kalerkantho

রবিবার । ২২ চৈত্র ১৪২৬। ৫ এপ্রিল ২০২০। ১০ শাবান ১৪৪১

বিজেপির টোটকা কাজে লাগেনি

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিজেপির টোটকা কাজে লাগেনি

একে একে নিভেছে দেউটি; কিন্তু নেভাল কে?—জনগণই। সদ্যঃসমাপ্ত দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে দিল্লির শক্তিশালী ক্ষমতাবান দল যাঁর নেতৃত্বে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিজেপির নতুন সভাপতি জেপি নাড্ডা বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন, বিজেপি ক্ষমতায় আসছে। কিন্তু ফলাফলে দেখা গেল, আঞ্চলিক দল আম আদমি পার্টি বিজেপিকে এমন শিক্ষা দিয়েছে, যা বিজেপি সহ্য করতে পারছে না। তাই তারা মুখে বলছে, জনগণের রায়কে মেনে নিলাম। দিল্লিভিত্তিক এই আঞ্চলিক দলটি বিগত পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার সময় তাদের প্রতিশ্রুতি ছিল দিল্লিবাসীকে বিনা মূল্যে পানীয়জল সরবরাহ করবে, তা করেছেও। বিদ্যুৎও তারা জনগণকে সস্তা দরে দিয়েছে। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারে উন্নয়নমূলক কাজগুলোর তোয়াক্কা না করে প্রধানমন্ত্রীসহ বিজেপির প্রথম সারির নেতারা প্রচারে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন—অযোধ্যার রামমন্দির বানানোর কাজ শুরু হয়েছে। কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার করে নিয়ে কাশ্মীরকে ভেঙে দিয়ে তিনটি কেন্দ্ররাজ্যে পরিণত করেছে—(জম্মু, কাশ্মীর, লাদাক) বিজেপির দুই দফায় শাসনকালে দেশের তিনটি বড় রাজ্যে—মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান বিজেপিকে হটিয়ে কংগ্রেস দখল করে নিয়েছিল। দক্ষিণের কর্নাটক কংগ্রেস জনতাদল সেকুলার ক্ষমতা দখল করেছিল। কিন্তু ছয় মাস যেতে না যেতেই কর্নাটকে এই কোয়ালিশন সরকার থেকে ১০ জন বিধায়ককে ১০০ কোটি টাকা দিয়ে কিনে সরকারের পতন ঘটিয়ে বিজেপি সরকার গঠন করে। মহারাষ্ট্রের মতো ভারতের বৃহত্তর রাজ্যে বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করে কংগ্রেস, এনসিপি ও শিবসেনা। মহারাষ্ট্রের প্রবীণ এনসিপি নেতা শারদ পাওয়ার ২৫ বছরের বিজেপির সঙ্গী শিবসেনার নেতা উদ্ধব ঠাকুরকে নিয়ে দিল্লিতে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর কাছে ছুটে আসেন,  সোনিয়া গান্ধী শিবসেনাকে শর্ত দিয়েছিলেন, হিন্দুত্ববাদ ছেড়ে শিবসেনা ভারতের সংবিধানের মৌলিক অধিকারের ধর্মনিরপেক্ষতা মেনে নেওয়া হলে কংগ্রেস এনসিপি এবং শিবসেনার জোট সরকারে যোগ দিতে পারে। শিবসেনার নেতা উদ্ধব ঠাকুর  সোনিয়ার শর্ত শতভাগ মেনে নিয়ে বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রেখে দিয়েছে।

দিল্লি ছাড়াও সম্প্রতি ঝাড়খণ্ড রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপির ভরাডুবি হয়। সেখানেও আঞ্চলিক পার্টি ও কংগ্রেস জোট সরকার গঠন করেছে। দিল্লির কাছেই অপর একটি ছোট রাজ্য হরিয়ানায় কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। সরকার গঠন করতে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে হরিয়ানার আঞ্চলিক দলের ১০ জন বিধায়ককে হেলিকপ্টারে চাপিয়ে দিল্লিতে অমিত শাহর বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। অমিত শাহ ওই ১০ জন বিধায়ককে রাত একটার মধ্যে কিনে নেন। হরিয়ানার কংগ্রেস নেতারা সেদিন অভিযোগ করেছিলেন, প্রত্যেক বিধায়ককে ২০ কোটি টাকা করে মোট ১০ জনকে ২০০ কোটি দিয়ে কিনে নিয়ে ভোরবেলায় সরকার গঠন করে।

এবার দেখা যাক দিল্লিতে তারা কী করেছে। স্বাভাবিকভাবেই দিল্লির নির্বাচনে প্রচারে বিজেপির কোনো নেতাই উন্নয়ন, মূল্যবৃদ্ধি, মন্দা—এসব নিয়ে কোনো টুঁ শব্দ করেননি। তাঁদের একমাত্র ইস্যু ধর্মান্ধতা ও শাহিনবাগ। তাঁরা নির্বিচারে আক্রমণ শুরু করেন শাহিনবাগের আন্দোলনকারীদের ওপর। বলতে থাকেন, শাহিনবাগে যাঁরা অবস্থান করছেন, তাঁরা পাকিস্তানি। কোনো কোনো নেতা বললেন, তাঁদের কারো কাগজ নেই, তাঁরা সব বাংলাদেশি। কেউ বললেন, এঁরা দেশকে ভাঙতে চায়। সব দেশদ্রোহী। কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর বললেন, ‘দেশকে গদ্দারো কো, গালি মারো শালোঁ কো।’ দিল্লির সংসদ সদস্য প্রবেশ বর্মা শাহিনবাগের আন্দোলনকারীদের সম্পর্কে বলে দিলেন, ‘এরা ঘরে ঢুকে আপনাদের মেয়ে-বোনকে ধর্ষণ করবে।’ বললেন, ‘বিজেপি ক্ষমতায় এলে শাহিনবাগ খালি করতে এক ঘণ্টাও লাগবে না।’ নির্বাচনকে হিন্দু-মুসলমানের যুদ্ধ হিসেবে দেখাতে আপ

(AAP) থেকে বিজেপিতে যাওয়া নেতা কপিলমিশ্র বললেন, ‘এটা আসলে ‘ভারত-পাকিস্তান মোকাবেলা।’ প্রধানমন্ত্রী কিংবা অমিত শাহ সেদিন এঁদের কাউকে বলেননি যে এমন বক্তব্য অনুচিত। বলেননি যে এর দ্বারা রাজনৈতিক পরিবেশ কলুষিত হয়। গণতন্ত্রে বিরোধী মত প্রকাশের যে অধিকার, তাকে দমন করা হয়। অবশ্য অমিত শাহরা তাঁদের সংযত করবেন কী করে—তিনি তো নিজেই প্রচারে বলেছিলেন, এত রাগে ইভিএমের বোতাম টিপুন, যেন কারেন্ট লাগে শাহিনবাগে। ফলে কুকথা বলা উচিত না অনুচিত, তা বলার কোনো অধিকারই তাঁর নেই। কারণ তিনি সমান অপরাধে অপরাধী। তা ছাড়া মূল্যায়নে ভুলের যে কথা তিনি বলেছেন তা-ও সত্য নয়। কারণ এটা ভুলের বিষয়ই নয়। যখন তাঁরা বুঝেছিলেন মানুষের তাঁদের বলার কিছু নেই, তখন অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় তাঁরা পরিকল্পনা করেছিলেন যে শাহিনবাগকেই তাঁরা আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু করবেন। সাম্প্রদায়িক প্রচারকেই তাঁরা একমাত্র হাতিয়ার করবেন। মেরুকরণকেই গোটা দল একমাত্র অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে।

অথচ অমিত শাহরা পরিষ্কার জানতেন, শাহিনবাগে অবস্থানকারীরা কারা। কী তাঁদের উদ্দেশ্য। তাঁদের দাবি এবং পদ্ধতি যে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক তা-ও বিজেপি নেতাদের অজানা ছিল না। কিন্তু যে উদ্বেগ-আতঙ্ক থেকে দুই ডিগ্রি তাপমাত্রার শীতে সদ্যোজাত সন্তানকে নিয়ে কোনো মা দিন-রাত খোলা আকাশের নিচে কাটাতে পারেন, তা উপলব্ধি করার জন্য রাজনীতির মধ্যে যে নৈতিকতা, সংবেদনশীলতা থাকা দরকার তা অমিত শাহদের রাজনীতিতে নেই। এ অবস্থানেই দিনের পর দিন কাটানো এক শিশুর ঠাণ্ডা লেগে মৃত্যুর ঘটনাও কারো অজানা নয়। তার পরও সন্তানহারা মা বলছেন, আমার অপর সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই আমি আবারও যাব অবস্থানে। সংগ্রামী মাতৃত্বের এই মনোভাবকে সারা দেশ কুর্নিশ জানিয়েছে। শুধু বিদ্বেষ বিষে পরিপূর্ণ বিজেপি নেতাদের মনেই তা কোনো দাগ কাটতে পারেনি।

শুধু শাহিনবাগের মানুষই নয়, সিএএ-এনআরসির বিরোধিতায় আজ সোচ্চার সর্বস্তরের মানুষ। ছাত্ররা বেরিয়ে আসছেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। যাঁরা সাধারণত নিজেদের পেশা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, সেই শিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্যকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষক, চিকিৎসক ও বুদ্ধিজীবীরাও আজ প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন। একের পর এক রাজ্যে বিধানসভায় পাস হচ্ছে সিএএ-এনপিআরবিরোধী প্রস্তাব। মুখ খুলছেন বিচারপতিরা। বলছেন, সরকারি আইনের প্রতিবাদ করা মানুষের ন্যায্য অধিকার। গায়ের জোরে কোনো সরকার তা কেড়ে নিতে পারে না।

দেশজুড়ে মানুষের এই আতঙ্ক-উদ্বেগকে শুধু সরকারি ক্ষমতার ঔদ্ধত্যেই উড়িয়ে দিচ্ছেন বিজেপি নেতারা। তাঁদের রাজনীতি মনোভাবের মধ্যে গণতন্ত্রের কোনো জায়গা নেই। তাঁদের রাজনীতি শুধুই ক্ষমতা দখলের উপায়। তাই এই রাজনীতিতে জেতাটাই শেষ কথা, ক্ষমতা দখলটাই শেষ কথা। তাই কুলদীপ সেঙ্গারের মতো উন্নাত্তয়ের শিশুঘাতী, ধর্ষকরা অনায়াসেই দলে নেতা বলে জায়গা পেয়ে যান। মালেগাঁও বিস্ফোরণের অন্যতম অভিযুক্ত সাধ্বী প্রজ্ঞার মতো মহিলা দিব্যি সংসদ সদস্য হয়ে সমাজে বিভাজনের বিষ ছড়াতে থাকেন।

বিজেপি এখন ১৩টি রাজ্যের শাসনক্ষমতায় এবং ৪০ শতাংশ ভোটের ভাগীদার। বিজেপির কাছে দিল্লির ভোট একটা শিক্ষা। মোদিকে দেখিয়ে জাতীয় ইস্যু খাড়া করে বিধানসভা ভোটে জেতা যাবে না। অন্যান্য দলকেও এটা বুঝিয়ে দিয়েছে যে রাজ্যের ভোট জাতীয় স্তরের ভোট এক ছাঁচের নয়। রাজ্যের মানুষও বুজিয়ে দিয়েছে যে তারা নিজেদের ভালো-মন্দ বুঝে নিতে চায়। এটা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও একটা নতুন চিন্তার বিষয়। এই রায় সিএএ বিরোধিতারও নয়, রাজনীতিতে একটা নতুন ধারা আনার চেষ্টা করছেন কেজরিওয়াল। একটা কৌশল করছেন যার মধ্যে নরম হিন্দুত্ব ও ধর্মের ছোঁয়া ভোটারদের তুষ্টি বিধান, নিরপেক্ষতা, গান্ধীজির বিনম্রতা—সব মিলিয়ে একটা সেরা মকটেল, সেই মকটেলে ভোটাররা বেশি আকৃষ্ট হয়েছেন। তুলনায় বিজেপির টোটকা (ব্যক্তিকেন্দ্রিক আক্রমণ, কটূক্তি, শাহিনবাগ হুমকি) কাজে আসেনি। কেজরিওয়ালকে কেন্দ্র করে ও তাঁর অনুসৃত পদ্ধতি ধরে এখন থেকে হয়তো অনেক আঞ্চলিক দল রাজ্যে পরিষেবা দিতে চেষ্টা করবে, যা আখেরে মানুষের জন্য কল্যাণকর হবে। রাজনীতিতে কাদা ছোড়াছুড়ি কমতে পারে। তার জেরে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের রাজনীতিতে আমদানি হতে পারে নতুন নীতি। অভ্যুদয় হবে নবদিগন্ত—সেখানে জাত-পাত, ধর্মান্ধতা, বিভাজন, নির্বাচনী হিংসাসহ কালো দিকগুলো নির্মূল হবে।

 

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা