্তা করলে তিনি ঠিক কথাই বলেছেন। কেননা ঘূর্ণিঝড় বা ভূমিকম্পের মতো এই মহামারি স্টক এক্সচেঞ্জের কাঠামোগত কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। কাজেই ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টাদের বক্তব্য মেনে নেওয়াই যায়, যেখানে আমরা সব থামিয়ে দিয়ে লকডাউন শুরু করেছি, সেখান থেকেই আমরা আবার শুরু করব। অর্থনীতি হয়তো কিছুটা সময় নেবে। তবে খুব দ্রুতই তা সংকটপূর্ব সময়ে ফিরে যাবে। সমৃদ্ধিও আসবে আগের মতোই।

ট্রাম্প আমাদের এও বলেছেন, অর্থনীতি আগের চেয়েও শক্তিশালী হবে। ডিলারদের কাছে যেতে হবে (বিষয়টি এখন মোটেই নিরাপদ নয়) বলে যারা গাড়ি কেনা বন্ধ করে দিয়েছে তারা আবার বের হবে। যেসব কারখানা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছে, তারা আবার দ্বিগুণ বিনিয়োগ করবে। বসন্তে বেসবল দলের খেলা বন্ধ ছিল। কাজেই তারা শরতে দ্বিগুণ উৎসাহে মাঠে ফিরবে।

তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ট্রাম্পের এই পুষ্পমাধুর্যময় দৃশ্যপট বাস্তবায়নের দায় প্রকৃতির নেই। মানুষ বুঝতে শুরু করেছে, এই চরম দুর্যোগ তাদের তীব্র আর্থিক টানাপড়েনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখন খরচ কমিয়ে সঞ্চয় বাড়ানো জরুরি। কাজেই এখন আর তারা নতুন গাড়ি কেনার কথা ভাববে না। ভাইরাস আর ফিরবে না—এই নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত কারখানাগুলো আর নতুন করে সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ করবে না। যুক্তরাষ্ট্রের পরে যেসব উন্নয়নশীল দেশ এই সংকটে পড়তে যাচ্ছে অথবা এরই মধ্যে পড়ে গেছে, তাদের আমদানি কমবে।

তবে এ ক্ষেত্রেও খানিকটা স্বস্তির খবর হচ্ছে, সরকারি ব্যয় ব্যক্তিগত ব্যয়কে হয়তো কিছুটা কমিয়ে দেবে। সুদের হার কমিয়ে দেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজেট ঘাটতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এর মধ্যেই বর্তমান পরিস্থিতিতে অধিক এবং দীর্ঘ সময় ধরে ভর্তুকি দেওয়ার বিষয়টিকে পরিকল্পনার মধ্যে রাখতে হবে।

তবে সরবরাহে যে ক্ষতি এর মধ্যেই হয়ে গেছে, তা খুব সহজে পুষিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। সরবরাহব্যবস্থা পুনর্গঠন করা হবে, যা উৎপাদনের দাম বাড়িয়ে দেবে। দূরে গিয়ে কাজ করার ব্যাপারে আগ্রহ হারাবে মানুষ। এখন যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছে, তাতে খরচ বেশি হলেও বাড়ি থেকে দূরে যেতে চাইবে না তারা। ফলে উৎপাদন ব্যয় ও পণ্যের দাম—দুই-ই বাড়বে।

তবে এই সংকট করোনাভাইরাস শ্রমিকদের ওপর যে প্রভাব ফেলবে সেই তুলনায় অতি নগণ্য। ব্যাপক মাত্রায় বেকারত্ব বাড়বে। যাদের চাকরি থাকবে তাদেরও নিম্ন মজুরিতে কাজ করতে হবে। করোনা পরিস্থিতি পার হলে বিষয়টি যে স্বল্প সময়ের জন্য ঘটবে তা নয়, বরং কয়েক দশক ধরে এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার ২৫ শতাংশ বা এর চেয়েও বেশি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই বেকারত্বের নেতিবাচক প্রভাব হবে ঐতিহাসিক। বার্কলেতে আমার সহকর্মী জেস রথস্টেইন মহামন্দা অনুসরণ করে তাদের প্রাদুর্ভাব দেখিয়েছেন। আমার শিক্ষক নিক ক্রাফটস এখন ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইকে আছেন। তিনি বিশ্বজুড়ে মহামন্দা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি খুব সুন্দর করে বিশ্লেষণ করেছেন।  

যখন কোনো কর্মীর সঙ্গে তার প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের ইতি ঘটে তখন এই বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট বোঝা যায়। প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে অনেক কর্মীকেই বিশেষ কাজে দক্ষ করে গড়ে তোলা হয়। প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে এই বিশেষ দক্ষতা ওই কর্মীর আর কোনো কাজে আসে না। এমনকি দক্ষ শ্রমিকের ক্ষেত্রেও নতুন কাজের সংস্থান করতে অনেক সময় লেগে যেতে পারে। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ইউরোপের সরকারগুলো এখন পর্যন্ত নিয়োগদাতা এবং কর্মীদের মধ্যে সুসম্পর্ক রাখার ব্যাপারে নানাভাবে উদ্যোগ নিয়ে চলেছে।

বেকারত্ব ও অভাবের কারণে মানুষ নীতিভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। হতাশাসহ অন্য মানসিক সংকটেও আক্রান্ত হয় তারা, যা ব্যক্তিগত উৎপাদনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এমন হতাশ মানুষকে নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ হারায় প্রতিষ্ঠান। ১৯৩০ সালের মহামন্দার সময় বিষয়টি আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। সে সময় শ্রমিকদের বেকারত্বের হারই শুধু বাড়েনি, একই সঙ্গে আত্মহত্যা এবং বিবাহবিচ্ছেদের হারও অনেক বেড়ে গিয়েছিল। অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই আশঙ্কা করছে।

বেকারত্বের এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও অব্যাহত থাকবে। করোনাভাইরাসের এই প্রতিক্রিয়াকালকে যদি সংক্ষিপ্ত করা সম্ভব হয়, তাহলে অর্থনীতির ক্ষতি কমিয়ে আনা যাবে। ফলে এর যন্ত্রণা ও দুর্ভোগও সীমিত হবে।

করোনাভাইরাস ও এর নিয়ন্ত্রণে আমাদের সাফল্যের ওপর নির্ভর করবে এই দুর্যোগ কত দিন স্থায়ী হবে সেই বিষয়টি। আর করোনা নিয়ন্ত্রণে সাফল্যের বিষয়টি নির্ভর করছে আমাদের সামাজিক ঐক্য এবং আমাদের নেতাদের গুণাবলির ওপর। ফলে বিষয়টি আমেরিকানদের জন্য খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়।

লেখক : বার্কলের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতির অধ্যাপক

সূত্র : গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা