kalerkantho

রবিবার  । ১৫ চৈত্র ১৪২৬। ২৯ মার্চ ২০২০। ৩ শাবান ১৪৪১

ইদলিবকে জঙ্গিমুক্ত করা জরুরি

স্টিভেন সাহিওনি

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তুরস্কের মদদপুষ্ট সিরীয় জঙ্গিরা চরমপন্থী ইসলামী রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী। অতি সম্প্রতি ইদলিবে তারা একটি সিরীয় সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ইদলিবে বড় যুদ্ধ বাধবে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান হুংকার দিয়েছেন, তুর্কি সেনাদের ওপর হামলা হলে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সরকারকে চড়া মূল্য দিতে হবে। প্রসঙ্গত, গত সোমবার পাঁচজন তুর্কি সেনা নিহত হয়। এর আগে সিরিয়ায় আরো আট তুর্কি সেনা নিহত হয়েছে।

সোমবার পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, উত্তর-পূর্ব ইদলিবের তাফত্নাজে তুর্কি বাহিনীর পর্যবেক্ষণ পোস্টে সিরীয় বাহিনীর গোলাবর্ষণের জেরে। ইদলিবকে আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট সব জঙ্গির হাত থেকে মুক্ত করার মিশনে রয়েছে সিরীয় বাহিনী। এই জঙ্গিরা এরদোয়ান ও অন্যান্য পক্ষের সমর্থনপুষ্ট। ইদলিবে জঙ্গিরা তো রয়েছেই; উপরন্তু তুরস্ক বিপুলসংখ্যক সেনা পাঠিয়েছে। তুরস্কভিত্তিক সিরীয় জঙ্গি গ্রুপগুলোর যেমন সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (এসএনএ) ও সিরিয়ান লিবারেশন ফ্রন্টের (এসএলএফ) সদস্যদেরও অস্ত্র দিয়ে ইদলিবে পাঠানো হয়েছে।

সীমান্ত এলাকার প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, তুর্কি সামরিক সরঞ্জাম, সেনা এবং সাঁজোয়া যানসহ বিশাল গাড়িবহর নিয়মিতই সিরিয়ায় প্রবেশ করেছে। তুর্কি পৃষ্ঠপোষকরা যুদ্ধে বেসামরিক নাগরিকদের পণ হিসেবে ব্যবহারের জন্য জঙ্গিদের উৎসাহিত করে। তুরস্ক, জাতিসংঘ ও বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক মহল সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে, যদি ইবলিব দখলের যুদ্ধ বাধে এবং বেসামরিক নাগরিকদের উত্তরের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে চরম মানবিক বিপর্যয় ঘটবে। প্রসঙ্গত, ইদলিব সর্বশেষ জঙ্গি অধ্যুষিত অঞ্চল। অথচ কয়েক সপ্তাহ ধরে সিরিয়ান রেডক্রসের অনেক অ্যাম্বুল্যান্স, খাদ্যবাহী ট্রাক ও সবুজ রঙের বাস ইদলিব থেকে বের হওয়ার মানবিক করিডরে বেকার বসেছিল। অল্পসংখ্যক লোকই বের হতে পেরেছে। তারা বলেছে, জঙ্গিরা তাদের ইদলিব ছেড়ে নিরাপদ এলাকায় সরে যেতে বাধা দিয়েছে।

সিরিয়ায় আল-কায়েদার ছায়া সংগঠন ছিল জাবাত আল নুসরা। ২০১৩ সালে সিরিয়ার যুদ্ধে শামিল হওয়ার পর তারা সবচেয়ে নির্মম ও সংঘর্ষপ্রবণ জঙ্গিগোষ্ঠীর আখ্যা পায়। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ফ্রি সিরিয়ান আর্মি সরকার পরিবর্তনের দাবিতে জনসমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয় এবং বেসামরিক নাগরিকদের অস্ত্র ধরাতেও ব্যর্থ হয়। আল নুসরা আসার পর হয় তারা তাতে যোগ দিয়েছে, নতুবা রণে ভঙ্গ দিয়ে ২০১৫ সালে জার্মানিতে চলে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যরা আল নুসরাকে জঙ্গি সংগঠন আখ্যা দিলে তারা হায়াত তাহরির আল শাম (এইচটিএস) নাম ধারণ করে এবং তুরস্ক ও অন্যদের সমর্থন পায়। অতীতে অনেক ঘটনায় এইচটিএস আইএসের সঙ্গে মিলে কাজ করেছে।

২০১২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ইদলিব জঙ্গিদের দখলে। ২০১৭ সালে এটিকে ডি-এস্কেলেশন জোন ঘোষণা করা হয়। সিরিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে পরাজিত যে জঙ্গিরা অস্ত্র ত্যাগে রাজি হয়নি তাদের ইদলিবে পাঠানো হয়। তাদের পরিবার ও সহায়তাকারীদের এবং মুসলিম ব্রাদারহুড মানসিকতার সঙ্গীদেরও সেখানে পাঠানো হয়। তাদের সঙ্গী-সহযোগী বেসামরিক ব্যক্তিদের অনেককে সিরিয়া বা চীন থেকে (মূলত উইঘুর) জোগাড় করেন এরদোয়ান। উইঘুররা তুর্কিস্তান ইসলামিক পার্টির সদস্য।

ইদলিবের মূল বাসিন্দারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে। কেউ ইউরোপে, কেউ তুরস্কে, আবার কেউ সিরিয়ার লাতাকিয়ায় বা উপকূলীয় এলাকায় চলে যায়। একসময় বাড়িঘর জমিজমা, ব্যবসার মালিক ইদলিববাসী শরণার্থী বা অভ্যন্তরীণভাবে স্থানান্তরিত হয়ে পড়ে। তারা অধীর আগ্রহে ইদলিব পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে; আশা করছে একদিন বাড়িঘরে ফিরবে, জমিজমা ফিরে পাবে, ব্যবসা ফিরে পাবে এবং নতুন জীবন শুরু করবে।

২০১৮ সালে তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে একটি চুক্তি হয়। তুরস্ক প্রতিজ্ঞা করে, আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট সব জঙ্গি অপসারণ করা হবে এবং সব নিরস্ত্র নাগরিককে নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হবে। রাশিয়া জঙ্গিবিরোধী যুদ্ধে সিরিয়াকে সহায়তা করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। তারা এটাকে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অংশ ভাবে। কিন্তু তুরস্ক কখনো অঙ্গীকার রক্ষা করেনি। এ কারণে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি। কিছু পশ্চিমা দেশও ইদলিবকে জঙ্গিদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে রাখতে চায়।

সম্প্রতি রাশিয়ার দুটি প্রতিনিধি দল আঙ্কারা সফর করেছে; কিন্তু ঐকমত্য হয়নি। রাশিয়া ও তুরস্কের সামরিক কর্মকর্তারা আরেকটি যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেন; কিন্তু জঙ্গিরা হামলা অব্যাহত রাখে। সিরিয়ার বাহিনীও পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। তুরস্ক নানা ছুতায় কার্যত জঙ্গিদের পক্ষ নেয়। কারণ জঙ্গিরা এবং এরদোয়ান ও তাঁর পার্টির সদস্যরা একই মুসলিম ব্রাদারহুড মতাদর্শের অনুসারী। সিরিয়ার আর্থিক পুনরুজ্জীবনের জন্য ইদলিবকে জঙ্গিমুক্ত করা জরুরি। ইদলিব সংলগ্ন লাতাকিয়া, কেসাব, মাহারদেহ, পশ্চিম আলেপ্পো ও হামার জন্যও জঙ্গিরা বড় হুমকি।

 

লেখক : রাজনৈতিক ভাষ্যকার

সূত্র : গ্লোবাল রিসার্চ অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা