kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

বলিভিয়ার নির্বাচনে যা ঘটতে পারে

লুকাস লেইরোস দে আলমেইদা

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে আগামী মে মাসের ৩ তারিখে। দেশের পরিস্থিতি এখনো গোলযোগপূর্ণ; অভ্যুত্থানের কারণে সৃষ্ট অস্থিরতা ও অসন্তোষের জের চলছে। ওই অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস ক্ষমতাচ্যুত হন। ডানপন্থী প্রার্থীরা দারুণ উৎসাহ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুত; তাঁরা বামপন্থার যেকোনো ধরনের পুনরুত্থান ঠেকাতে চায়। সন্দেহ নেই, মোরালেসের বিপুল জনসমর্থন রয়েছে; কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ডানপন্থীদের মোকাবেলার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি-সামর্থ্য তাঁর নেই।

ইতিহাসের জঘন্যতম একটি পর্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলিভিয়া। কিছুদিন আগেও ইভো মোরালেসের আদিবাসী-বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ও সমাজতান্ত্রিক ধারার নীতিপ্রসূত যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল তার নিরিখে দেখলে বলতে হয়, সত্যি মুখ থুবড়ে পড়ার মতো ঘটনা ঘটেছে দেশটিতে। গত বছর ওয়াশিংটনপন্থীরা যে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, সেটিকে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ডার অনুকূলে সবচেয়ে অগ্রসর পদক্ষেপ বলা যেতে পারে। ভেনিজুয়েলায় ব্যর্থ অভ্যুত্থানের লক্ষণগুলো বলিভিয়ায় পুনরাবৃত্ত করা হয়নি।

মোরালেসকে ক্ষমতাচ্যুত করার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যে অবৈধ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যে উগ্রতা নিয়ে বলিভিয়ার বিরোধীপক্ষ মাঠে নেমেছিল তাতে স্পষ্ট, সমাজতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটানোই তাদের উদ্দেশ্য ছিল। নির্বাচনের মাধ্যমে ডানপন্থী গ্রুপগুলো অভ্যুত্থানকে আইনি বৈধতা দেওয়ার এবং পর্যায়ক্রমে বলিভিয়াকে একটি ভৌতিক রাষ্ট্রে পরিণত করার সুযোগ পেয়ে যেতে পারে। রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধী নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পুরো দেশকে জিম্মি করে ফেলতে পারে তারা।

মোরালেস খুবই জনপ্রিয়, সাদা চোখেই তা স্পষ্ট দেখা যায়। এখনো সাবেক প্রেসিডেন্টের প্রতি ৬০ শতাংশ লোকের সমর্থন রয়েছে; তারা পরিষ্কার করেই তাদের সমর্থনের কথা জানিয়েছে। তাঁর শাসনামলে আগে কখনো দক্ষিণ আফ্রিকার দরিদ্রতম দেশ বলিভিয়া এমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখেনি, আদিবাসী সনাতন সম্প্রদায়গুলো কখনো এতটা স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা ভোগ করেনি। কিন্তু অভ্যুত্থানকারীরা সেই অবস্থানে ফিরে যেতে চায়, যে অবস্থান থেকে উত্তরণের জন্য যাত্রা শুরু করেছিলেন মোরালেস। তারা ফিরে যেতে চায় আন্তর্জাতিক বাজারে জাতীয় অর্থনীতিকে বিকিয়ে দেওয়ার পুরনো পথে। তারা আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে অবদমিত করে রাখার নীতি জোরদার করতে চায়।

মোরালেসের পার্টি মুভিমিয়েন্তো আল সোশিয়ালিজমো (এমএএস-মাস) প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে সাবেক অর্থমন্ত্রী লুইস আরসেকে দাঁড় করাবে। অন্যদিকে প্রতিক্রিয়াশীল পক্ষের প্রার্থী অনেক। তাঁদের মধ্যে স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট জেনিন আইনেস ও মোরালেসবিরোধী বিক্ষোভের নেতা ব্যবসায়ী লুইস ফেরনান্দো কামাচোর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। আরো রয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট কার্লোস মেসা। তাঁকে মডারেট রক্ষণশীল বলা চলে। অনুমান করা হচ্ছে, দ্বিতীয় রাউন্ডে পৌঁছলে আইনেস ও কামাচো জোট বাঁধবেন। তাঁদের টার্গেট বামপন্থী মাস ও মেসার মডারেট প্রতিক্রিয়াশীল পক্ষ। তাদের জিততে না দেওয়াই আইনেস ও কামাচোর লক্ষ্য। যা-ই হোক, নির্বাচনে কী হবে বা হবে না, তা শুধু জন-আকাঙ্ক্ষা ও নির্বাচনী আইনের ওপর আস্থা রাখার বিষয় নয়।

বাস্তবে দক্ষিণ আমেরিকা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় ভয়ংকর সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্যতিক্রম ভেনিজুয়েলা, দেশটি মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও টিকে আছে। অন্য সব দেশ বন্দি হয়ে আছে ওয়াশিংটনের এজেন্ডা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ সরকারগুলোর কাছে। এর মানে হচ্ছে, একজন সমাজতন্ত্রী (বলিভিয়ায়) প্রার্থীর জিতে আসার ব্যাপারে তাদের ভূমিকা হবে ন্যূনতম। অভ্যুত্থানে বিজয়ী পক্ষের অনুকূলে চাপ হবে খুবই প্রবল এবং কর্মকাণ্ড হবে নিষ্ঠুর। জায়ার বলসোনারোর শাসনাধীন ব্রাজিলের ভূমিকার কথা বলা যেতে পারে—নব্য উদারতন্ত্রী এই নেতা তাঁর বাসনার কথা বেশ কয়েকবার স্পষ্ট করে বলেছেন। মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় তিনি নিবেদিত, বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে ব্রাজিলের আঞ্চলিক প্রভাবক্ষমতা ব্যবহার করতে চান। বেশ কয়েকবার তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোতে, যেমন—ভেনিজুয়েলা, সামরিক অভিযানের হুমকি দিয়েছেন।

বলিভিয়ার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ। সম্প্রতি যে অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে তার পরিণতিতে দেশটি বিভিন্ন পক্ষের সংঘর্ষের, বিরোধের পাকেচক্রে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। এর মানে হলো, যদি নির্বাচনের মাধ্যমে অভ্যুত্থানপন্থীদের আশা পূরণের সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে জালিয়াতির ঘটনা, ধ্বংসাত্মক ও প্রতিবন্ধকতামূলক অনেক ঘটনা ঘটতে পারে—শঙ্কা বেশ প্রবল। যে করেই হোক, অভ্যুত্থানকারীরা মরিয়া হয়ে চেষ্টা করবে নির্বাচনে জেতার জন্য। কারণ তারা ভালো করেই জানে, নির্বাচনে জিতলে আইনি বৈধতার নিশ্চয়তা পাবে তারা; তাদের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থনও নিশ্চিত হবে। তাদের এমন আশার কারণ পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে শুধু একটি বিষয় অর্থবহ, সেটি হলো ক্ষমতার ‘গণতান্ত্রিক’ চেহারা।

 

লেখক : ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব রিও ডি জেনেইরোর ফেলো

সূত্র : গ্লোবাল রিসার্চ অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা