kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

কালান্তরের কড়চা

আওয়ামী লীগ কি একটি ফ্যাসিবাদী দল?

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



আওয়ামী লীগ কি একটি ফ্যাসিবাদী দল?

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম দেশরক্ষা অভিযানে বেরিয়েছেন। ঢাকার পর সিলেটের কিনব্রিজ এলাকায় সমাবেশ করেছেন। তবে কণ্ঠে একই কথা—‘আওয়ামী লীগ একটি ফ্যাসিস্ট দল। তারা বাংলাদেশকে একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।’ তবে দেশের অবস্থার গতানুগতিক বিবরণ ছাড়া সিলেট শহরের সভায় কমরেড সেলিম আরেকটি কথা যোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘দেশের জন্য আওয়ামী লীগ আপদ এবং বিএনপি-জামায়াত বিপদ। আপদকে বিদায় দিয়ে বিপদকে ডেকে আনলে চলবে না। ক্ষমতায় বসাতে হবে বাম গণতান্ত্রিক সরকারকে?’ ভালো কথা। বাংলাদেশে (অধুনা পশ্চিমবঙ্গেও) এই বাম গণতান্ত্রিক শক্তিকে জনগণ বিবেচনা করে মুসিবত হিসেবে। তারা আপদ ও বিপদের বদলে মুসিবতকে ক্ষমতায় আনলে কী কী মুসিবতে পড়বে, সে কথা সিলেটের জনগণকে সেলিম বলেননি। তবে পশ্চিমবঙ্গের জনগণ তাদের ৩৪ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে মুসিবতদের শাসনামলের গভীর যন্ত্রণার কথা জানেন।

কিন্তু ঢাকার সভার মতোই সিলেটের সভায় কমরেড সেলিম বলেছেন, ‘প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার বাস্তবায়নের জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। ভেবেছিলাম এই দেশ হবে ফুলের বাগান। কিন্তু আমাদের স্বপ্ন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। দেশ ফুলের বাগানে নয়, ক্যাসিনোর বাগানে পরিণত হয়েছে। চতুর্দিকে উন্নয়নের জয়ধ্বনি করা হচ্ছে। অথচ দুর্নীতি অনাচারে দেশ ছেয়ে গেছে। বিদেশে পাচার করা হচ্ছে লাখোকোটি টাকা। তাই ইনসাফের জন্য, দেশ রক্ষার জন্য তাদের (বাম গণতান্ত্রিক শক্তিকে) যুদ্ধে নামতে হয়েছে। আর এই সময়টাই হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্ত। এই মুহূর্তে এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আঘাত করতে হবে!’

দেশের বর্তমান অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে কমরেড সেলিম বলেছেন, ‘দেশ এখন ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র। ফকিরকে স্যান্ডেল পরিয়ে সরকার তৃপ্তি প্রকাশ করছে। কিন্তু ফকিরের ফকিরত্ব ঘোচাতে পারছেন না। দুর্বৃত্তরা সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। পুলিশ-প্রশাসন দেশ চালাচ্ছে। দেশের মানুষ শান্তিতে নেই। অর্থনীতিতে অশান্তি। নারী নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ড—সব এখন নিয়মিত ঘটনা। তাই প্রত্যেক মানুষকে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে।’

চমৎকার বক্তৃতা। আমার পাঠক বন্ধুদের অনেকেই নিশ্চয়ই চার্লি চ্যাপলিনের ‘গ্রেট ডিকটেটর’ ছবিটা দেখেছেন। অনেকে মনে করেন, ফ্যাসিস্ট ডিকটেটর হিটলারকে এক্সপোজ করার জন্য এই ছবিটা চ্যাপলিন করেছেন। আবার অনেকে মনে করেন, বিশ্বের সব স্বৈরাচারীকে এক্সপোজ করার জন্য এই ছবিটা করা হয়েছে। এই স্বৈরাচারীদের মধ্যে স্ট্যালিনও আছেন। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা প্রচার করে, হিটলার ও স্ট্যালিন একই ধরনের ফ্যাসিস্ট ডিকটেটর। কথাটা সত্য নয়। কমিউনিস্ট ডিকটেটরশিপ শ্রেণি বৈষম্য ঘুচিয়ে মানুষের মঙ্গলের জন্য। ফ্যাসিস্ট ডিকটেটরশিপ জনগণের সব অধিকার কেড়ে নিয়ে শোষক শ্রেণির রাজত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য।

তা সত্ত্বেও হিটলার ও স্ট্যালিনের মধ্যে চরিত্রগত ও প্রকৃতিগত মিল আছে। স্ট্যালিন কমিউনিস্ট একদলীয় শাসনের একনায়ক ছিলেন। হিটলারও ছিলেন ফ্যাসিস্ট একদলীয় শাসনের হোতা। স্ট্যালিন তাঁর প্রতিপক্ষকে (ট্রটস্কিসহ) নির্মমভাবে হত্যা করেছেন। হিটলারও তাঁর প্রতিপক্ষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছেন।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও মুখে গণতন্ত্র ও বহুদলীয় শাসনব্যবস্থার কথা বলছে বটে; কিন্তু তাদের কমিউনিস্ট রাজনীতির মূল লক্ষ্য একদলীয় কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠা। ক্ষমতায় গেলে তারা একইভাবে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করবে। ইউরোপের হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড প্রভৃতি দেশে কমিউনিস্টরা যে গণহত্যার (এক হাঙ্গেরির পোজনানে তারা হত্যা করেছে ২৬ হাজার মানুষ) রাজনীতি করেছে বাংলাদেশ বা ভারতে কমিউনিস্টদের সেই রাজনীতি অনুসরণের ক্ষমতা, দক্ষতা এবং যোগ্যতা কোনোটাই নেই। বাংলাদেশ ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির পেছনে না আছে লেলিনের মতো লালফৌজ, না মাও জেদংয়ের মতো পিপলস আর্মি। বাংলাদেশ ও ভারতের কমিউনিস্ট নেতারা বেশির ভাগই নিজ নিজ দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির দুধকলা খাওয়া সুবোধ বালক।

উপমহাদেশে গত ৫০ বছরের বেশি সময়ের রাজনীতি দেখলে দেখা যাবে, বগলে মার্ক্সবাদী কেতাব, মুখে মার্ক্সবাদী স্লোগান, কাজে এরা নিজ নিজ দেশের গণতান্ত্রিক বড় বুর্জোয়া দলগুলোর ডানার নিচে আশ্রয় নিয়ে রাজনীতি করে। ভারতে সিপিআই দীর্ঘকাল কংগ্রেসের লেজুড়বৃত্তি এবং বাংলাদেশে করেছে আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি। ভারতে ও বাংলাদেশে নেহরু ও মুজিবের মৃত্যুর পর এদের আশ্রয়ের ডেরা ভেঙে যায় এবং এরা এতিম হয়ে পড়ে। ভারতে ও বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টির এখন এতিমের রাজনীতি। ইউরোপের নায়কদের মতো এদের ডিকটেটর হওয়ার ক্ষমতা ও সুযোগ নেই। গণতান্ত্রিক হওয়ার সাহস নেই।

ভারতে এই এতিম রাজনীতি ইন্দিরা হটাও এবং কংগ্রেসকে ফ্যাসিবাদী দল আখ্যা দিয়ে প্রচার চালিয়ে গণতন্ত্রের ফুলের বাগান তৈরি করতে পারেনি। তাদের রাজনীতি হিন্দুত্ববাদের গভীর অরণ্য সৃষ্টি করেছে। আসল ফ্যাসিবাদী দলকে ক্ষমতা দখলে সাহায্য জুগিয়েছে। বাংলাদেশে কমরেড সেলিমেরা তাই করার চেষ্টা করছেন। জনগণের সমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে হটানোর শক্তি তাঁদের নেই। যেটা তাঁরা পারবেন, মিথ্যাবাদী রাখালের মতো বাঘ বাঘ বলে চিৎকার করে আসল বাঘকে ডেকে আনার পথ করে দেওয়া।

কমরেড সেলিম বলেছেন, ‘ফকিরকে স্যান্ডেল পরিয়ে সরকার তৃপ্তি প্রকাশ করছে।’ দেশের ১৬ কোটি মানুষের পায়ে যদি আওয়ামী লীগ স্যান্ডেল পরাতে পেরে থাকে, সেটা তো একটা বিরাট সাফল্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ৫০ বছরে পৌঁছতে চলেছে। এই দীর্ঘ সময়ের রাজনীতিতে কমরেড সেলিমেরা দেশবাসীর একজনের পায়েও কি খড়ম পরাতে পেরেছেন? কোনো দিন তাঁরা তা পারবেন কি? বর্তমানে বামশক্তি বলে কিছু নেই। ভারতেও অবস্থা তথৈবচ। বাংলাদেশে যে বামপন্থী দলগুলো আছে, তারা কিছু স্প্লিন্টার্স গ্রুপ। নির্বাচন এলে বামপন্থীদের যাঁরা জেতেন তাঁদের নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়ী হতে হয়। ইঁদুর হয়ে নৌকার তল ফুুটো করতে পারলে তারা কাদের সাহায্য জোগাবেন? বিএনপি-জামায়াতের মতো প্রকৃত ফ্যাসিবাদী দল অথবা অনুরূপ কোনো অপশক্তিকে নয় কি?

ফিদেল কাস্ত্রো ক্ষমতায় থাকতে একবার কোথাও যাওয়ার পথে ভারতে এসেছিলেন। কলকাতা বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতির সময়ে এক সাংবাদিক সাক্ষাৎকারে ভারতে কমিউনিস্ট দলের সংখ্যা ১৭টি জেনে ভিরমি খেয়ে পড়তে চলেছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের কাছে বলেছিলেন, ‘ভারতে কোনো কমিউনিস্ট দল নেই। যেগুলো কমিউনিস্ট অথবা বামপন্থী নাম ধারণ করেছে, তারা হয় রোমান্টিসিজম অথবা অপরচুনিজমে ভুগছে। আমার স্টাডি থেকে বলতে পারি, ভারতে কোনো প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টি নেই। যেগুলো আছে তারা মধ্যবিত্ত চরিত্রের মানুষের দল। বুর্জোয়া দলগুলোর একেকটিকে একেক সময় সমর্থন দিয়ে এরা টিকে থাকার চেষ্টা করছে। প্রকৃত বামপন্থী হলে এদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথে কোনো বাধা থাকত না।’

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো সম্পর্কে ফিদেল কাস্ত্রো যা বলেছেন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট বা বাম দলগুলো সম্পর্কে তা আরো সত্য। পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কেও অনুরূপ সত্য। বাংলাদেশের বেশির ভাগ বামপন্থী দলের নেতা পুঁজিবাদী দলগুলোর নেতাদের মতোই বিলাস বহুল জীবন যাপন করেন। কৃষক-শ্রমিকের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ক্ষীণ। পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম নেতা কমরেড জ্যোতি বসু একবার বলেছিলেন,  ‘I preach like a priest, but live like a prince’, (আমি ধর্মযাজকের মতো কথাবার্তা বলি। কিন্তু রাজপুত্রের মতো বসবাস করি)।

বাংলাদেশেও বেশির ভাগ বাম নেতার একই অবস্থা। ক্ষমতায় গেলে এবং বয়স একটু বাড়লে তাঁরা হজে যান। ঢাকায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে হেফাজতিদের অভ্যুত্থানপ্রচেষ্টার সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির অফিসেও হামলা চালিয়ে তারা কমরেড সেলিমের মোটর গাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত করে। কমরেড সেলিম সে জন্য এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিলেন। ভবিষ্যতের কমিউনিস্ট (ইউটোপিয়া) বিপ্লবে কমিউনিস্টদের প্রাণহানি, সম্পত্তিহানির আশঙ্কা রয়েছে। সে সময় তাঁরা ক্ষতিপূরণ চাইবেন কার কাছে?

আওয়ামী লীগের আমলে দেশ চালাচ্ছে পুলিশ। দেশের মানুষের শান্তি নেই। অর্থনীতি বিপর্যস্ত। অভিযোগ করেছেন কমরেড সেলিম। দেখা যাক দেশে কমিউনিস্ট পার্টির শাসন এলে কী ধরনের ফুলের বাগান তৈরি হতো। প্রথমে পূর্ব ইউরোপের উদাহরণ নিই। হাঙ্গেরিতে কয়েক বছরের একদলীয় কমিউনিস্ট শাসনের সময় গণবিদ্রোহ দেখা দেয়। পণ্ডিত নেহরুর হিসাবমতে, সেনাবাহিনীর গুলিতে ২৬ হাজার নর-নারীর মৃত্যু হয়। পোল্যান্ডে কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে প্রধানত শ্রমিক শ্রেণি। মস্কো পোল্যান্ডে সামরিক শাসন জারি করেও কমিউনিস্ট সরকার টিকিয়ে রাখতে পারেনি।

অনেকের অভিযোগ, পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট শাসন উত্খাতের পেছনে মার্কিন সিআইএর ষড়যন্ত্র কাজ করেছে। হতে পারে। কিন্তু ভারতে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, কেরলে? এই তিনটি রাজ্যে কমিউনিস্ট শাসন ফুলের বাগান তৈরি করে থাকলে এই শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলো কেন? পশ্চিমবঙ্গে পাঁচটি বাম দল মিলে যে শাসন ৩৪ বছর চালিয়েছে, জনগণের ভোটে এমনভাবে তা উত্খাত হয়ে গেল কেন?

ভারতে কংগ্রেস দেশ শাসনে দুর্নীতি করেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে (যে অভিযোগ বাংলাদেশে এখন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে উঠেছে), কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট সরকারের মতো অবাধ লুটপাটের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেনি। গুলি চালিয়ে কৃষক হত্যা করেনি। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে বিড়লা টাটাদের মতো পুঁজিবাদীদের শিল্প প্রতিষ্ঠার নামে ডেকে এনে কৃষক ও সর্বহারা উচ্ছেদের ব্যবস্থা করেনি। দিল্লির জামে মসজিদের খতিবকে পশ্চিমবঙ্গে ডেকে এনে তাঁকে দিয়ে ফতোয়া দেওয়ার মাধ্যমে হিন্দু ও মুসলমান কৃষকদের ঐক্যে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করেনি। এক দরিদ্র অথচ মেধাবী মুসলমান যুবক এক ধনী মাড়োয়ারি কন্যার প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে করায় পুলিশের সাহায্যে তাকে হত্যা করে লাশ লুকিয়ে ফেলে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির সুযোগ করে দেয়নি। কলকাতার বিহারিদের খেপিয়ে দিয়ে তসলিমাকে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য করেনি।

এ সময় বুদ্ধদেব বাবুর বামফ্রন্ট সরকারকেই ফ্যাসিস্ট সরকার বলে অভিযোগ তুলেছিল কলকাতার অনেক রাজনৈতিক দলই। কংগ্রেস একটি পচনশীল পুঁজিবাদী দল। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর প্রথমবারের লৌহ কঠিন শাসনের সময়েও ফ্যাসিস্ট দল হয়ে উঠতে পারেনি। যেমন পারেনি ব্রিটেনের ক্যাপিটালিস্ট কনজারভেটিব পার্টি, ফ্রান্সের দ্যগলিস্ট পার্টি অথবা জার্মানির ক্রিশ্চান ডেমোক্রেটিক পার্টি। এসব পার্টি তাদের দেশে অনেক সময় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে; কিন্তু হিটলারের ন্যাশনালিস্ট সোশ্যালিস্ট পার্টির (নাৎসি) মতো ফ্যাসিস্ট পার্টি হয়ে উঠতে পারেনি। দেশে দেশে দেখা গেছে সাবেক সোশ্যালিস্ট ও কমিউনিস্টরাই পরে ফ্যাসিস্ট হয়েছে, ডেমোক্রেসিতে বিশ্বাসীরা হয়েছে খুব কম।

বাংলাদেশেও আওয়ামী লীগ এখন মধ্য ডানপন্থী একটি গণতান্ত্রিক দল। স্বাধীনতার শত্রুদের দমন করতে গিয়ে তাকে বাধ্য হয়ে সময় সময় কঠোর হতে হয়েছে। কিন্তু ফ্যাসিবাদী দলে পরিণত হয়নি, কিংবা ফ্যাসিবাদী সরকারও দেশে প্রতিষ্ঠা করেনি। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ফ্যাসিবাদী হলে কমরেড সেলিম বা ড. কামাল হোসেনরা এ রকম দেশময় ঘুরে সরকারকে ফ্যাসিস্ট বলে গালি দেওয়ার সুযোগ পেতেন না। জিয়াউর রহমান ও এরশাদের আমলে তাঁদের  তো অহরহ ফ্যাসিস্ট বলার সাহস তাঁরা দেখাননি।

এ কথা সত্য, নিরন্তর স্বাধীনতার শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যাপৃত থেকে আওয়ামী লীগ সরকার দেশে এখনো সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। গণতান্ত্রিক বহু দেশে গণতান্ত্রিক বহু সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। যেমন—ব্রিটেনে টোরি সরকার সর্বশক্তি প্রয়োগেও লাইফ ক্রাইম (ছুরি মেরে হত্যা) বন্ধ করতে পারছে না। সরকার পুলিশের শক্তি ক্রমেই বাড়িয়ে তুলছে। তাতে কেউ সরকারকে ফ্যাসিস্ট সরকার বলছে না এবং ব্রিটেনকেও পুলিশশাসিত দেশ বলছে না। ব্রিটেনেও কমিউনিস্টরা আছেন। তাঁরা উপমহাদেশের কমিউনিস্টদের মতো মুখে মার্ক্সবাদ, মনে আধা বুর্জোয়া মানসিকতা নিয়ে বাম রাজনীতি করছেন না। তাঁরা বর্তমানের বাস্তবতার নিরিখে মার্ক্সবাদকে একটি বৈজ্ঞানিক আদর্শ (ডগমা নয়) হিসেবে পুনর্মূল্যায়নের চেষ্টা করছেন।

 

লন্ডন, সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা