kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

মনের বাঘে যেন না খায়

প্রভাষ আমিন

২৯ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মনের বাঘে যেন না খায়

বাংলাদেশ সত্যি বিশ্বে অনন্য, অতুলনীয়। সারা বিশ্ব এখন করোনা আতঙ্কে কাবু। একের পর এক দেশ, একের পর এক শহর আক্রান্ত হচ্ছে আর লকডাউনে চলে যাচ্ছে। বিশ্বের ব্যস্ত সব এলাকায় কারফিউ পরিস্থিতি। তখন বাংলাদেশের অবস্থা যেন ভিন্ন। করোনাকে যেন কেউ পাত্তাই দিচ্ছে না। বাংলাদেশের মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখলে মনে হবে এই জাতি সত্যি বীরের জাতি। সারা বিশ্ব যখন কাবু হচ্ছিল তখনো বাংলাদেশের মানুষের কারো হেলদোল ছিল না। ৮ মার্চ বাংলাদেশে করোনা রোগী শনাক্তের পর মানুষ কিছুটা নড়েচড়ে বসে। কিছুটা দেরিতে হলেও সরকার ধীরে ধীরে দেশকে সংকুচিত করে আনে। ১৬ মার্চ ঘোষণা আসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের। তারপর একে একে স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচি বাতিল, সাধারণ ছুটি, গণপরিবহন বন্ধের সিদ্ধান্ত আসে। কিন্তু মানুষ এই ছুটির দরকারটাই বোঝেনি যেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণার পর কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত আর পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে মানুষের ভিড় বুঝিয়ে দেয়, আমরা করোনার বিপদটা টের পাইনি। ১৮ মার্চ দেশে প্রথম মৃত্যুর খবর আসার পর আমার ধারণা ছিল মানুষ কিছুটা বুঝবে এবার, অন্তত ভয় পাবে। কিছু মানুষ বুঝেছেও হয়তো। তার পরও সমুদ্রসৈকত শূন্য করতে পুলিশ লেগেছে। পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করতে হয়েছে। করোনার বিস্তার রোধে অনেকেই লকডাউনের দাবি করছিল। আনুষ্ঠানিক লকডাউন না হলেও দেশে এখন সাধারণ ছুটি চলছে, আপাতত চলবে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত। এই ছুটি দেওয়া হয়েছে যেন মানুষ ঘরে থাকে। কিন্তু টানা ১০ দিনের এই ছুটি যেন কারো কারো মনে ঈদের আনন্দ বয়ে আনে। বাস-রেল-লঞ্চে উপচে পড়া ভিড়। নিরাপদ দূরত্বের কোনো বালাই নেই, কাউন্টারে লম্বা লাইন। টার্মিনালে গেলে বোঝা মুশকিল, ছুটিটা করোনা থেকে বাঁচতে ঘরে থাকার জন্য, নাকি ঈদের মতো দল বেঁধে ছুটি কাটাতে বাড়ি যেতে।

আরেক দল মানুষ আবার করোনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজার খালি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পাল্লা দিয়ে দামও বেড়ে যায় নিত্যপণ্যের, যদিও পরে সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। তবে যারা মণকে মণ চাল, ডাল, তেল, মাছ-মাংস কিনে ফ্রিজ ভর্তি করে ফেলেছে; ওষুধের দোকান খালি করে ফেলেছে; তারা অবশ্যই স্বার্থপর। তারা শুধু নিজেরাই বাঁচতে চেয়েছে। আশপাশের মানুষ, স্বজন, গরিবদের কথা ভাবেনি। এই স্বার্থপর মানুষগুলো নানা সময়ে সমাজে সংকট তৈরি করে। এখন বিশ্বজুড়ে এক মানবিক বিপর্যয় চলছে। এই সময়ে আমাদের সবাইকে আরো মানবিক হতে হবে।

কিছু মানুষ সব নিয়ম মেনে সত্যি সত্যি লকডাউনে চলে গেছে। ভয়াবহ আতঙ্ক গ্রাস করেছে অনেককে। করোনা মোকাবেলায় আমাদের সাবধান থাকতে হবে, পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে; কিন্তু আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। আমি জানি আতঙ্কিত হওয়া যাবে না, এ কথা বললেই আতঙ্ক দূর হবে না। কিন্তু ভাবুন আতঙ্কিত হয়ে কোনো লাভ নেই। আতঙ্ক দিয়ে তো করোনা ঠেকানো যাবে না। বরং অতিরিক্ত আতঙ্কে আপনার সাবধানতায় ভুল হয়ে যেতে পারে। তাই সতর্ক থাকুন, আতঙ্কিত হবেন না। চেষ্টা করুন মাথা থেকে করোনার আতঙ্কটা ঝেড়ে ফেলতে। সারাক্ষণ করোনায় বুঁদ হয়ে থাকবেন না। শুধু করোনার নিউজ আর গুজবের পেছনে ছুটলে করোনা না ধরলেও মানসিক অবসাদ আপনাকে কাবু করে ফেলতে পারে। বনের বাঘ আসার আগেই যদি মনের বাঘ আপনাকে খেয়ে ফেলে, তাহলে তো বিপদ। আপনি আপনার বাসার, পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন এবং করোনাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করুন। বরং নিত্য ব্যস্ততার ফাঁকে পাওয়া সময়টুকু কাজে লাগান। পরিবারকে আরো বেশি সময় দিন। সঙ্গীর দিকে গভীর ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকান, সন্তানের খোঁজ নিন। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের দিকে বিশেষ নজর দিন। মমতায় ভরিয়ে দিন আপনার পরিবারকে, দূর করুন করোনার আতঙ্ক। গত বইমেলায় কেনা বইগুলো পড়ে ফেলুন। গভীর চিন্তার বই পড়ায় মনঃসংযোগ ঘটাতে না পারলে হালকা চালের বই পড়ুন। প্রিয় গান শুনুন। আপনি যে ধর্মেরই হোন প্রার্থনা করুন। সৃষ্টিকর্তার কাছে আতঙ্ক থেকে মুক্তি চান। বাগান থাকলে তার পরিচর্যা করুন। সময়ের অভাবে যেসব সিনেমা দেখতে পারছিলেন না, তালিকা করে সেগুলো দেখে ফেলুন। নিজেকে চাঙ্গা রাখুন।

যাঁরা সৃষ্টিশীল মানুষ তাঁরা লেখালেখি করুন, সংগীতচর্চা করুন। নিজের কাজের ভুলগুলো মনে করে শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করুন। কোনো অন্যায় বা অপরাধ করে থাকলে অনুশোচনা করুন, ক্ষমা চান। আর নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞা করুন, করোনা-পরবর্তী সময়ে আপনি কোনো অন্যায় করবেন না, দুর্নীতি করবেন না, কারো হক মারবেন না, কারো প্রতি অবহেলা করবেন না, পরিবারকে সময় দেবেন। করোনা-পরবর্তী সময়ে আমরা যেন আরো মানবিক, আরো সৃষ্টিশীল হয়ে উঠতে পারি।

করোনা থেকে বাঁচতে গিয়ে করোনা আতঙ্কে কাবু হবেন না। করোনা যতটা আতঙ্ক নিয়েই আসুক, একসময় তো যাবেই। তাই বলে তো জীবন থেমে থাকবে না। জীবনকে সময় দিন। বাঁচুন আরো বেশি করে, প্রাণভরে।

লেখক : বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা